বাবার দীর্ঘ ছায়া, পরম মমতা
মায়ার ক্যানভাস
শিরীন হক
শিরীন হক, নারী অধিকারকর্মী এবং প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, নারীপক্ষ
প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
কিছু শূন্যস্থান কখনও পূরণ হয় না, কিছু স্মৃতি কখনও মলিন হয় না। যাঁর ছায়ায় একদিন আমরা নিশ্চিন্তে বড় হয়েছি, যাঁর আঙুল ধরে হাঁটতে শিখেছি জীবনের পথে, সেই মানুষটা আজ দূরে থাকলেও তাঁর ভালোবাসা জড়িয়ে আছে আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাসে। সেই বটবৃক্ষকে স্মরণ করে ‘বাবা দিবস’ উপলক্ষে আজকের এই আয়োজন...
আমার আব্বার কথা ভাবতে গেলেই মনে পড়ে–খুব সাধারণ একটি পরিবার থেকে উঠে এসে তিনি পরিণত হয়েছিলেন অসাধারণ এক মানুষে। তাঁর নাম রফিকুল হক। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনার প্রজন্মের একজন মানুষ হয়েও আপনি এতটা মুক্তমনা হলেন কী করে?’ মেয়ে হিসেবে তিনি আমাকে যে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন, তা ওই সময়ে রীতিমতো অভাবনীয় ছিল। সমাজের ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে তিনি কখনও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। আমার বান্ধবীদের জীবনে যখন হাজারো নিয়মের বেড়াজাল, তখন আমার জীবনে এসবের অস্তিত্ব ছিল না। বান্ধবীরা আক্ষেপ করে বলত, ‘ইশ! তোমার আব্বার মতো যদি আমার আব্বা হতো!’
আমার দাদা ছিলেন সন্দ্বীপের সাধারণ স্কুলশিক্ষক। আব্বার যখন দুই বছর বয়স, তখন তাঁর মা মারা যান। তাঁর নানা মাতৃহীন দুই ছেলের কথা ভেবে মেয়ের জামাইয়ের জন্য এমন একজনকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে বেছে নেন, যিনি নিজে সৎমায়ের সংসারে বড় হয়েছেন। দাদি সত্যিই তাঁর স্বামীর আগের ঘরের দুই সন্তানকে নিজের সন্তানের মতোই ভালোবেসেছেন। কিন্তু আব্বার খালা তাঁকে কোলে করে নিয়ে তাঁর মায়ের কবর দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘এখানে তোমার মা শুয়ে আছে, ওই বাড়িতে যে আছে সে তোমার মা নয়।’ এ ঘটনা আব্বার মনে এতটাই দাগ কেটেছিল, তিনি মায়ের সব দায়িত্ব পালন করলেও জীবনে কখনও সৎমাকে ‘মা’ ডাকতে পারেননি। এই কষ্ট তাঁকে সারাজীবন তাড়া করেছে।
দারুণ অর্থকষ্টে আব্বার শৈশব কেটেছে। আব্বার বড় ভাই নিজের পড়াশোনা বিসর্জন দিয়েছিলেন যেন ছোট ভাইটি অন্তত পড়তে পারে। সামর্থ্য না থাকায় মাদ্রাসায় পড়া বাবার সকালে মক্তবে যাওয়ার আগে জুটত এক গ্লাস পানিতে ভেজানো একটি ‘বেলা বিস্কুট’। মক্তব থেকে ফিরে এসে দেখতেন, বিস্কুটটি ফুলে গ্লাস ভর্তি হয়ে গেছে। আব্বা বলতেন, ‘মনে হতো, আমি তো আর একটা বিস্কুট খাচ্ছি না, পুরো এক গ্লাস বিস্কুট খাচ্ছি, তাতেই পেট ভরে যেত।’
কর্মজীবনে প্রকৌশলী হিসেবে বাবা ছিলেন সততার মূর্ত প্রতীক। দুর্নীতিপরায়ণ ঠিকাদাররা ভয়ে তাঁর ধারেকাছে ঘেঁষার সাহস পেত না। ফেনী বাইপাস নির্মাণের সময় রাস্তার মধ্যে একটি মসজিদ পড়ে যায়। রাস্তা না ঘুরিয়ে তিনি এক আলেমকে দিয়ে ফতোয়া দেওয়ালেন–বৃহত্তর জনস্বার্থে ও মানুষের চলাচলের সুবিধার্থে মসজিদ স্থানান্তর করা পাপ নয়। এরপর তিনি বুলডোজার দিয়ে সেটি ভেঙে রাস্তা সোজা করেছিলেন। ওই যুগে এটি ছিল অকল্পনীয় এক কাজ! আরেকবার ছাগলনাইয়ার শুভপুর ব্রিজ পরিদর্শনে গিয়ে দেখলেন, ঠিকাদার নির্মাণে কারচুপি করেছে। রাগের চোটে আব্বা সেই ঠিকাদারকে ব্রিজের ওপর থেকে সোজা নিচে পানিতে ফেলে দিয়েছিলেন।
আব্বা ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক অগ্রসর চিন্তার মানুষ। বিয়ের সময় আম্মা ছিলেন মাত্র ক্লাস সিক্স পাস। সংসার ও সন্তানের মধ্যেই আব্বা আম্মাকে পড়াশোনায় উৎসাহ দিয়েছেন। আমার ছোট বোন নাসরীনের বয়স তখন ছয় মাস। একদিন কলেজ থেকে ফিরে মা দেখেন, মেয়ের হাত ভেঙে গেছে। আম্মা পড়াশোনা ছাড়তে চাইলেন কিন্তু আব্বা অনড় থেকে বলেন, ‘না, পড়াশোনা বন্ধ করা যাবে না।’ তাঁর অটুট সমর্থনেই আম্মা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ এবং পরবর্তী সময়ে আরও একটি ডিপ্লোমা অর্জন করেন।
আব্বা তাঁর চার বোনকেও উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করতেন। আমেরিকা থেকে বোনদের নিয়মিত চিঠি লেখতেন। আমার ফুফুদের সেসব চিঠি মুখস্থ ছিল। বোরকাকে পশ্চাৎপদতার প্রতীক মনে করে দাদিকে বোরকা পরতে নিরুৎসাহিত করেছিলেন।
দুর্ভিক্ষের দিনগুলোয় চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। তখন বাড়িতে আমার এক ফুপা আর এক কাকা থাকতেন। সকালে তাদের খাওয়ার পর অনেক দিন আব্বাকে না খেয়ে কাজে যেতে হতো।
পঞ্চাশ দশকের শুরুর দিকে কুমিল্লায় আব্বার সখ্য গড়ে ওঠে কমরেড আসহাবউদ্দীন এবং আখতার হামিদ খানের সঙ্গে। সমাজতন্ত্রের স্বপ্নে বিভোর আসহাবউদ্দীন চাচা প্রায়ই আমাদের ঢাকার বাসায় রাত কাটাতেন। সারারাত গল্প-আড্ডা চলত। আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতাম। পরদিন সকালে স্কুল থাকলেও আব্বা কখনও আমাদের ঘুমাতে যেতে বলতেন না। তিনি বলতেন, ‘তাঁর কাছ থেকে তোমরা জীবনের যে পাঠ শিখবে, তা কোনো স্কুল শেখাতে পারবে না।’
আব্বা প্রচণ্ড রাগী মানুষ ছিলেন, কিন্তু পরক্ষণেই আবার যাকে বকেছেন তাকে ডেকে নিজের সঙ্গে খেতে বসাতেন। দুই ভাইয়ের পর আমি প্রথম কন্যা হওয়ায় একটু অতিরিক্ত আদরের ছিলাম। আমার জন্ম উপলক্ষে কুমিল্লা ক্লাবে আলোকসজ্জা করে অনুষ্ঠান করেছিলেন। অতিথিরা যেন কোনো উপহার না আনে তাঁর কড়া নির্দেশ ছিল, পাছে কনট্রাক্টররা উপঢৌকন দেওয়ার সুযোগ পায়।
আমার আব্বা ছিলেন এমনি এক আশ্চর্য বৈপরীত্যের মানুষ; যিনি নিয়মের ব্যাপারে ছিলেন কঠোর, আবার সমুদ্রের মতো উদার। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়, মানুষের আর দেশের কল্যাণে কাজ করতে হয়। তাঁর সাহসিকতা, সততা এবং মুক্তচিন্তার বীজই আজ আমাদের চলার পথের সবচেয়ে বড় পাথেয়।
- বিষয় :
- গল্প
