ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

কৃষিভিত্তিক নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে চায় সরকার

কৃষিভিত্তিক নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে চায় সরকার
×

মেসবাহুল হক

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৬ | আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০২৫ | ১৪:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

কৃষিভিত্তিক নতুন উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এ জন্য উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন বাড়ানো, ফসল সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমানো, সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও বাজারজাতের সুবিধা বাড়াতে নেওয়া হচ্ছে নতুন প্রকল্প। দেশের কর্মসংস্থান বাড়ানো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে সরকার। 

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, উচ্চমূল্যের ফসল বাজারজাতকরণ এবং উৎপাদন বাড়ানো শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিয়েছে মন্ত্রণালয়। এতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ঋণ দেবে ১০ কোটি ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। 
কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, দেশের কৃষি এখন আধুনিকায়নের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। এই রূপান্তরের মূল লক্ষ্য হলো কৃষিকে লাভজনক করা, যাতে কৃষকরা তাদের জীবনমান উন্নত করতে পারেন। বাণিজ্যিক কৃষির কেন্দ্রে রয়েছে উচ্চমূল্যের ফসল, যেখানে শিক্ষিত তরুণরা এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছেন।

উচ্চমূল্যের বলতে দুই ধরনের ফসলকে বিবেচনা করা হয়। এর একটি হচ্ছে ফলমূল, যেমন–ড্রাগন ফল ও স্ট্রবেরি। অপরটি শাকসবজি, যেমন– ক্যাপসিকাম, ব্রকলি ও গাজর। এই ফসলগুলো থেকে লাভ সনাতন কৃষিপণ্যের চেয়ে অনেক বেশি। উদাহরণ স্বরূপ এক বিঘা জমিতে ড্রাগন ফল চাষ করে একজন কৃষক ২ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন, যা ধান বা প্রচলিত সবজি চাষে সম্ভব নয়। বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরের এ ধারাকে আরও এগিয়ে নিতে নতুন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়। 

এ প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়নে সহযোগিতা চেয়ে গত ৬ নভেম্বর অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের কাছে চিঠি লিখেছেন কৃষি সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাই মিয়ান। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, এডিবির সঙ্গে এ প্রকল্পের কার্যক্রম নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। সর্বশেষ গত ৭ অক্টোবর তাদের সঙ্গে সভা হয়। সভায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষি উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সুদহার নিম্ন রাখার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী কৃষি মন্ত্রণালয় অর্থ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। প্রস্তাবিত ১০ কোটি ডলারের মধ্যে ৬ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষি উদ্যোক্তা পর্যায়ে বিতরণ করা হবে। 

চিঠিতে আরও বলা হয়, কৃষি খাতের জন্য এডিবির ঋণ সহজ শর্তে হয়ে থাকে, যার সুদের হার ২ শতাংশ এবং ৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ২৫ বছরে পরিশোধযোগ্য। কৃষি ও কৃষি খাতকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে সরকার বিশেষ ঋণহার সুবিধা দিয়ে থাকে। যেমন–বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লিঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি অনুযায়ী, কৃষির অগ্রাধিকার খাতে বিশেষ করে আমদানি-বিকল্প ফসলের জন্য ঋণের সুদের হার ৪ শতাংশ, যা প্রচলিত বাণিজ্যিক সুদের হার অপেক্ষা কম। 

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাণিজ্যিকভাবে উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনের সঙ্গে উদ্যোক্তারা এ সুবিধা পান না। প্রচলিত বাণিজ্যিক সুদহার কৃষি উদ্যোক্তা বিকাশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সহায়ক নয়। সে জন্যে বাণিজ্যিক সুদহারে ব্যাংক থেকে কৃষি উদ্যোক্তা পর্যায়ে প্রস্তাবিত ঋণ দেওয়া হলে তা এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য অর্জনে অন্তরায় হতে পারে বলে মনে করছে কৃষি মন্ত্রণালয়। 

এমন প্রেক্ষাপটে কৃষি খাতকে সরকারের অগ্রাধিকারভুক্ত খাত হিসেবে আমলে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তপশিলি ব্যাংক এবং তপশিলি ব্যাংক থেকে উদ্যোক্তা পর্যায়ে বিতরণের জন্য এডিবির অর্থায়নে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ঋণের সুদহার যৌক্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে নির্ধারণের অনুরোধ জানিয়েছেন কৃষি সচিব। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা পর্যায়ে ঋণের সর্বোচ্চ সুদ হার ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে অর্থ সচিবের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সুদের হার অনেক বেশি। এছাড়া, উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণে স্থানীয় কিছু সমস্যা ও ফসলের প্রকৃত দাম না পাওয়াও একটি ঝুঁকি থাকে। নতুন প্রকল্প এ সমস্যা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে। মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, স্থানীয় ফলের ঝুড়ি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৬০-৬৫ শতাংশ বছরে তিন থেকে চার মাস পাওয়া যায়। বাকি সময়ের জন্য মাত্র ৩০-৩৫ শতাংশ ফল পাওয়া যায়। এই ঘাটতি পূরণে নতুন নতুন উদ্যোগ নিতে হবে। এসব ঘটতি মেটাতে কাজ করছে সরকার।

বাংলাদেশ কৃষিভিত্তিক দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান ক্রমেই কমছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ১৯৮৫-৮৬ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল ৩১ শতাংশের বেশি। সেটি কমতে কমতে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ১১ শতাংশেরও কম। গত অর্থবছরে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৮৬ শতাংশ। 

বিশ্লেষকরা মনে করেন, কৃষি খাত বাংলাদেশের জন্য সব সময়ই সম্ভাবনাময়। সেই সম্ভাবনার তুলনায় অনেক পিছিয়ে দেশের কৃষি খাত। এর বড় কারণ কৃষি খাতে বাস্তবধর্মী ও ব্যাপকভিত্তিক পরিকল্পনার অভাব, কাঙ্ক্ষিত আধুনিকায়ন না হওয়া এবং এ খাতে নতুন উদ্যোক্তা গড়ে না ওঠা। অথচ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি বাড়াতেও ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে কৃষি খাত। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৯৯ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়েছে। কৃষি খাতে নতুন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে উঠতে সরকার থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হলে এ খাতের রপ্তানি আয় বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, কৃষিতে আধুনিকায়ন, উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন ও বাজার সংযোগ উন্নয়নের মাধ্যমে এই খাতকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

×