জিআই পণ্যের ব্র্যান্ডিং নেই মিলছে না বাণিজ্যিক সুফল
.
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:২০
ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই স্বীকৃত পণ্যের দেশীয় নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যথেষ্ট এগিয়েছে। কিন্তু এসব পণ্যে দেশের অধিকার নিশ্চিত করা ও পণ্যগুলোকে বিদেশে জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে জিআই স্বীকৃত পণ্যের ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে না। রপ্তানিও হচ্ছে না উল্লেখযোগ্যভাবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পণ্যের ব্র্যান্ডিং, বাজারে প্রবেশ, জিআই ট্যাগ, জিআই ট্যাগ ব্যবহার নীতি, খাতভিত্তিক কৌশল, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অতিরিক্ত পরিবহন খরচসহ নানা কারণে রপ্তানি বাড়ছে না। তাছাড়া পণ্যের প্রচার ও প্রসার হচ্ছে খুব কম। ফলে স্থানীয় ও বিশ্ববাজারে পরিচিতি পাচ্ছে না জিআই পণ্য। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, ব্যবসায়ী সংগঠন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ অংশীজনের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় জিআই স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভাবনাময় এসব পণ্য থেকে বাংলাদেশ কোনো সুফল পাচ্ছে না। তাদের মতে, স্বাদ ও মানের দিক থেকে বাংলাদেশের পণ্য মানসম্পন্ন। তবুও যথাযথ সার্টিফিকেশনের অভাবে বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরে পণ্য আটকে যায়। যদি আমদানিকারক দেশগুলোর সার্টিফিকেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সমঝোতা করা না যায়, তাহলে জিআই ট্যাগ কোনো কাজে আসবে না। এ জন্য জিআই পণ্য উৎপাদনকারীদের একটি অ্যাসোসিয়েশন বা সংগঠন গঠন করা জরুরি।
খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার যথাযথ উদ্যোগ নিলে দেশের জিআই পণ্যকে বিশ্ব দরবারে সমাদৃত করে তোলা সম্ভব। এ জন্য রপ্তানিতে আর্থিক প্রণোদনা, সরকারিভাবে হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন, বিমান ভাড়া কমানো, বিভাগীয় পর্যায়ে ল্যাবরেটরি স্থাপন ইত্যাদি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। তাছাড়া জিআই পণ্যের আবেদন প্রক্রিয়া জটিল। ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আবেদন করতে পারে না। আবেদন প্রক্রিয়া আরও সহজ করা প্রয়োজন।
জিআই পণ্য কী
জিআই মানে, জিওগ্রাফিক্যাল আইডেন্টিফিকেশন বা ভৌগোলিক নির্দেশক। এই স্বীকৃতি দিয়ে থাকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেড মার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি)। জিআই হলো এমন একটি স্বীকৃতি, যা কোনো পণ্যের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার বিশেষ গুণগত মান বা খ্যাতি নির্দেশ করে। এটি পণ্যের ভালো দাম পেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউআইপিও) এক বিশ্লেষণ অনুসারে, সাধারণত ক্রেতারা পণ্য কেনার সময় সেগুলোর উৎসকে বেশি গুরুত্ব দেন। আর পণ্যের উৎস ও সত্যতার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দেয় জিআই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর ওপর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ববাজারে জিআই স্বীকৃত পণ্যের দাম একই ধরনের পণ্যের তুলনায় সাধারণত ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ১৯৮৫ সালে ডব্লিউআইপিওর সদস্যপদ পায়। কিন্তু এখনও লিসবন সিস্টেমের (যা জিআইর বহুজাতিক নিবন্ধন ব্যবস্থা) সদস্য নয়। এই ব্যবস্থায় একবার জিআই নিবন্ধন করলে অনেক দেশে একসঙ্গে সুরক্ষা পাওয়া যায়। এটা পণ্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বাজার সম্প্রসারণে সাহায্য করে।
এখনও তৈরি হয়নি জিআই পণ্যের ট্যাগ
জিআই পণ্যের বাণিজ্যিকীকরণ ও উৎপাদনকারীদের সংঘবদ্ধ করার তাগিদ দেন বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) গবেষণা পরিচালক ড. ওয়াসেল বিন সাদাত। তিনি বলেন, জিআই পণ্যের নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় সাফল্য দেখা গেলেও, প্রায় ৯০ শতাংশ আবেদনই এসেছে সরকারের পক্ষ থেকে। জিআই পণ্যের ব্র্যান্ডিং, বাজার ও রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়াতে জিআই ট্যাগ, জিআই ট্যাগ ইউজার পলিসি, খাতভিত্তিক কৌশল, সার্টিফিকেশন ও ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম চালু করা জরুরি বলে মনে করেন এই গবেষক।
জিআই পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ আইপি ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ব্যারিস্টার হামিদুল মিসবাহ। সমকালকে তিনি বলেন, ট্যাগ দেখেই ক্রেতা পণ্য কেনেন।
তাই জিআই পণ্যের ট্যাগ বা স্টিকার থাকতে হবে। কিন্তু এটা এখনও করা সম্ভব হয়নি। পণ্যের
বিদ্যমান অবস্থানকে বৈচিত্র্যময় করে তুলতে হবে। অর্থাৎ, এর বহুমুখী ব্যবহার বাড়াতে হবে। রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেওয়া জরুরি। জিআই পণ্যের মোট দামের অন্তত ১৫ শতাংশ অংশীজনের মধ্যে বিতরণ করতে হবে।
উদ্যোক্তাদের চোখে যেসব সমস্যা
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ সমকালকে বলেন, জিআই সনদ প্রাপ্তি একটি বড় অর্জন। কিন্তু বাজারজাতকরণ ও মুনাফা নিশ্চিত করতে আরও কৌশলগত পদক্ষেপ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকার ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডিং এবং ক্যাম্পেইন (এক জেলা এক পণ্য) চালু করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাঁর পরামর্শ, বিশ্ববাজারে লবি সংগঠিত করতে হবে এবং ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে বাণিজ্য সংগঠনের সহায়তা নিতে হবে। রপ্তানি প্রক্রিয়া অটোমেশনের করার মাধ্যমে স্বল্প খরচে পরীক্ষার মাধ্যমে সহজে সনদ প্রাপ্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের জন্য বাজার প্রবেশ সহজ করতে হবে। পাশাপাশি রপ্তানিকারকদের জন্য বিকল্প প্রণোদনা ও বীমা সুবিধা চালু করতে হবে, যাতে তারা ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে পারে।
কৃষিপণ্যের মধ্যে ২০১৭ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের চার প্রজাতির আম জিআই সনদ পেয়েছে। কিন্তু আশানুরূপ রপ্তানি হচ্ছে না। চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ সমকালকে বলেন, জিআই সনদ পেলেও তিনটি প্রধান কারণে রপ্তানি সেভাবে বাড়ছে না। যেমন–আমের গুণগত মান অক্ষুণ্ন রাখতে পর্যাপ্ত হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট দরকার। এ ধরনের একটি মেশিন স্থাপন করতে দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা দরকার, যা উদ্যোক্তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আরেক যন্ত্রণা বিদেশে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে। কারণ, ভারত-পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে কার্গো বিমান ভাড়া প্রায় তিন গুণ বেশি। এ ছাড়া প্যাকেজিং করার আগে ঢাকার শ্যামপুরে ল্যাবে আম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। এতেও ব্যয় বেড়ে যায়।
জিআই নিবন্ধনের প্রক্রিয়া
নিবন্ধনের জন্য প্রথমে আবেদন করতে হবে। পণ্যের উৎপাদনকারী, আহরণকারী, প্রস্তুতকারী বা প্রক্রিয়াজাতকারী ডিপিডিটিতে আবেদন করতে পারেন। ডিপিডিটির নির্ধারিত ফরমে প্রয়োজনীয় তথ্য, প্রমাণসহ আবেদন করতে হবে। নিবন্ধন পেতে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ফি প্রদান করতে হবে। এরপর ডিপিডিটি আবেদনপত্রটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করবে। সংশ্লিষ্ট পণ্যের ভৌগোলিক নির্দেশক হিসেবে যোগ্যতার প্রমাণাদি পরীক্ষা করা হবে। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে আইন অনুযায়ী নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
বাংলাদেশের জিআই পণ্য ৬০টি
ভৌগোলিক নির্দেশক (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন-২০১৩ প্রণয়নের পর থেকে দেশে ৬০টি পণ্যকে জিআই হিসেবে নিবন্ধিত করা হয়েছে। ডিপিডিটির ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের প্রথম জিআই স্বীকৃত পণ্য হলো নারায়ণগঞ্জে শত শত বছর ধরে উৎপাদিত জামদানি শাড়ি। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে জামদানি শাড়িকে এই সনদ দেওয়া হয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত ৬০টি পণ্যকে জিআই সনদ দেওয়া হয়েছে। পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে– টাঙ্গাইল শাড়ি, জামালপুরের নকশিকাঁথা, গোপালগঞ্জের রসগোল্লা, রাজশাহীর মিষ্টি পান, নরসিংদীর অমৃত সাগর কলা, যশোরের খেজুরের গুড়, মুক্তাগাছার মণ্ডা, মৌলভীবাজারের আগর আতর, মৌলভীবাজারের আগর, রংপুরের হাঁড়িভাঙা আম, কুষ্টিয়ার তিলের খাজা, কুমিল্লার রসমালাই, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম, বাংলাদেশের ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আশ্বিনা আম, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ল্যাংড়া আম, শেরপুরের তুলসীমালা ধান, বগুড়ার দই, বাংলাদেশের শীতলপাটি, বাংলাদেশের বাগদা চিংড়ি, রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আম, ঢাকাই মসলিন, রাজশাহী সিল্ক, রংপুরের শতরঞ্জি, বাংলাদেশের কালিজিরা, দিনাজপুরের কাটারিভোগ, বিজয়পুরের সাদামাটি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরশাপাতি আম, বাংলাদেশের ইলিশ ইত্যাদি।
চলতি বছরের এপ্রিলে একসঙ্গে ২৪টি পণ্যকে জিআই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে যথাক্রমে– সিরাজগঞ্জের গামছা, সিরাজগঞ্জের লুঙ্গি, মিরপুরের কাতান শাড়ি, সিলেটের মণিপুরি শাড়ি, কুমিল্লার খাদি, কুমারখালীর বেডশিট, ঢাকাই ফুটি কার্পাস তুলা, ঢাকাই ফুটি কার্পাস তুলার বীজ ও গাছ, টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের জামুর্কির সন্দেশ, নওগাঁর নাক ফজলি আম, মুন্সীগঞ্জের পাতক্ষীর, দিনাজপুরের বেদানা লিচু, বরিশালের আমড়া, অষ্টগ্রামের পনির, কিশোরগঞ্জের রাতা বোরো ধান, গাজীপুরের কাঁঠাল, শেরপুরের ছানার পায়েস, সুন্দরবনের মধু, গোপালগঞ্জের ব্রোঞ্জের গহনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী মিষ্টি, মাগুরার হাজরাপুরী লিচু, ভোলার মহিষের দুধের কাঁচা দই, মধুপুরের আনারস এবং নরসিংদীর লটকন। এর পর আরও পাঁচটি পণ্য এই সনদ লাভ করেছে। সেগুলো হলো– মেহেরপুরের মেহের সাগর কলা, নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি, ফুলবাড়িয়ার লাল চিনি, মেহেরপুরের হিমসাগর আম ও ফরিদপুরের পাট। এর মধ্যে সর্বশেষ জিআই স্বীকৃতি পায় ফরিদপুরের পাট।
- বিষয় :
- জিআই পণ্য
