ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

‘মৃত্যুকূপ’ থেকে ফেরার গল্প

‘মৃত্যুকূপ’ থেকে ফেরার গল্প
×

মাজেদা বেগম ও তাঁর সন্তান মারুফ, ১৩ মাস বয়স থেকে টানা ৬ বছর সে মায়ের সঙ্গে ছিল কনডেম সেলে

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ০৭:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘কনডেম সেলে কাটানো ওই বছরগুলোয় আমার মনে হতো, আমি প্রতিদিন মারা যাচ্ছি। সবসময় একটা ভয়ের মধ্যে থাকতাম–এই বুঝি ওরা এলো আর বলল, এবার শেষ গোসলটা সেরে নাও; সময় হয়ে গেছে।’ কথাগুলো ইসমাইল হোসেনের। বিনা অপরাধে যিনি ১৪ বছর কাটিয়েছেন কারাগারের অন্ধকার কনডেম সেলে, যেখানে ফাঁসির আসামিরা মৃত্যুর প্রহর গোনেন। সন্ধ্যার পর আকাশে যে তারা ফোটে, জীবনের অমূল্য সেই দৃশ্যটি দেখার জন্য তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ ১৬টি বছর। ইসমাইলের মতো এমন অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের চুরি যাওয়া জীবন, কনডেম সেলের অন্ধকার আর আইনি ব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটির চিত্র নিয়ে জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে ৮ থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় এক ব্যতিক্রমী আলোকচিত্র প্রদর্শনী। দ্য ডেথ পেনাল্টি প্রজেক্ট, ডিকেইজ ইনিশিয়েটিভ এবং ব্লাস্টের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ প্রদর্শনীর নাম ‘সারভাইভিং ডেথ রো’ বা ‘মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে ফেরা’। প্রামাণ্য আলোকচিত্রী মোশফিকুর রহমান জোহানের লেন্সে বন্দি হওয়া এই গল্পগুলো দর্শকদের সামনে উন্মোচন করেছে আমাদের বিচারব্যবস্থার এক অজানা, হিমশীতল অধ্যায়কে।

আট বাই ছয় ফুটের পৃথিবী
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় তিন হাজার মানুষ মৃত্যুদণ্ডাদেশ মাথায় নিয়ে বেঁচে আছেন। তাদের অনেকেই এক দশকের বেশি সময় ধরে কনডেম সেলে বন্দি। নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পর উচ্চ আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার মাঝখানের এই দীর্ঘ সময়টা তাদের কাটে একটি আট বাই ছয় ফুটের দমবন্ধ করা প্রকোষ্ঠে। দিনে মাত্র দুই ঘণ্টার জন্য সেলের বাইরে যাওয়ার সুযোগ মেলে। বাকি ২২ ঘণ্টাই কাটে চার দেয়ালের বন্দিদশায়।
টানা ২০ বছর কনডেম সেলে কাটানো শেখ জাহিদ যখন নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পেলেন, তখন তাঁর জীবনের সব শেষ। কারাগারে থাকতেই মা-বাবা মারা গেছেন, সরকার তাঁকে শেষবারের মতো তাদের মুখ দেখার বা জানাজায় যাওয়ার অনুমতিটুকুও দেয়নি। মুক্তির পরও সেই বিভীষিকা তাড়া করে ফেরে। তিনি বলেন, ‘রাতে শুইলে মাথার ওপরে দড়ি ঝুলতেছে মনে হয়। এত বাস্তব লাগে যে চোখ বন্ধ করতে পারি না।’  

রাষ্ট্রের কাঠগড়ায় বন্দি শৈশব
প্রদর্শনীর সবচেয়ে হৃদয়বিদারক গল্পগুলোর একটি মাজেদা বেগমের। ২০০৭ সালে রংপুরের এক শিশু হত্যা মামলায় পুলিশ তাঁকে বিনা প্রমাণে গ্রেপ্তার করে। চলে অমানুষিক নির্যাতন, ধর্ষণের হুমকি এবং নিজের সন্তানকে মেরে ফেলার ভয়। বাধ্য হয়ে মাজেদা মিথ্যা জবানবন্দিতে স্বাক্ষর করেন। এ জোরপূর্বক স্বীকারোক্তির ভিত্তিতেই ২০১৫ সালে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ের দিন ১৩ মাস বয়সী ছেলে মারুফকে কোলে নিয়ে তিনি কনডেম সেলে প্রবেশ করেন। মাজেদা নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগে দীর্ঘ ছয় বছর কেটে যায়। এই পুরোটা সময় একটি শিশু বড় হয়েছে ফাঁসির সেলের আলো-বাতাসহীন পরিবেশে। মাজেদা মুক্তি পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু মারুফের হারিয়ে যাওয়া শৈশব কি রাষ্ট্র ফিরিয়ে দিতে পারবে?

ট্রমা এবং সামাজিক মৃত্যু
বিনা অপরাধে ৯ বছর জেলে ছিলেন মোহাম্মদ আলমগীর। কনডেম সেলে থাকাকালে তিনি নিজ চোখে দেখেছেন আরেক বন্দি আব্দুল শুক্কুরের ফাঁসির প্রস্তুতি। শুক্কুরকে যখন গোসল করানো হচ্ছিল, তিনি ছিলেন একদম স্তব্ধ। রাত ১০টা ১ মিনিটে যখন ফাঁসি কার্যকর হয়, জেলের চারপাশের পাখিরা তীব্র চিৎকারে ডানা ঝাপটে ওঠে, অন্য বন্দিরা ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে কাঁদতে থাকেন। এই দৃশ্য আলমগীরকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘কনডেম সেলের দিনগুলো ভোলার মতো না। যতদিন পৃথিবীতে বেঁচে থাকব, ততদিন সেগুলো মনে থাকবে। এতটা কষ্ট-বেদনার দিনগুলো আমার গেছে। ভাত খেতে খেতে, চোখের পানিতে প্লেট ভিজেছে। আমি কিছু অপরাধ করলাম না, অথচ আমাকে এমন জায়গায় রাখল। আমার ফ্যামিলিকে আমি দেখতে পাই না, ছোট বাচ্চাকে দেখতে পারতেছি না। আমার বাবা মারা গেল, শেষ দেখাও দেখতে পারলাম না। এর চাইতে তো বড় কষ্ট পৃথিবীতে আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না।’
আলোকচিত্রী মোসফিকুর রহমান জোহানের মতে, কনডেম সেল থেকে ফিরে আসা মানেই জীবনে মুক্তি নয়। শুরু হয় আরেক নতুন লড়াই; যার নাম ‘সোশ্যাল ডেথ’ বা সামাজিক মৃত্যু। ১৪ বছর কনডেম সেলে কাটানো আনোয়ার হোসেন যখন মুক্তি পেয়ে একটি কাপড়ের দোকানে কাজ নেন, তখন মানুষের কানাঘুষা আর সন্দেহের দৃষ্টি তাঁকে সেখানে টিকতে দেয়নি। ফাঁসির আসামি ছিলেন বলে সবাই তাঁকে এড়িয়ে চলত। বাধ্য হয়ে তাঁকে এমন জায়গায় চলে যেতে হয়, যেখানে কেউ তাঁর অতীত জানে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ এবং ব্লাস্টের ২০২০ সালের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন ‘লিভিং আন্ডার সেন্টেন্স অব ডেথ’-এর তথ্যমতে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ৭২ শতাংশই সামাজিকভাবে প্রান্তিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল। এদের ৮৭ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোয়নি। ভালো আইনজীবী নিয়োগ করার সামর্থ্য তাদের নেই। অনেকেই মামলা চালাতে গিয়ে সহায়-সম্বল সব বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে যান। শুধু তাই নয়, তাদের পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সমাজচ্যুত হতে হয়।
মোশফিকুর রহমান জোহানের এই দীর্ঘমেয়াদি আলোকচিত্র প্রকল্প আমাদের সামনে এক বিশাল নৈতিক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। যে বিচারব্যবস্থায় কনভিকশন রেট বা অপরাধ প্রমাণের হার অত্যন্ত কম, সেখানে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি বা ত্রুটিপূর্ণ তদন্তের ভিত্তিতে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার অধিকার কি রাষ্ট্রের থাকা উচিত? ফাঁসির দড়ি কি সমাজ থেকে অপরাধ কমিয়েছে, নাকি কেবল কিছু নিরপরাধ মানুষের জীবন আর তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করেছে?
‘সারভাইভিং ডেথ রো’ কেবল কিছু ছবির প্রদর্শনী নয়; এটি আমাদের ভঙ্গুর বিচারব্যবস্থা, আইনের ফাঁকফোকর এবং মানবিক মর্যাদার চরম লঙ্ঘনের এক জীবন্ত দলিল। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, একটি নির্দোষ মানুষের জীবনের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত বিচার আসলে কোনো বিচার নয়–তা নিছকই এক আইনি হত্যাকাণ্ড। 
নিবন্ধের আলোকচিত্র: মোশফিকুর রহমান জোহান

আরও পড়ুন

×