ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উদীয়মান খেলনা শিল্পে উচ্চ শুল্কের বোঝা

উদীয়মান খেলনা শিল্পে  উচ্চ শুল্কের বোঝা
×

জসিম উদ্দিন বাদল

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২২ | আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমানে দেশের দ্রুত বর্ধনশীল ও সম্ভাবনাময় খাত হলো প্লাস্টিক খেলনা শিল্প। চাহিদা বাড়ার কারণে দ্রুত বিকাশ ঘটছে প্লাস্টিকের তৈরি খেলনার। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানিও বাড়ছে। এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার। দেশে উৎপাদিত খেলনা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হচ্ছে অন্তত বিশ্বের ৮৮টি দেশে। 
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদন, ভৌগোলিক কৌশলগত অবস্থান, রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা, সস্তা শ্রম থাকার পরও দেশের খেলনা শিল্প বৈশ্বিক বাজারে পিছিয়ে রয়েছে। খেলনা তৈরিতে ৩৫ থেকে ৪০ ধরনের উপকরণ বা কাঁচামালের প্রয়োজন হয়। যেগুলো আমদানি করতে হয় বিভিন্ন দেশ থেকে। কিন্তু এসব কাঁচামাল আমদানিতে ২৫ থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ককর রয়েছে, যা উৎপাদনকারীদের জন্য বড় বোঝা। এ শুল্ককর কমালে, রপ্তানিতে প্রণোদনা ও বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা দিলে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে উদীয়মান এ খাতের রপ্তানি প্রায় ৪৭ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
রপ্তানিকারকদের মতে, খেলনার বৃহৎ উৎপাদনকারী দেশ চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বাড়ার কারণে বাংলাদেশি খেলনা রপ্তানি বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে খেলনা উৎপাদনের জন্য ক্লাস্টার স্থাপন, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো এবং নীতিসহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। 

খেলনার বাজার ও রপ্তানি
খেলনা শিল্প বাংলাদেশের একটি উদীয়মান খাত। এ খাত তৈরি পোশাক থেকে দেশের রপ্তানিনির্ভরতা কমাতে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এক দশক আগেও বাংলাদেশের খেলনার ৮০ শতাংশ আমদানিনির্ভর ছিল। বর্তমানে স্থানীয় উৎপাদন চাহিদার বড় অংশ পূরণ করছে। বাংলাদেশে প্লাস্টিক খাতের অন্তর্ভুক্ত প্রায় ১৫০টি খেলনা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২০ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। বেশির ভাগ কারখানা গড়ে উঠেছে অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, গাজীপুর ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। বর্তমানে এক হাজারের বেশি রকমের খেলনা তৈরি হয় দেশে। 

বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের খেলনা রপ্তানি করেছে। যেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রপ্তানি ছিল মাত্র এক কোটি পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ডলারের। খেলনা রপ্তানি প্রতিবছর প্রায় ২৪ শতাংশ হারে বাড়ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ রপ্তানি ৪৬ কোটি ৬০ লাখ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক শীর্ষ ৩০ রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে নিয়ে যাবে। 

খেলনা রপ্তানিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার হলো স্পেন। রপ্তানির প্রায় ৩২ শতাংশই হয় দেশটিতে। প্রায় ১৯ শতাংশ যায় ইতালিতে। বাংলাদেশ থেকে এ ধরনের পণ্যের ১৮ শতাংশ রপ্তানি হয় ফ্রান্সে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, স্পেন, সিঙ্গাপুর, ভারত, নেপাল, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয় খেলনা।
বিপিজিএমইএর তথ্যমতে, বিশ্বে খুব দ্রুত শিক্ষামূলক, বিনোদনমূলক ও উদ্ভাবনী খেলনার চাহিদা বাড়ছে। ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক খেলনা ও গেমসের বাজার ৪৩৯ বিলিয়ন ৯১ কোটি ডলারে পৌঁছাবে, যা বাংলাদেশের রপ্তানির জন্য বিশাল সুযোগ তৈরি করবে।

কেন বাংলাদেশের সম্ভাবনা বেশি
খেলনা উৎপাদনকারীরা জানান, বাংলাদেশি খেলনার অন্যতম প্রতিযোগী বাজার চীন, তাইওয়ান ও ভিয়েতনাম। বর্তমানে চীন বৈশ্বিক খেলনা বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে সেখানে শ্রমমূল্য বৃদ্ধি, মার্কিন শুল্ক আরোপ এবং উচ্চ মূল্যের পণ্যের দিকে ঝোঁক বাড়ায় তারা নিম্নমানের খেলনা উৎপাদন থেকে সরে আসছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে শ্রমমূল্য কম বা সস্তা শ্রম রয়েছে। দিন দিন উৎপাদনকারীর সংখ্যা বাড়ছে। তাছাড়া ভৌগোলিক অবস্থানে কৌশলগতভাবে বাংলাদেশ সুবিধাজনক স্থানে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে খাতটি সরকারি প্রণোদনা পেলে দ্রুত এগোবে।

প্রধান চ্যালেঞ্জ উচ্চ শুল্ক
বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) সভাপতি সামিম আহমেদ বলেন, খেলনা তৈরিতে রাবার, রং, যন্ত্রপাতি, ব্যাটারিসহ ৩৫ থেকে ৪০ ধরনের কাঁচামাল ও উপকরণের দরকার হয়। যেগুলোর ৮০ শতাংশই আমদানি হয়। এসব কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ২৫ থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত। শুল্ক কমালে দেশীয় এ শিল্পের বিকাশ সহজ হবে। 

আরও যেসব প্রতিবন্ধকতা 
এ খাতের উদ্যোক্তারা বলেন, নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। কাপড়ভিত্তিক খেলনা উদ্যোক্তারা তুলনামূলক কম সমস্যায় পড়লেও প্লাস্টিকভিত্তিক খেলনা উদ্যোক্তারা নীতি অস্পষ্টতার কারণে বেশি সমস্যায় পড়ছেন। ২০০৫ সালে প্লাস্টিক খেলনার জন্য বন্ড লাইসেন্স চাওয়া হয়েছিল; কিন্তু নীতি না থাকায় এনবিআর তা বাতিল করে। রপ্তানিকারকদের সাধারণ রপ্তানি লাইসেন্স নিতে হয়। তাদের প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশে উচ্চমানের খেলনা উৎপাদনে খরচ বেশি পড়ে। ছোট উদ্যোক্তারা একদিকে ঋণ পাচ্ছেন না, অন্যদিকে উচ্চ সুদের কারণে তারা ব্যবসায় টিকতে পারছে না। 

উৎপাদন ও রপ্তানিকারকরা কী বলছেন
এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে খেলনার সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করতে হবে এবং আলাদা রপ্তানি বাজার চিহ্নিত করতে হবে।  খেলনা উদ্যোক্তাদের জন্য একটি শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে, যা ভূমিকা রাখবে প্রবৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খল উন্নয়ন এবং নীতি-সমর্থনের ক্ষেত্রে। জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে চলমান বাণিজ্য আলোচনায় খেলনা শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করে কম শুল্ক ও বাড়তি বাজার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এনবিআর, পেটেন্ট অফিসসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রশাসনিক ঝামেলা কমাতে হবে।
রপ্তানিকারকরা বলেন, ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ খেলনা ব্র্যান্ড গড়ে তোলা দরকার। সম্পূরক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক খেলনার কাঁচামাল বা যন্ত্রাংশে প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়। আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করতে সিঙ্গেল উইন্ডো সিস্টেম চালু করতে হবে। আন্তর্জাতিক মান পূরণের জন্য সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাওয়া যায়। স্থানীয় খেলনা উৎপাদন ক্লাস্টার গড়ে তুলতে হবে। এতে প্রতিযোগিতা বাড়বে ও উৎপাদন খরচ কমবে। 

খেলনা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গোল্ডেন সন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেলাল আহমেদ সমকালকে বলেন, অনেক বছর ধরে পোশাক খাতকে সুবিধা দেওয়ায় সেটি এখন সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। ভবিষ্যতে এর বিকল্প রপ্তানি খাত তৈরি করতে হবে। পোশাক খাত ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী ব্যাক টু ব্যাক এলসির আওতায় কাঁচামাল আমদানি করতে পারে। কিন্তু খেলনা শিল্পের কাঁচামালের ক্ষেত্রে সেই সুবিধা নেই। সুযোগ-সুবিধা না দিলে বিকল্প রপ্তানি খাত সৃষ্টি হবে না। কোনো সংগঠন না থাকায় এ খাতকে কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্কের বোঝা বইতে হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, রপ্তানি বাজার ভালো করতে হলে পণ্যে বৈচিত্র্য আনা দরকার। শিক্ষামূলক যেমন– বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতের খেলনা তৈরি করা যেতে পারে। সৃজনশীল ও ইলেকট্রনিক খেলনা উৎপাদনে জোর দিতে হবে। তাহলে রপ্তানি বাজার প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। রপ্তানি বাণিজ্যে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি ও বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার প্রয়োজন। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছে, দেশে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মান পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি, যাতে রপ্তানিকারকদের পণ্য বিদেশে পরীক্ষা করাতে না হয়। এতে তাদের খরচ ও সময় সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি শুল্কনীতি যৌক্তিক, স্বচ্ছ ও কাঠামোবদ্ধ করতে হবে, যাতে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ও টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের সঙ্গে ডিজাইন ট্রেনিং, গবেষণা ও উদ্ভাবনে সরকারের সহযোগিতা বাড়ানো দরকার। দূতাবাস ও বাণিজ্য মিশনগুলোর মাধ্যমে নতুন বাজার চিহ্নিত করা ও প্রচারণা চালাতে হবে। 

ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ সমকালকে বলেন, প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তার অভাব, কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক হার, বন্ডেড সুবিধার অনুপস্থিতি ও টেস্টিং সুবিধার অপর্যাপ্ততার কারণে এ শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সরকার এসব ব্যাপারে নজর দিলে খাতটি দ্রুত প্রসারিত হবে। 

বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) সভাপতি সামিম আহমেদ বলেন, নীতিসহায়তার পাশাপাশি এ খাতের সার্বিক উন্নয়নে ক্লাস্টার ডেভেলপমেন্ট, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও ঋণের সুদ কমাতে হবে। রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ ও বন্ড সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। 

জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, প্লাস্টিকের দানা আমদানিতে উচ্চ শুল্ক রয়েছে। এই দানা দিয়ে রপ্তানিযোগ্য প্লাস্টিকের পণ্য তৈরি হয়, আবার খেলনাও তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের দানা কারা খেলনা তৈরির জন্য আমদানি করে, আর কারা অন্য পণ্য তৈরির জন্য আমদানি করে, তা আলাদা করা কঠিন। তবে বন্ড সুবিধায় কিছু জটিলতা আছে, তা ঠিক। খেলনা উৎপাদনকারীরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানালে বিষয়টি সহজ করার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে অবহিত করা হবে। 

আরও পড়ুন

×