শিল্প খাতে ৩০০ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপন করতে চায় ইডকল
মেসবাহুল হক
প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের শিল্প খাতে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে চায় রাষ্ট্রায়ত্ত অবকাঠামো উন্নয়ন সংস্থা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)। এরই অংশ হিসেবে আরও ৩০০ মেগাওয়াট সোলার সিস্টেম স্থাপনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (জিটিএফ) থেকে ১ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ চেয়েছে সংস্থাটি। এ বরাদ্দ চেয়ে সম্প্রতি ইডকলের চেয়ারম্যান ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি দিয়েছেন। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
চিঠিতে ইডকল জানিয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত বিশেষ করে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপনে সরকারের লক্ষ্য পূরণে প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশ্বব্যাংক ও কে-এফ-ডব্লিউর কনসেশনাল অর্থায়নে ইডকল এ পর্যন্ত ১০৩টি শিল্পকারখানায় ৭১৩ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে, যার মাধ্যমে ১৬৭ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার স্থাপন হয়েছে। ইডকলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন নাগাদ মোট ৩০০ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার স্থাপন করতে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের লক্ষ্য রয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির আরও ৩০০ মেগাওয়াট স্থাপনের প্রকল্প হাতে রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের নির্দেশনায় ইডকল শিল্প খাতে বড় আকারে রুফটপ সোলার স্থাপনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর লক্ষ্য অর্জনে রপ্তানিমুখী শিল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে রুফটপ সোলার কার্যক্রমের সম্প্রসারণ করছে সংস্থাটি। সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর নীতি অনুযায়ী, শিল্প খাতে দ্রুত রুফটপ সোলার সম্প্রসারণে আরও ৩ হাজার কোটি টাকা নমনীয় শর্তের তহবিল প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ইডকল।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের নতুন নেট মিটারিং গাইডলাইন শিল্প কারখানায় রুফটপ সোলার স্থাপন সহজ করা হয়েছে। এতে ক্যাপেক্স ও অপেক্স উভয় মডেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ঘাটতির ঝুঁকি হ্রাস পাবে।
ইডকল জানিয়েছে–বিশ্বব্যাংক, এডিবি, এআইআইবি, ইআইবি, জাইকা ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে তহবিল সংগ্রহে আলোচনা শুরু হলেও এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় লাগবে। তাই জরুরি প্রয়োজন বিবেচনায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ইডকলকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (জিটিএফ) ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে।
জিটিএফ থেকে প্রস্তাবিত ১ হাজার কোটি টাকার ঋণ পেলে দ্রুত সময়ে অতিরিক্ত ৩০০ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার স্থাপন সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে ইডকল। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকেও অতিরিক্ত তহবিল সংগ্রহ অব্যাহত রাখবে। চিঠিতে ইডকল বলেছে, জিটিএফ থেকে বরাদ্দ শিল্প খাতে রুফটপ সোলার সম্প্রসারণে বড় ভূমিকা রাখবে এবং দেশের সবুজ জ্বালানি রূপান্তরের গতি আরও বাড়াবে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ইডকলের প্রস্তাবটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড হলো পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ও কম সুদে ঋণ প্রদানের একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল। এটি ২০১৬ সালে চালু হয়। এর লক্ষ্য টেক্সটাইলসহ অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পকে আধুনিকায়ন করে শক্তি ও পানিসাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব করে তোলা। এর আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং যন্ত্রপাতির আমদানিও অন্তর্ভুক্ত। জিটিএফ থেকে নেওয়া ঋণের সুদহার লন্ডন আন্তঃব্যাংক সুদহারের (লাইবর) সঙ্গে আরও ২ শতাংশ যুক্ত করে হিসাব করা হয়। অন্যদিকে ইউরোতে ঋণ নিলে ইউরিবরের (ইউরো ইন্টার ব্যাংক অফার রেট বা ইউরিবর) সঙ্গে আরও ১ শতাংশ সুদ যুক্ত হয়।
ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইডকল বাংলাদেশে অবকাঠামো, জ্বালানি শক্তির দক্ষতা উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি শক্তি প্রকল্পের বিকাশে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছে আসছে। ২০০৩ সালে শুরু হওয়া সোলার হোম সিস্টেম প্রোগ্রামের আওতায় ইডকল প্রায় ৪০ লাখের বেশি সোলার সিস্টেম স্থাপনে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে; যা বিশ্বের বৃহত্তম অফ-গ্রিড সোলার প্রোগ্রামগুলোর একটি।
ইডকল বহু বছর ধরে সোলার হোম সিস্টেমে সফলতা অর্জনের পর এখন শিল্পাঞ্চলে রুফটপ সোলার স্থাপনে এ অর্থায়ন চাচ্ছে। এ ছাড়া রুফটপ সোলার সম্প্রসারণে আর্থিক সহযোগিতা জোরদার করছে উন্নয়ন সংস্থা ও ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থা শিল্প খাতে ‘গ্রিন ফাইন্যান্সিং’ তহবিল দিচ্ছে।
জানা গেছে, দেশের শিল্প খাতে জ্বালানি ব্যয় ক্রমবর্ধমান হওয়ায় রুফটপ সোলার বা ছাদে স্থাপিত সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছেন অনেক উদ্যোক্তা। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্টিল, সিমেন্ট ও খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পে বিদ্যুতের বড় অংশ নিজস্ব উৎস থেকে পূরণ করার প্রবণতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত বেড়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে শিল্প খাতের রুফটপ সোলারের সক্ষমতা ১২০-১৩০ মেগাওয়াটের মতো হলেও বিভিন্ন প্রকল্প অনুমোদন পর্যায়ে থাকায় আগামী দুই বছরের মধ্যে এই সক্ষমতা ৫০০ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের শিল্পাঞ্চলে বিপুল পরিমাণ অব্যবহৃত ছাদের জায়গা রয়েছে, যা ব্যবহার করা গেলে কম খরচে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
শিল্পোৎপাদনের অন্যতম ব্যয় বিদ্যুৎ। গ্রিডের বিদ্যুতের দাম একাধিকবার বাড়ার পর অনেক কারখানা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকেছে। রুফটপ সোলার স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি হলেও অপারেশনাল খরচ প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে ৫-৬ বছরের মধ্যে বিনিয়োগ উঠে আসে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে এখন আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করতে হচ্ছে। গ্রিন ফ্যাক্টরি বা পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের একটি বড় মানদণ্ড হলো পুনর্বীকরণযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার। রুফটপ সোলার ব্যবহারে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সাহায্য করে, যা ‘কার্বন ট্রেসেবিলিটি’ ও বিভিন্ন পরিবেশগত সার্টিফিকেশন অর্জনেও সহায়তা করে।
- বিষয় :
- বিদ্যুতায়ন
