আড়াই দশকে ভ্যাট আদায় বেড়েছে ২২ গুণ
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট ব্যবস্থা চালু হয় ১৯৯১ সালে। শুরুতে এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও ধীরে ধীরে সরকারের রাজস্ব আদায়ে অন্যতম ত্রাণকর্তা হয়ে উঠেছে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নানা উদ্যোগে গত আড়াই দশকে ভ্যাট আহরণ বেড়েছে ২২ গুণ। বিশ্লেষকরা বলছেন, আয়কর, শুল্ক ও মূসক–এই তিনটি প্রধান খাতের মধ্যে রাজস্ব আদায়ে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে ভ্যাট। ভ্যাট আদায় ব্যবস্থা সহজ করার পাশাপাশি ফাঁকি রোধ করা এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় আরও বহু গুণ বাড়বে। এ জন্য একক ভ্যাট হার, সব পর্যায়ে অটোমেশন চালু ও ই-ইনভয়েসিং চালু করাসহ সরকারকে আরও কিছু উদ্যোগ নিতে হবে।
এনবিআরের তথ্যমতে, ২০০০-২০০১ অর্থবছরে ভ্যাট থেকে রাজস্ব এসেছিল আট হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাত থেকে রাজস্ব এসেছে এক লাখ ৯২ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা। দেশের মোট রাজস্বের প্রায় ৩৮ শতাংশই আসে ভ্যাট থেকে। বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ছয় লাখ ৪৪ হাজার। এর মধ্যে প্রতি মাসে গড়ে পৌনে পাঁচ লাখ প্রতিষ্ঠান রিটার্ন জমা দেয়। আর তিন লাখের বেশি রিটার্ন জমা পড়ে অনলাইনে।
বিদ্যমান ভ্যাট আইন অনুযায়ী, প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে তার কেনাবেচার যাবতীয় তথ্য দিয়ে ভ্যাট রিটার্ন দিতে হয়। তবে ভ্যাট রিটার্নের চেয়ে আয়কর রিটার্ন জমা পড়ে অনেক কম। প্রতিবছর মাত্র ৩৯ হাজার ৬০০ কোম্পানি করদাতা আয়কর রিটার্ন জমা দেয়। যদিও যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তরে (আরজেএসসি) নিবন্ধিত কোম্পানি রয়েছে তিন লাখের মতো।
ভ্যাট আদায় প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতার পাশাপাশি ফাঁকির প্রবণতা রয়েছে বলেও বিশ্লেষকরা মনে করেন। অভিযোগ রয়েছে, ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ ক্রেতার কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করলেও তা নিজের কাছে রেখে দেন। আবার কেউ মোট বিক্রির পরিমাণ কমিয়ে দেখান। অন্যদিকে, রাজস্ব কর্মকর্তারা ভ্যাট আদায় করলেও অনেক সময় তা যথাযথভাবে জমা হয় না সরকারি কোষাগারে। এভাবে প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে ভ্যাট বা মূসক থেকে শত শত কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, আমদানি, উৎপাদন বা ব্যবসায় কোনো একটি পর্যায়ে কর অব্যাহতি দিলে পরবর্তী সময়ে করভার বেড়ে যায়। ফলে কর ফাঁকির সম্ভাবনা বাড়ে। দেশে এ ঘটনা ব্যাপক, যা রাজস্ব আহরণের বড় বাধা। ভ্যাট নিবন্ধন, রিটার্ন দাখিল, পেমেন্ট, রিফান্ড, সহগ ঘোষণাসহ অনেক কাজ ডিজিটাইজড হয়েছে। কিন্তু পেপারলেস, কন্টাক্টলেস পরিবেশ সৃষ্টি করাসহ এখনও অনেক কিছু বাকি আছে। ২০১৯ সালে ডিজিটাল ভ্যাট ব্যবস্থা প্রণয়নের লক্ষ্যে নতুন আইন বাস্তবায়ন করা হলেও এখন পর্যন্ত আইভাস সিস্টেমে অনলাইনে নিরীক্ষা নির্বাচন পদ্ধতি চালু করা সম্ভব হয়নি।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ সমকালকে বলেন, ভ্যাট পরোক্ষ কর। বর্তমানে মোট রাজস্বের সিংহভাগ ভ্যাট থেকে এলেও এর ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়া ঠিক নয়। দীর্ঘ মেয়াদে রাজস্ব বাড়াতে হলে আয়করে জোর দিতে হবে।
তিনি বলেন, বিদ্যমান ভ্যাটহার অনেক বেশি, এটি কমানো উচিত। ভ্যাটের অনেক স্তর রয়েছে, যা জটিলতা তৈরি করছে। সবার জন্য ভ্যাট প্রদান সহজ করতে হলে একক হারে যেতে হবে। কারণ, যারা নিয়মিত ভ্যাট দেন, তাদের ওপর বেশি চাপ পড়ছে।
ভ্যাট আদায়ে প্রচুর ফাঁকি রয়েছে উল্লেখ করে মাশরুর রিয়াজ বলেন, নানা কারণে ফাঁকি হচ্ছে। ভ্যাট দিতে গেলে অনেক কাগজপত্র সরবরাহসহ নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। এ জন্য অনেকেই ভ্যাটের আওতায় আসতে চান না। এ জন্য প্রতিটি ধাপে অটোমেশন এবং আদায় থেকে কোষাগারে জমা দেওয়া পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্স করতে হবে। তাহলে ভ্যাট রাজস্ব আদায়ে আরও বেশি ভূমিকা রাখবে।
মাঝারি থেকে বৃহৎ করদাতাদের জন্য ই-ইনভয়েসিং চালুর পরামর্শ দিয়েছেন এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া। তিনি বলেন, ই-ইনভয়েসিং খুবই প্রয়োজন। ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (ইএফডিএমএস) এখন পর্যন্ত কোনো যুক্তিসংগত সুফল না পাওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি করদাতাদের ভ্যাটের আওতায় আনার বিষয়টি নতুন করে ভাবতে হবে। একই সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে, প্রচলিত ভ্যাটহার বহন করতে পারছি কিনা।
কারণ, ভ্যাটহারে সমতা নেই। ভ্যাট সঠিকভাবে আদায় করা গেলে আয়করও নিশ্চিত করা যাবে বলে মনে করেন তিনি।
এনবিআরের সদস্য (নীতি) মো. আজিজুর রহমান সমকালকে বলেন, চলতি অর্থবছরে ই-চালান ব্যবস্থা চালুর করা হবে। এতে ভ্যাট আদায়ে স্বচ্ছতা আসবে। ইতোমধ্যে এ-সম্পর্কিত প্রকল্পের টেন্ডার হয়ে গেছে। তাঁর মতে, মিষ্টি, খুচরা ব্যবসায়ীসহ কিছু ক্ষেত্রে ভ্যাট পুরোপুরি আদায় করা যাচ্ছে না। এ জন্য ডিজিটাল পদ্ধতির বিকল্প নেই। এনবিআর সেদিকেই এগোচ্ছে।
- বিষয় :
- ভ্যাট
