ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বীমা খাতে ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমিয়ে আনার উদ্যোগ

বীমা খাতে ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমিয়ে আনার উদ্যোগ
×

মেসবাহুল হক

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

জীবন ও সাধারণ বীমা (নন-লাইফ) কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোসহ গ্রাহকের দাবি যথাসময়ে পরিশোধ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

ব্যয় কমাতে ইতোমধ্যে জীবন বীমা ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণী বিধিমালা, ২০২০ এবং সাধারণ বীমা পরিচালনায় ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণী বিধিমালা, ২০১৮-এর সংশোধনী প্রস্তাবের খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ওয়েবসাইটে এসব খসড়া প্রকাশ করে অংশীজনের মতামত চাওয়া হয়েছে। খসড়ায় স্বাক্ষর করেছেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের পরিচালক (আইন) মোহা. আব্দুল মজিদ।

খসড়া অনুযায়ী জীবন এবং সাধারণ বীমাকারী উভয়কেই অনুমোদিত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে ব্যাপকভাবে কাটছাঁটের সম্মুখীন হতে হবে। এই ব্যয়গুলোর মধ্যে এজেন্ট কমিশন, কর্মীদের বেতন এবং প্রশাসনিক ওভারহেডের মতো পরিচালন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এ বিষয়ে আইডিআরএর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি সমকালকে বলেন, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় বিলম্বিত দাবি নিষ্পত্তির একটি মূল কারণ। বিশেষ করে জীবন বীমাকারীদের ক্ষেত্রে। এ কারণে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এ পদক্ষেপ বীমাকারী এবং পলিসিহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা, সুশাসন নিশ্চিত এবং এই খাতে জনসাধারণের আস্থা পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখবে।
জীবন বীমা কোম্পানির জন্য ব্যবস্থাপনা ব্যয়সীমা পুনর্নির্ধারণে খসড়া প্রস্তাবনায় পলিসির ধরনের ওপর ভিত্তি করে ব্যয়সীমা প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর কথা বলা হয়েছে। 
প্রস্তাবনায় বলা হয়, জীবন বীমা কোম্পানির ব্যবসার সময় বা বয়স যদি ১০ বছর বা তদূর্ধ্ব হয়, তাহলে প্রথম বর্ষে আদায়কৃত প্রিমিয়াম ১০০ কোটি টাকা বা তার কম হলে কোম্পানি মোট প্রিমিয়ামের ৮২ শতাংশ খরচ করতে পারবে। বিদ্যমান বিধিমালায় এই খরচের সীমা ৯৩ শতাংশ। 

এ ছাড়াও নবায়ন প্রিমিয়ামের ক্ষেত্রে ১০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের কোম্পানির জন্য সব অবস্থায় সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ব্যয়সীমা প্রস্তাব করা হয়েছে খসড়া বিধিমালায়। বিদ্যমান বিধানমালায় এই খরচের সীমা ২০ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা আছে। এ ক্ষেত্রেও কোম্পানিগুলোর ১০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ কমবে।
একইভাবে জীবন বীমার জন্য বার্ষিক প্রিমিয়াম পলিসির ব্যবস্থাপনা খরচ ৫ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশে কমিয়ে আনা হবে। কিস্তিভিত্তিক পলিসির জন্য এটি ১০ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশে নেমে আসবে। গ্রুপ বীমায়, বার্ষিক প্রিমিয়ামের ব্যবস্থাপনা খরচ ১৫ শতাংশ থেকে কমে ১০ শতাংশে নেমে আসবে। 

প্রস্তাবনা অনুসারে, এক থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি পলিসির ক্ষেত্রে, প্রথম বছরের খরচ ৯৫ থেকে ৮৫ শতাংশ এবং নবায়ন খরচ ২৫ থেকে ২০ শতাংশে নেমে আসবে। ছয় থেকে ১০ বছরের পলিসির ক্ষেত্রে, প্রথম বছরের খরচ ৯৪ থেকে কমে ৮৪ শতাংশ এবং নবায়ন খরচ ২২ থেকে কমে ১৭ শতাংশে নেমে আসবে। সব মেয়াদের ক্ষেত্রে নবায়ন খরচও ১৫ থেকে কমে ১০ শতাংশে নেমে আসবে।
অগ্নি, সামুদ্রিক ও সাধারণ বীমার মতো ক্ষেত্রগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে এমন সাধারণ বীমা ব্যবস্থাপনা খরচের সীমাও কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রথম ১৫ কোটি টাকার প্রিমিয়ামের জন্য, অগ্নি ও সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোকে এখন ৩৫ শতাংশের পরিবর্তে ২৫ শতাংশ ব্যয় করার অনুমতি দেওয়া হবে। সামুদ্রিক বীমার জন্য, সীমা ২৬ থেকে কমে ১৬ শতাংশে নেমে আসবে।
প্রস্তাবনা অনুসারে, প্রিমিয়াম আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সীমা আরও কঠোর হয়ে যাবে। ১২০ কোটি টাকার বেশি প্রিমিয়ামের জন্য অগ্নি ও সাধারণ বীমার জন্য সীমা ২২ থেকে নেমে ১২ শতাংশে এবং সামুদ্রিক বীমার জন্য ১৬ থেকে নেমে ৬ শতাংশে নেমে আসবে। আইডিআরএ এই ব্যয়গুলো বার্ষিক মোট প্রিমিয়াম আয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করে, যা একটি ক্যালেন্ডার বছরে সংগৃহীত মোট প্রিমিয়ামের পরিমাণ বোঝায়।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশের সরকারি-বেসরকারি ২০টি জীবন বীমা কোম্পানি ব্যবস্থাপনা খাতে অনুমোদিত ব্যয়সীমার চেয়ে ১৫৯ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ করেছে। কমিশন, বেতন-ভাতা, অফিস ভাড়া ও নানাবিধ খাত দেখিয়ে এই অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে। 
অথচ বাংলাদেশে জীবন বিমা কোম্পানির ব্যয়ের বিষয়ে বীমা আইন, ২০১০ এবং বীমা বিধিমালা অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ব্যয় এবং গ্রাহকের অর্থ অপচয় করা যাবে না। আইন বলছে, অতিরিক্ত ব্যয় অবৈধ। বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএর মতে, এ টাকা বীমা গ্রাহকের; তাই অতিরিক্ত ব্যয় অবৈধ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ওই সীমা লঙ্ঘন করে জীবন বিমার ৩৬ কোম্পানির মধ্যে ২০টি অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। এ রকম অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বিধিমালা সংশোধনের পাশাপাশি তা বাস্তবায়নে কঠোর হচ্ছে আইডিআরএ।
এ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমানো যথেষ্ট নয়। বিমা কোম্পানিগুলোর মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। প্রিমিয়ামের অর্থ একটি দায়, অনিয়ন্ত্রিত ব্যয়ের উৎস নয়–এটি তাদের বুঝতে হবে। এ কারণে আইডিআরকে কঠোর ব্যয়সীমার সঙ্গে সঙ্গে শক্তিশালী তদারকির যোগসূত্র স্থাপন প্রয়োজন, যাতে গ্রাহকের অধিকার সুরক্ষিত থাকে এবং শিল্পের প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার করা যায়।

আরও পড়ুন

×