ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আলো-ছায়ার জীবনশিল্পী সাইদা খানম

আলো-ছায়ার জীবনশিল্পী সাইদা খানম
×

লেখকের তোলা ছবিতে সাইদা খানম [২৯ ডিসেম্বর ১৯৩৭—১৮ আগস্ট ২০২০]

মুনিরা মোরশেদ মুন্‌নী

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০২ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

যে যুগে ক্যামেরা হাতে পুরুষেরও রাজপথে নামতে দ্বিধা হতো, সেই ষাটের দশকে রক্ষণশীল সমাজের শৃঙ্খল ভেঙে কাঁধে ক্যামেরা তুলে নিয়েছিলেন সাইদা খানম। তিনি কেবল বাংলাদেশের প্রথম পেশাদার নারী আলোকচিত্রীই ছিলেন না; ছিলেন এক অদম্য পথপ্রদর্শক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাসাহিত্য ও গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা এই গুণীর পারিবারিক ভিত্তিও ছিল গভীর। জয়নুল আবেদিনের প্রথমদিককার ছাত্রী মোহসিনা আলী থেকে শুরু করে বিশিষ্ট সুরকার আব্দুল আহাদের মতো ব্যক্তিত্বরা ছিলেন তাঁর পরিবারের আলো।

ক্যামেরার লেন্সের সামনে সাইদা খানম বন্দি করেছেন ইতিহাসের বহু কালজয়ী অধ্যায়– রানী এলিজাবেথ, পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালে অস্ত্র হাতে প্রশিক্ষণরত বাঙালি নারী ও যুদ্ধশিশুদের সঙ্গে মাদাম তেরেসা। বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পরিবারে ছিল তাঁর অবাধ যাতায়াত। তাদের ঘরোয়া মুহূর্ত ও শুটিংয়ের ছবি নিয়ে পরবর্তী সময়ে বইও প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

চিন্তা-চেতনায় সময়ের চেয়ে বহুদূর এগিয়ে থাকা এই অনন্যা নারী প্রথাগত দাম্পত্যের ছকে নিজেকে বাঁধেননি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অধীনে না থেকে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর ও স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন– নারী শুধুই গৃহকোণের সত্তা নয়, মানুষ হিসেবে একা ও স্বাধীন থাকার সিদ্ধান্ত সে নিতে পারে।

নব্বই সালের কথা। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এমফিল কোর্সের শিক্ষার্থী। একদিন সৈয়দ আকরম হোসেন স্যারের ক্লাস শেষ করে অনুজ বন্ধু স্বপ্নার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কলকাতা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি হওয়ার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ স্বপ্না এক শিক্ষকের জন্য ফুল নিয়ে আমাকেসহ তাঁর কক্ষের সামনে দাঁড়ায়। পাশের কক্ষটি ছিল আব্দুল হাই স্মৃতি পাঠাগার। সেখানে বসে সাইদা আপা দূর থেকে দেখছিলেন আমাদের দুজনকে।

দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও সেই শিক্ষক না আসায় স্বপ্না বলল, ‘চলেন, এই আপাকে ফুলটা দিয়ে দিই।’ আমরা আপাকে ফুল দেওয়া মাত্র তিনি বলেছিলেন, ‘যাকে দেবে ভেবেছিলে, তিনি আসেননি।’ আমরা ভীষণ লজ্জা পেলাম।

পরদিন আমি একা ফুল কিনে আপার কাছে গেলাম এবং বললাম, ‘আজকের এই ফুল শুধুই আপনার জন্য।’ আপা বললেন, ‘বসো।’ সেই যে বসলাম, এরপর থেকে হয়ে গেলাম আপার সর্বক্ষণের সঙ্গী। রিকশায় চড়ে ঘুরে বেড়াতাম আপার সঙ্গে। তিনি যেখানে যেতেন, ছায়ার মতো পাশে থাকতাম–আপার বাড়ি কিংবা তাঁর ভাইবোন ও বন্ধুদের বাড়িতে।

একবার আপা খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন, কোনোভাবেই রোগ নির্ণয় করা যাচ্ছিল না। আপার সঙ্গে আমি গেলাম ভারতে। তখন অনেক মজার মজার গল্প করতেন তিনি। সাইদা খানমের জীবনের গল্পগুলো ছিল যে কোনো উপন্যাসের চেয়েও রোমাঞ্চকর– পূর্ণিমা রাতে টাঙ্গায় করে তাজমহল দর্শন কিংবা হাওড়া স্টেশনে চলন্ত ট্রেনের নিচে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তে অলৌকিক হাত ধরে বেঁচে যাওয়া।

সেবার আপার বলা দুটো মজার গল্প শুনেছিলাম। তাঁর বয়স যখন ১৫-১৬ বছর, তখন আসামের ডুয়ার্সে খালার বাড়িতে মমতা আপা আর তিনি– দুই বোন এক মাসের জন্য বেড়াতে গেছেন। একদিন বিকেলবেলায় হাতির পিঠে চড়ে দুই বোন আর এক মামা কুমারগ্রাম জঙ্গল পেরিয়ে ঘুরতে গেছেন নদীর পারে চমৎকার সূর্যাস্ত দেখতে। ফেরার পথে হঠাৎ এক ময়ূর ডেকে উঠল। ময়ূর নাকি বিপদ দেখলে ডাকে! তাই ময়ূরের ডাকে হাতি ভয়ে কেঁপে উঠে পথ হারাল গভীর জঙ্গলে। মাহুত কিছুতেই পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। হাতি ঢুকে গেল আরও ঘন জঙ্গলে। এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। ভয়ে অস্থির দুই কিশোরী বোন। অবশেষে পথে দেখা মিলেছিল এক কাঠুরিয়ার। তাঁরই চিনিয়ে দেওয়া পথে সেবার নিরাপদে বাড়ি ফিরেছিলেন তারা।

আরেকদিন রাতের বেলা খালার ডাকবাংলো ধরনের দোতলা বাড়ি থেকে মানুষের হইচইয়ে জেগে ওঠেন তারা। খালার বাড়ির পাশেই এক গোয়ালঘরে গরু খেতে এসেছিল বিশাল এক বাঘ; সেই বাঘকে মেরেছেন গরুর মালিক। গভীর রাতের অন্ধকারে নিচে নেমে লণ্ঠনের আলোয় সাইদা আপা সেই কিশোরী বয়সে দেখেছিলেন বনের সদ্য মৃত অসম্ভব সুন্দর এক বাঘ আর আহত লোকটিকে। চিড়িয়াখানার বাঘের চেয়ে বনের সেই বাঘের সৌন্দর্য নাকি ছিল একেবারেই আলাদা!

লোভহীন, বিনয়ী ও নিরহংকার এই প্রবাদপ্রতীম আলোকচিত্রীর স্মৃতি ও জীবনদর্শন কেবল অতীতে থমকে থাকার নয়। তাঁর অদম্য সাহস, স্বনির্ভরতা এবং শিল্পের প্রতি আত্মনিবেদন আজও আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে এক চিরন্তন ও অমলিন অনুপ্রেরণার নাম।

আরও পড়ুন

×