ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইয়াসমিন ধর্ষণ-হত্যার ৩১ বছর

বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক বিভাজন ও নারী নিরাপত্তার সংকট

বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক বিভাজন ও নারী নিরাপত্তার সংকট
×

খুশী কবির

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫০ | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের সমাজে আজ নারী–তার বয়স, শ্রেণি, পেশা কিংবা ভৌগোলিক অবস্থান যাই হোক না কেন–এক ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে দিন যাপন করছে। গ্রাম থেকে শহর, গৃহকোণ থেকে রাজপথ–কোনো স্থানই যেন আজ নারীর জন্য নিরাপদ নয়। অতীতেও নারীরা ভয়াবহ নিপীড়ন, যৌন সহিংসতা ও নৃশংসতার শিকার হয়েছেন। তবে বর্তমান সময়ে এসে এই সহিংসতা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং সমাজদেহে এক সংক্রামক মহামারির মতো বিস্তার লাভ করেছে।

আজ থেকে ৩১ বছর আগের সেই কালরাত্রির কথা মনে পড়ে। ১৯৯৫ সালের ২৩ আগস্ট দিবাগত রাতে দিনাজপুরের দশমাইল এলাকায় ঘটে যাওয়া ‘ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ড’ আমাদের জাতীয় বিবেককে তীব্রভাবে নাড়া দিয়েছিল। মাত্র ১৪ বছরের এক হতদরিদ্র কিশোরী ইয়াসমিন, যে ঢাকার গৃহপরিচারিকার বন্দিজীবন থেকে পালিয়ে ব্যাকুল হয়ে ফিরছিল মায়ের কোলে। বাসের পরিবহন শ্রমিকরা অত্যন্ত মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে মেয়েটিকে নিরাপদ মনে করে স্থানীয় এক চায়ের দোকানে বসিয়ে রেখেছিল ভোর হওয়ার অপেক্ষায়। কিন্তু রক্ষকই সেখানে ভক্ষকের রূপ নিল। টহলরত পুলিশ সদস্যরা তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যা করল।

ঘটনার পর পুলিশ নিজেদের জঘন্য অপকর্ম ঢাকতে অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে ইয়াসমিনকে ‘যৌনকর্মী’ বলে চরিত্রহননের অপচেষ্টা চালায়। গণমানুষের ক্ষোভ তখন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়েছিল। প্রশ্ন উঠেছিল–কোনো নারী যদি যৌনকর্মীও হন, তাহলেও কি তাঁকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যা করার অধিকার রাষ্ট্রের বা কারও আছে? অপরাধ তো শুধুই অপরাধ। তা ছাড়া ইয়াসমিন তো কোনোভাবেই ‘যৌনকর্মী’ ছিল না! স্থানীয় মানুষ জানত মেয়েটি কে, কার সন্তান। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের মেয়ে ছিল ইয়াসমিন; মা ঠিকমতো দুবেলা ভাত দিতে পারতেন না বলে পরিচিত এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে তাকে গৃহপরিচারিকার কাজের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। 

দিনাজপুরের আপামর জনতা অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠে, আর আন্দোলন দমাতে পুলিশ গুলি চালিয়ে সাতজন প্রতিবাদীকে হত্যা করে। সেদিন এক তীব্র ক্ষোভ ও বেদনায় একজোট হয়েছিলাম। সেই সময়ে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে বিশ্ব গণমাধ্যমের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। সেখানে আমাদের প্রতিনিধি দল ব্যানার-ফেস্টুন হাতে তৎকালীন সরকারের জবাবদিহি দাবি করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছিল। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা ভুলে সব নারী সংগঠন, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক ও আইনজীবীরা এক ছাতার নিচে এসেছিলেন। আইজিপির ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে অভিযুক্তদের বরখাস্ত করা, মামলা বগুড়ার বদলে রংপুরে স্থানান্তর এবং শেষ পর্যন্ত ঘাতক পুলিশ সদস্যদের বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছিল।

তবে আজকের বাস্তবতার দিকে তাকালে গভীর হতাশায় আচ্ছন্ন হতে হয়। ইয়াসমিন ট্র্যাজেডির পর ২০১৬ সালে কুমিল্লা সেনানিবাসে সোহাগী জাহান তনু হত্যা, ২০১৯ সালে ফেনীর নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে মারা কিংবা ২০২০ সালে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ভয়াবহ নির্যাতন–আমাদের অপরাধের সেই একই নারকীয় রূপ দেখায়। তনু হত্যাকাণ্ডের সময় শাহবাগে লাখো মানুষের আন্দোলন ও অভূতপূর্ব জনমত তৈরি হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কাঠামোর কাছে বিচার অধরা থেকে গেছে। অন্যদিকে, নুসরাতের ঘটনায় সুদৃঢ় প্রতিবাদী আন্দোলন ও চাপ থাকার কারণে অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি হয়েছে। এমনকি বেগমগঞ্জের নির্যাতিত নারীও স্থানীয় সামাজিক সমর্থন ও পরিবারের পাশে থাকার কারণে আজ মাথা উঁচু করে বেঁচে আছেন।

প্রশ্ন ওঠে, ইয়াসমিনের সময় যে আন্দোলন সাফল্য এনেছিল, আজ তা কেন বারবার থমকে যাচ্ছে?

প্রথমত, আমাদের সমাজ আজ চরমভাবে মেরূকৃত ও রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথে নামার আগে ‘আমি কার সাথে যাব বা যাব না’–এমন দ্বিধা আমাদের শক্তিকে খণ্ডিত করছে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি ও আইনের শাসনের গুরুতর অবক্ষয় ঘটেছে। রাজপথে একশ্রেণির হিংস্র, উগ্র ও নারীবিদ্বেষী গোষ্ঠীর আস্ফালন দেখা যাচ্ছে, যাদের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক সময় নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। তৃতীয়ত, বিচারহীনতার দীর্ঘ সংস্কৃতির কারণে অপরাধীদের মনে কোনো ভয়ডর অবশিষ্ট নেই।

ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডের পর হওয়া আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছিল–অন্যায়ের বিরুদ্ধে যদি স্থানীয় সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, সমাজ ও পরিবার যদি ভুক্তভোগীর পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়ায় এবং নাগরিক সমাজ যদি সব বিভেদ ভুলে ঐক্যের বার্তা দেয়, তবে রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতে বাধ্য করা সম্ভব।

আজ নারী, তথা সমাজকে নিরাপত্তার সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে আমাদের এই সামাজিক ও রাজনৈতিক মেরূকরণ ভাঙতেই হবে। দল-মত নির্বিশেষে বিচারহীনতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া নারী নির্যাতন ও বর্বরোচিত সহিংসতার পথ রুদ্ধ করা অসম্ভব। 

লেখক: মানবাধিকার কর্মী, সমন্বয়ক, নিজেরা করি

আরও পড়ুন

×