মায়ের দুধের বিকল্প নেই
মায়ের বুকের দুধ শিশুর শরীরে প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে / ছবি:: বোরহান আজাদ
আহাদ আদনান
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৫ | আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রাণিজগতে বর্তমানে স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রজাতির সংখ্যা সাড়ে ছয় হাজারেরও বেশি। বিস্ময়কর হলেও সত্য, এ বিপুলসংখ্যক প্রজাতির মধ্যে মানুষই একমাত্র প্রাণী, যারা নিজ সন্তানকে মায়ের দুধের বদলে কৃত্রিম বা বিকল্প দুধ পানে অভ্যস্ত করার চর্চা করেছে। একটি মানবশিশুর জন্য অন্তত জীবনের প্রথম ছয় মাস মায়ের বুকের দুধের কোনো বিকল্প নেই। তা জানা-বোঝা সত্ত্বেও মানবসমাজে কৃত্রিম দুধের ওপর নির্ভরশীলতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে আর এ জন্য সচেতন সমাজকে আজ রীতিমতো আন্দোলন করতে হচ্ছে। প্রতিটি শিশু যেন তার জন্মগত ও মৌলিক-মানবিক অধিকার ‘মায়ের দুধ’ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যেই প্রতিবছর আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ’।
মাতৃদুগ্ধ পানের পক্ষে বিশ্বব্যাপী এ সচেতনতার প্রয়োজন কেন পড়ল? এর নেপথ্যের ইতিহাস জানতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে অন্তত দেড় শতাব্দী আগে। ১৮৬৫ সালে জার্মানিতে এক বিজ্ঞানী প্রথমবারের মতো শিশুদের জন্য গরুর দুধ, গম, যব ও বিশেষ লবণের সংমিশ্রণে একটি বিকল্প খাদ্য তৈরি করেন। পরবর্তী কয়েক দশকে সুইজারল্যান্ডসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে এর বাণিজ্যিক উন্নয়ন ঘটতে থাকে। বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এ ধরনের কৃত্রিম দুধ বা ফর্মুলার প্রতি এক ধরনের ‘বৈজ্ঞানিক’ গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের অপচেষ্টা শুরু হয়। ইউরোপের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক স্বার্থে প্রচার করতে থাকে, এসব কৃত্রিম খাবার বুকের দুধের চেয়েও অধিক পুষ্টিকর, স্বাস্থ্যসম্মত এবং রোগ-প্রতিরোধী! শুধু তা-ই নয়, বুকের দুধ খাওয়ানোর মতো আদি ও অকৃত্রিম অভ্যাসটিকে তারা ‘পশ্চাৎপদ’, ‘অমার্জিত’ এবং ‘অনুন্নত শ্রেণির কাজ’ বলে উপহাস করতে শুরু করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশেষ করে ষাটের দশকে কৃত্রিম দুধের এই উন্মাদনা আমেরিকাতেও মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ে। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯০০ সালে যেখানে প্রসব-পরবর্তী ১০০ জন মায়ের মধ্যে ৯০ জনই শিশুকে শুধু বুকের দুধ খাওয়াতেন, ১৯৬০-এর দশকে সেই হার আশঙ্কাজনকভাবে ২০-২৫ শতাংশে নেমে আসে। গুঁড়া দুধ প্রস্তুতকারী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আগ্রাসী ব্যবসায়িক মানসিকতা নিয়ে চটকদার বিজ্ঞাপনে বাজার সয়লাব করে দেয়। ‘কৃত্রিম দুধই সেরা, নিরাপদ ও বিজ্ঞানসম্মত’– এমন বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সবার চোখ ধাঁধিয়ে যায়।
পশ্চিমা বিশ্বকে গ্রাস করার পর এই বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের থাবা বিস্তার করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকে। নিজেদের বাজার ধরতে তারা এক অভিনব ও অনৈতিক কূটকৌশলের আশ্রয় নেয়। নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীর ছদ্মবেশে তাদের প্রতিনিধিরা সদ্য প্রসূতি মায়েদের কাছে গিয়ে হাজির হতো। তারা বিনামূল্যে বা ‘ফ্রি স্যাম্পল’ হিসেবে কয়েক দিনের জন্য গুঁড়া দুধ দিয়ে আসত। সদ্যোজাত শিশু যখন বোতলের দুধে অভ্যস্ত হয়ে পড়ত এবং বুকের দুধ না টানার কারণে মায়ের দুধ প্রাকৃতিকভাবে কমে যেত, তখন সেই ছদ্মবেশী কর্মীরা সটকে পড়ত। নিরুপায় মা তখন বাধ্য হয়ে নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে কৌটার দুধ কিনতে শুরু করতেন।
বিশ্বব্যাপী সচেতন মহল কৌটার দুধের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলে সত্তরের দশকে। ফলে ১৯৮১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাধ্য হয় শিশুর বিকল্প খাবার বাজারজাতকরণ ও ব্যবহারের একটি কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করে। পরবর্তী সময়ে ইউনিসেফও এই উদ্যোগে শামিল হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ঠিক এক দশক পর, ১৯৯১ সালে মাতৃদুগ্ধ পানের পক্ষে বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত হয় ‘ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্স ফর ব্রেস্টফিডিং অ্যাকশন’। এ জোটের উদ্যোগেই ১৯৯২ সালে প্রথমবারের মতো উদযাপিত হয় ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ’। প্রথম বছর তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ‘শিশুবান্ধব হাসপাতাল উদ্যোগ’ গড়ে তোলা, যেখানে সন্তান প্রসবের পর মায়েদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয়, যেন নবজাতককে শুধু বুকের দুধই দেওয়া হয়। এ বছরও আগস্টের ১ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘জীবনের সূচনায় মাতৃদুগ্ধ পান: টেকসই উদ্যোগ করি বেগবান’।
একজন শিশু-রোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বলতে চাই, আমার কর্মস্থল ‘শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট’ একটি শতভাগ শিশুবান্ধব হাসপাতাল। এখানে কৌটার দুধের পক্ষে যে কোনো ধরনের প্রচারণা, উপহার, স্যাম্পল বা আর্থিক প্ররোচনা সম্পূর্ণ বেআইনি ও নিষিদ্ধ। এর পাশাপাশি আমরা একটি বিশেষায়িত ‘দুগ্ধদান সহযোগিতা কেন্দ্র’ পরিচালনা করে আসছি। বর্তমান সময়ে বুকের দুধের উপকারিতা এবং কৃত্রিম দুধের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে অধিকাংশ মা-ই অবগত। তবে আমাদের কেন্দ্রগুলোয় মায়েরা ভিন্ন কিছু বাস্তবিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসেন।
‘বাচ্চা বুকের দুধ পায় না’, ‘বাচ্চা ঠিকমতো দুধ টানে না’, ‘দুধ শুকিয়ে গেছে’, ‘দুধের বোঁটা ছোট বা ঘা হয়েছে’, ‘বাচ্চার পেট ভরে না’ কিংবা ‘আমাকে কাজের জন্য বাইরে যেতে হয়’– এমন অসংখ্য উদ্বেগজনক প্রশ্নের সম্মুখীন আমরা প্রতিনিয়তই হই। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাহায্যে আমরা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে এসব সমস্যার সমাধান করে থাকি। শিশুকে ঠিকমতো বুকে বসানোর কৌশল থেকে শুরু করে, পুনরায় দুধ নিঃসরণের প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে আমরা মায়েদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনি। ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে, সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রেখে আমাদের নারী চিকিৎসক ও সেবিকারা পরম মমতায় মায়েদের এই সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
জন্মের প্রথম ছয় মাস শিশুকে শুধু বুকের দুধ পান করানো এবং এরপর থেকে দুই বছর বয়স পর্যন্ত বুকের দুধের পাশাপাশি ঘরে তৈরি পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার মাধ্যমে একটি শিশুর শরীরে আজীবনের জন্য যে প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে, তার শারীরিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। মনে রাখতে হবে একটি সুস্থ, সবল ও মেধাবী আগামী প্রজন্ম গড়ে তুলতে মায়ের বুকের দুধের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ, ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড অ্যান্ড মাদার হেলথ, মাতুয়াইল, ঢাকা