মার্কিন বাজারে নতুন শুল্কহার
পোশাকবহির্ভূত খাতেও সম্ভাবনা
.
আবু হেনা মুহিব
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৩৫ | আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০২৫ | ০৭:৪৬
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ‘পাল্টা শুল্ক’ শেষ পর্যন্ত দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি চিত্র পাল্টে দিতে পারে। প্রতিযোগী অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পণ্যে শুল্ক এখন বেশ সহনীয়। মার্কিন কাঁচামাল বিশেষত তুলার ব্যবহারসহ বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ বলছে, প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক বেশ সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। এ ধরনের কাঁচামালে উৎপাদিত পণ্যে পাল্টা শুল্ক আর ধার্য হচ্ছে না। পোশাকবহির্ভূত খাতে কাঁচামাল ব্যবহারের এ সুযোগ হয়তো কম। তবে প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর পণ্যে বাংলাদেশের পণ্যের চেয়ে বেশি শুল্কহার থাকার সুবিধা পাওয়া যাবে। তৈরি পোশাকের বাইরে বিভিন্ন পণ্যে ভারত, ভিয়েতনাম, চীন, মালয়েশিয়া বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের একক বৃহত্তম বাজার। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয় ৮৬৯ কোটি ২৪ লাখ ডলারের পণ্য, যা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ১৮ শতাংশ। এর মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৭৫৪ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে একক পোশাকের হিস্যা ৮৮ শতাংশ। বাদবাকি ১২ শতাংশ পোশাকবহির্ভূত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে হারমোনাইজ বা এইচএস কোড ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পণ্যের শ্রেণি বিভাগ, শুল্ক নির্ধারণ এবং পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে থাকে। দুই ডিজিটের এইচএস কোড অনুযায়ী, মোট ৯৮ ধরনের পণ্য বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। পোশাকবহির্ভূত পণ্যের মধ্যে হোম টেক্সটাইল, ক্যাপ, প্লাস্টিক পণ্য, ফার্নিচার, সিরামিক ও ওষুধ উল্লেখযোগ্য।
হোম টেক্সটাইল
পোশাক খাতের সমজাতীয় পণ্য হোমটেক্স বা হোম টেক্সটাইল। গত অর্থবছর যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ কোটি ১৬ লাখ ডলারের হোম টেক্সটাইল পণ্য রপ্তানি হয়। বিশ্ববাজারে মোট রপ্তানি হয় ৮৭ কোটি ডলারের বিভিন্ন হোম টেক্সটাইল পণ্য। গত বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হওয়া পাল্টা শুল্কের আগে যুক্তরাষ্ট্রে হোম টেক্সটাইলে শুল্ক ছিল ৪ থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ। নতুন করে ২০ শতাংশ যোগ হওয়ায় শুল্ক দাঁড়িয়েছে ২৪ থেকে সাড়ে ২৬ শতাংশের মধ্যে।
গত অর্থবছর এ খাতের রপ্তানি বেড়েছে আড়াই শতাংশের মতো। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে হোম টেক্সটাইলের অবস্থান তৃতীয়। সরাসরি পোশাকের অংশ না হলেও গৃহসজ্জার বিভিন্ন সামগ্রী যেমন– বিছানার চাদর, বালিশের কভার, পর্দা, কার্পেট, টেবিল ক্লথ, কুশন, টাওয়েল ইত্যাদি এর অন্তর্ভুক্ত। চীন এখন এসব পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রধান রপ্তানিকারক। ভারত অন্যতম রপ্তানিকারক দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এ দেশ
দুটির জন্য শুল্ক বাংলাদেশের দ্বিগুণের
বেশি। একই সঙ্গে প্রসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী, সেখানকার ন্যূনতম ২০ শতাংশ কাঁচামাল ব্যবহার হলে তুলার মূল্য পরিমাণ অংশে পাল্টা শুল্কছাড়ের বাড়তি সুবিধাও প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখবে। কারণ হোম টেক্সটাইলে তুলার ব্যবহার বেশি।
জানতে চাইলে হোম টেক্সটাইলে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান নোমান গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, পাল্টা শুল্ক ঘোষণার পর মার্কিন পুরোনো অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান আবার ফিরে এসেছে। নতুন ক্রেতারাও যোগাযোগ করছেন। নতুন শুল্ক কাঠামোতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে হোম টেক্সটাইলের একটা ভালো সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ন্যূনতম ২০ শতাংশ কাঁচামাল ব্যবহার হলে তুলার মূল্য পরিমাণ অনুপাতে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা শুল্কছাড় সুবিধা দেবে আমাদের। হোম টেক্সটাইলে তুলার ব্যবহার বেশি।
তবে তিনি বলেন, চুক্তি না হওয়ার আগ পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না প্রক্রিয়াটা কেমন হবে। যদিও মার্কিন তুলার দাম কিছুটা বেশি। আমদানিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে চার মাসের মতো সময় লেগে যায়। এ চার মাস অর্থ আটকে থাকাসহ এ রকম কিছু বিষয় আমলে নিলে খুব বেশি যে মুনাফা করা যাবে তা বলা যায় না। এর বাইরে ৪০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের কথাও শোনা যাচ্ছে। এসব মিলিয়ে মার্কিন বাজার সুবিধা কাজে লাগাতে আমাদের এখন বড় বিনিয়োগ দরকার। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ, প্রতিযোগিতামূলক দর নির্ধারণ, ব্যাংকিং সহায়তাসহ প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা দরকার।
প্লাস্টিক পণ্য
যুক্তরাষ্ট্রে প্রধান প্রতিযোগী ভারত এবং চীনের চেয়ে কম শুল্ক থাকায় বাংলাদেশের প্লাস্টিক রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। গত অর্থবছর যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ থেকে এক কোটি ৪১ লাখ ডলারের বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি হয়। বিশ্ববাজারে বছরে ২৫ কোটি ডলারের মতো রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। পলিওলেফিন উৎপাদন সুবিধা না থাকলেও বর্তমানে দেশের প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ১৪২টির বেশি পণ্য তৈরি করছে। বাংলাদেশ প্রধানত ফিল্ম প্লাস্টিক, গৃহস্থালি সামগ্রী ও গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ রপ্তানি করে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিপিজিএমইএর সভাপতি শামীম আহমেদ সমকালকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক কাঠামো দেশটিতে বাংলাদেশের প্লাস্টিক পণ্যের বাজার প্রবেশ সহজ করবে। কারণ ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক জারির আগে পণ্যভেদে গড় শুল্ক ছিল ১৫ শতাংশ। এখন ৩৫ শতাংশ, যা বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী ভারত ও চীনের চেয়ে কম। প্রতিযোগিতামূলক শুল্কহার বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখবে।
তিনি জানান, বাংলাদেশ সাধারণত মৌলিক মানের কম দামের প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রে, যার বড় একটা অংশই ‘ওয়ান ডলার’-এর শোরুমে বিক্রি হয়ে থাকে। অর্থাৎ বেশির ভাগ পণ্যের দরই এক ডলারের নিচে। ভিত্তিমূল্য কম হওয়ায় ভোক্তা পর্যায়ে শুল্কহারও খুব বেশি হবে না। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ছোট খেলনা, বল ইত্যাদি আইটেম। দুই থেকে পাঁচ ডলার পর্যন্ত কিছু খেলনা রপ্তানি হয় দেশটিতে। সেসব পণ্যে ভোক্তা পর্যায়ে শুল্ক এখনকার তুলনায় বেশ ভালোই বাড়বে। এসব পণ্যের চাহিদা হয়তো কিছুটা কমতে পারে। এ প্রতিযোগিতামূলক শুল্কহার প্রাপ্তির বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার এবং সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য
বিভিন্ন ধরনের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে গত অর্থবছর মোট রপ্তানি আয় এসেছে ১১৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের পাদুকা রপ্তানিতে এসেছে ৬৭ কোটি ডলারের বেশি। শুধু চামড়া রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ডলারের। গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের চামড়া ও চামজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৪০ কোটি ডলারের। এর মধ্যে শুধু ফুটওয়্যার রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৩১ কোটি ডলারের।
তৈরি পোশাকের মতোই যুক্তরাষ্ট্রে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে আগে ১৬ শতাংশ শুল্ক ছিল। পাল্টা শুল্কহার কার্যকর হওয়ার পর এখন তা ৩৬ শতাংশে দাঁড়াল। তবে চামড়াবিহীন বিভিন্ন ধরনের পাদুকায় শুল্কহার অনেক বেশি। বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা রয়েছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ না থাকা, ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের (সিইটিপি) ত্রুটি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থায় ঘাটতি ইত্যাদি সমস্যার কারণে বাংলাদেশের চামড়াশিল্প পিছিয়ে পড়ছে বলে মনে করেন এই খাতের উদ্যোক্তারা। তাঁরা বলেন, দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় শিল্প চামড়া খাত। বৈশ্বিক বাজারেও চামড়াজাত পণ্যের বেশ বড় চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এই খাতের একটি বড় সমস্যা হলো দেশের প্রক্রিয়াজাত চামড়ার আন্তর্জাতিক মান না থাকা। একে বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ থেকে চামড়া নিতে নিরুৎসাহিত হন। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিশোধন ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকার কারণে এই সনদ পাচ্ছে না ট্যানারি প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে ব্যাপক সুযোগ এবং সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে জায়গা করে নিতে পারছে না বাংলাদেশের চামড়াশিল্প। চামড়ার বাইরে কৃত্রিম চামড়ার জুতার জোড়ায় ৯০ সেন্ট এবং মূল্যের ওপর ২০ শতাংশ হারে শুল্ক আদায় করে যুক্তরাষ্ট্র। পানিরোধী প্লাস্টিক বা রাবারের জুতায় যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি শুল্ক সাড়ে ৩৭ শতাংশ। পাল্টা শুল্ক যুক্ত হওয়ার পর তা দাঁড়ায় সাড়ে ৫৭ শতাংশ।
অন্যান্য পণ্য
যুক্তরাষ্ট্রে আরও বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হয় বাংলাদেশ থেকে। এগুলোতেও আগামীতে বেশ সম্ভাবনা দেখছেন রপ্তানিকারকরা। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হচ্ছে হেড গেয়ার বা বিভিন্ন ক্যাপ, হেলমেট ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পণ্য। গত অর্থবছর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এ ধরনের পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ২৬ কোটি ডলারের। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাখির পালক, কৃত্রিম ফুল, মানবচুলের তৈরি পণ্য রপ্তানি করে গত অর্থবছর প্রায় ১২ কোটি ডলার এসেছে। গত অর্থবছর যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরনের ফার্নিচার রপ্তানি করে প্রায় চার কোটি ডলার এসেছে।
বিশ্বের ১৫৭ দেশে বর্তমানে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও ওষুধসহ বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্য রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। গত অর্থবছর রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ৮৩ লাখ ডলারের। উল্লেখ্য, রপ্তানিতে ১০ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। দেশে বর্তমানে ২৮৪টি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি নিবন্ধিত, যার মধ্যে ২২৯টি সক্রিয়ভাবে উৎপাদনে রয়েছে। চাহিদার ৯৮ শতাংশই জোগান দেয় এসব কোম্পানি। এ বাজারের প্রায় ৭১ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে শীর্ষ ১০টি কোম্পানি।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর বাংলাদেশ থেকে ১ কোটি ১৮ লাখ ৩৬ হাজার ডলার পরিমাণ তামাক ও তামাক পণ্য রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে। মার্কিন বাণিজ্য কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে সবচেয়ে বেশি শুল্ক দিতে হয় বিভিন্ন ধরনের তামাক পণ্যে। তামাকে গড় শুল্কহার ছিল ৩৫০ শতাংশ ছিল। এখন নতুন করে ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক যুক্ত হওয়ায় তা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৩৭০ শতাংশে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ মার্কিন ডলার মূল্যের তামাক পণ্যে শুল্ক দিতে হবে ৩৭০ ডলার। ২০১৯ সাল পর্যন্ত তামাক রপ্তানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা ছিল। ২০২০ সালে এই শুল্ক প্রত্যাহার করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তারপর থেকে প্রতিবছর তামাক রপ্তানি বাড়ছে। তামাক চাষও বেড়েছে এতে।
- বিষয় :
- পোশাক শিল্প
- শুল্ক
- যুক্তরাষ্ট্র
