ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স ম সা ম য়ি ক

নাগরিকের গায়ে হাত তোলার অধিকার কারও নেই

নাগরিকের গায়ে হাত তোলার অধিকার কারও নেই
×

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির, মানবাধিকার কর্মী / জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী, আইন ও সালিশ কেন্দ্র

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০৫ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:৫৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি ময়মনসিংহের ত্রিশালে বালুর ঘাটে ইজারাদারের এক কর্মীকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কর্তৃক চড়-থাপ্পড় ও লাঠি দিয়ে আঘাত করার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় এই অপ্রীতিকর ঘটনাটি ঘটে। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মূল দায়িত্ব হলো বিচারিক প্রক্রিয়ায় আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা। প্রশ্ন হলো, দেশের কোন আইনে বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের কোন বিধানে একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে কোনো নাগরিকের গায়ে হাত তোলার বা লাঠিপেটা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে?
----------------------------------------------------

রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যতম প্রধান কাজ হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের বিরুদ্ধে আইন ভঙ্গের অভিযোগ উঠতেই পারে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ বা বিচারের আওতায় আনার পূর্ণ আইনি এখতিয়ার রাষ্ট্রের রয়েছে। এই আইনি ক্ষমতা কোনোভাবেই কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকে নাগরিকের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার, তাঁকে অপমান করার বা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার লাইসেন্স দেয় না। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি অনভিপ্রেত ঘটনা আমাদের এই মৌলিক সত্যটি নতুন করে এবং কিছুটা রূঢ়ভাবেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

সম্প্রতি ত্রিশালে ঘটে যাওয়া একজন ম্যাজিস্ট্রেটের মারধরে ঘটনা কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন অনুষঙ্গ নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের বিচারহীনতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতির একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি মাত্র। কিছুদিন আগেই ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক সেবনের অভিযোগে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আটকের সময় পুলিশ সদস্যদের দ্বারা তাদের শারীরিকভাবে হেনস্তা করার দৃশ্য জনসমক্ষে আসে। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এই বেআইনি আচরণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রনেতাকেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে মারধরের শিকার হতে হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছ থেকে এমন আগ্রাসী আচরণ কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আধুনিক বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো–‘অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত যে কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ’। কেউ অপরাধ করেছেন–এমন অভিযোগ থাকলে তাঁকে আইনের আওতায় আনার সুনির্দিষ্ট ও সুপ্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি রয়েছে। অপরাধের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে যথাযথ তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ এবং বিচারিক আদালত। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণের আগেই কাউকে শাস্তি দেওয়া, অপমান করা কিংবা শারীরিকভাবে আঘাত করা হলে সেটি আর ‘আইন প্রয়োগ’ থাকে না; বরং তা সরাসরি ‘আইনের অপপ্রয়োগ’ এবং ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনে’ পরিণত হয়।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একজন সাধারণ নাগরিকের সাংবিধানিক মর্যাদা রাষ্ট্রের যে কোনো ক্ষমতার চেয়ে কোনো অংশেই ছোট নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইন অনুযায়ী ও কেবল আইন অনুযায়ী ব্যবহারলাভ যে কোনো স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য অধিকার।’ অন্যদিকে, ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে অত্যন্ত জোরালোভাবে বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না কিংবা কারও সাথে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না।’

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ মানবাধিকার রক্ষায় দায়বদ্ধ। বাংলাদেশ জাতিসংঘের ‘নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর আচরণ বা শাস্তিবিরোধী কনভেনশন’ (ইউএনসিএটি)-এর স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রপক্ষ। এই প্রতিশ্রুতির আলোকেই দেশে প্রণীত হয়েছে ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩’, যেখানে যে কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনকে সুস্পষ্ট ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য হোন কিংবা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট–রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সংযম, ধৈর্য এবং পেশাদারিত্ব প্রত্যাশিত। কাউকে আটক করতে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা একটি দাপ্তরিক প্রক্রিয়া, কিন্তু তাকে তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে মারধর করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো জবাবদিহির অভাব। এ ধরনের ঘটনা যদি বারবার ঘটতে থাকে এবং অভিযুক্তরা যদি পার পেয়ে যান, তবে সাধারণ নাগরিকের কাছে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক বার্তা পৌঁছায়–ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিরা বোধহয় আইনের সীমার ঊর্ধ্বে। অথচ, আইনের শাসনের মূল কথাই হলো–আইনের চোখে সবাই সমান এবং আইন প্রয়োগকারীকেও আইনের অধীনে থেকেই তার দায়িত্ব পালন করতে হবে। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার নাগরিকদের মনে ভীতি সঞ্চার করার ক্ষমতার মধ্যে নিহিত নয়; বরং নাগরিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা কতটুকু সুরক্ষিত থাকছে তার মধ্যেই রাষ্ট্রের শক্তির প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে। আইন প্রয়োগের নামে নাগরিকের গায়ে হাত তোলার এই ঔপনিবেশিক ও অগণতান্ত্রিক সংস্কৃতি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি এবং যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে–এই দেশে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন।

আরও পড়ুন

×