রান্নাঘরের শখ থেকে সফল উদ্যোগ
নীপা সাহা
লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৮ | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাঙালির হেঁশেল আর মসলা–এ যেন এক অবিচ্ছেদ্য যুগল। প্রতিদিনের রান্নায় স্বাদ, ঘ্রাণ আর তৃপ্তি আনতে মসলার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান বাজারে যখন ভেজালের ভিড়ে খাঁটি পণ্য খুঁজে পাওয়া দায়, তখন পরিবারের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে চিন্তিত থাকেন প্রতিটি গৃহিণী। ঠিক এই জায়গাটিতেই নিজের সততা আর পরিচ্ছন্নতার প্রতিশ্রুতি নিয়ে কাজ শুরু করেন নীপা সাহা। তাঁর উদ্যোগ ‘নীপাস রেসিপি’ আজ কেবল একটি ব্যবসাই নয়, বরং খাঁটি ও স্বাস্থ্যকর মসলার এক আস্থার নাম।
নীপা সাহার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্পটা গতানুগতিক নয়। ২০২০ সাল, বিশ্বজুড়ে তখন কভিড-১৯ এর ভয়াল থাবা। চারদিকে লকডাউন, গৃহবন্দি মানুষ। এই অবসরে নিজের পরিবারের জন্য বাজার থেকে আস্ত মসলা কিনে, ধুয়ে, রোদে শুকিয়ে নিজেই ভাঙিয়ে নিতেন নীপা। তাঁর এই পরিচ্ছন্নতার কথা কাছের মানুষেরা জানতেন। তাদের অনুরোধে কয়েকজনের জন্য মসলা তৈরি করে দেওয়া শুরু। এরপর যারা সে মসলা ব্যবহার করলেন, তাদের ইতিবাচক সাড়া নীপাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। মহামারির সেই স্থবির সময়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, প্রতিদিনের অপরিহার্য এই উপাদানটি নিয়ে তিনি কাজ করবেন।
মসলাকে বেছে নেওয়া প্রসঙ্গে নীপা জানান, অন্যান্য শৌখিন পণ্য মানুষের প্রতিদিন না-ও লাগতে পারে, কিন্তু মসলা প্রতিটি পরিবারের নিত্যদিনের প্রয়োজন। পরে মসলার পাশাপাশি ঘি, ডালের বড়ি এবং ঘরোয়া রান্নার ব্যবসাও যুক্ত করেছেন তিনি।
গতানুগতিক ৯টা-৫টার চাকরি করার কথা কখনও ভাবেননি নীপা। সংসার, একমাত্র মেয়ে, তার লেখাপড়া ও গান–এসব নিয়েই তাঁর ব্যস্ততা ছিল। নিজের পরিচয়ে কিছু একটা করার তাগিদ সবসময়ই অনুভব করতেন। মসলার ব্যবসা তাঁকে সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা দিয়েছে। তবে মসলার কাজ মোটেও সহজ নয়। বাজার থেকে সঠিক মানের কাঁচামাল কেনা, ধোয়া, রোদে শুকানো, ভাঙানো এবং প্যাকেট করে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া–প্রতিটি ধাপেই রয়েছে প্রচণ্ড শারীরিক শ্রম। এই নিরলস পরিশ্রমে নীপার সবচেয়ে বড় সহায়ক তাঁর স্বামী ও মেয়ে। পরিবারের এই সম্মিলিত প্রয়াসেই তিলে তিলে দাঁড়িয়েছে তাঁর উদ্যোগ। নিজের উপার্জিত অর্থ নিজের মতো করে খরচ করার যে স্বাধীনতা, তা তাঁকে আত্মবিশ্বাসী করেছে।
‘নীপাস রেসিপি’র মূল মন্ত্র বা ট্যাগলাইন হলো–‘পরিচ্ছন্নতা ও মানের সাথে কোনো আপস নয়।’ নীপা সাহা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ল্যাব টেস্ট করাননি ঠিকই, তবে তাঁর সবচেয়ে বড় ল্যাবরেটরি হলো তাঁর নিজের রান্নাঘর ও বিবেক। যে মসলা তিনি নিজের সন্তানের জন্য, নিজের পরিবারের জন্য ব্যবহার করেন, ঠিক সেই একই মসলা তিনি তুলে দেন গ্রাহকের হাতে।
বিজ্ঞাপন বা প্রথাগত মার্কেটিংয়ের চেয়ে নীপা ভরসা রেখেছেন মানুষের মুখে মুখে ছড়ানো সুনামের ওপর। যারা একবার তাঁর মসলা নিয়েছেন, তারাই বারবার ফিরে আসছেন। সন্তুষ্ট গ্রাহকরাই তাঁর পণ্যের প্রচার করছেন। বর্তমানে ব্যক্তিগতভাবে ডেলিভারি দেওয়ার পাশাপাশি ‘হ্যান্ডটাচ’-এর মতো দুটি প্রতিষ্ঠানের আউটলেটেও পাওয়া যাচ্ছে নীপার পণ্য।
ব্যবসার আকার এখনও খুব বেশি বড় নয়, লাভের অঙ্কটাও হয়তো বিশাল নয়। তাতে বিন্দুমাত্র হতাশ নন এই উদ্যোক্তা। শতভাগ ‘রিপিটেড কাস্টমার’ বা ফিরে আসা গ্রাহকরাই তাঁর বড় অর্জন। নীপা স্বপ্ন দেখেন, আগামী দশ বছরের মধ্যে ‘নীপাস রেসিপি’ দেশের একটি সুপরিচিত ব্র্যান্ডে পরিণত হবে। মানুষ যখনই বিশুদ্ধ মসলার কথা ভাববে, তখনই তাদের চোখে ভাসবে এই নামটি। পাশাপাশি নিজের এই উদ্যোগের মাধ্যমে আরও কিছু নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে চান তিনি, যাতে তারাও স্বাবলম্বী হতে পারেন।
যারা কৃষি বা খাদ্যপণ্য নিয়ে নতুন কাজ শুরু করতে চান, তাদের জন্য নীপা সাহার পরামর্শ অত্যন্ত বাস্তবমুখী। তাঁর মতে, সাময়িক বা বেশি লাভের আশায় কখনোই পণ্যের মান খারাপ করা যাবে না। খাদ্যপণ্য নিত্যদিনের জিনিস, তাই মান ভালো হলে মানুষ বারবার কিনবে। এছাড়া শুরুর দিকে এমন একটি ‘সাপোর্ট গ্রুপ’ তৈরি করতে হবে, যারা পণ্যের সঠিক মূল্যায়ন করবে এবং অন্যের কাছে প্রচার করবে।
বর্তমান যুগে ব্যবসার প্রসারে অনলাইন উপস্থিতির কোনো বিকল্প নেই। নীপা স্বীকার করেন, মেয়ের পড়াশোনার কারণে অনলাইনে তিনি এখনও সেভাবে সময় দিতে পারেননি। তবে মেয়ের এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলেই অফলাইনের পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও ‘নীপাস রেসিপি’কে জোরালোভাবে উপস্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
সততা, পরিশ্রম আর ইচ্ছাশক্তি থাকলে যে রান্নাঘরের শখকেও একটি সফল পেশায় রূপ দেওয়া যায়, নীপা সাহা তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর এই পথচলা অনুপ্রেরণা জোগাবে হাজারো নারীকে, যারা নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস খুঁজছেন।
- বিষয় :
- লাবণী মণ্ডল
- নারী উদ্যোক্তা