অভিমত
সুতা আমদানি বিতর্কের সহজ সমাধান হতে পারে তুলা চাষ
আশিকুর রহমান তুহিন
আশিকুর রহমান তুহিন
প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বন্ড সুবিধায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানি প্রসঙ্গে সম্প্রতি দেশের বস্ত্রকল ও তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের মধ্যে এক ধরনের বৈরিতা তৈরি হয়। মোট সুতা আমদানির প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে প্রতিবেশী ভারত থেকে। বস্ত্রকল মালিকদের দাবি, ভারত সরকার ভর্তুকি দিয়ে তাদের স্পিনিং মিলগুলোকে সহায়তা করছে বলেই তারা বাংলাদেশে কম দামে সুতা রপ্তানি করতে পারছে। এ কারণে পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা দেশের সুতা ব্যবহার না করে ভারত থেকে আমদানি করছে; যার ফলে দেশের বস্ত্রকলগুলোতে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। এতে দেশীয় মিলগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। অন্যদিকে তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার হলে পোশাক পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অথচ বাস্তবতা হলো, উভয় পক্ষই দেশের রপ্তানি অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এবং একে অপরের পরিপূরক।
তথ্য-উপাত্ত বলছে, বছরে প্রায় ৮০ লাখ বেল তুলা আমদানি করে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো প্রায় ৭৫ লাখ বেল সুতা উৎপাদন করে। দেশের মোট চাহিদা প্রায় ৮৪ লাখ বেল। বাকি অংশ আমদানির মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তুলা থেকে আসে মাত্র ১ থেকে ১ দশমিক ১৫ লাখ বেল সুতা। তুলা এবং সুতার এই নির্ভরতা কমাতে হলে টেকসই একমাত্র সমাধান হতে পারে দেশে তুলা উৎপাদন বাড়ানো। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে তুলা উৎপাদন কি বাস্তবসম্মত? ইতিহাস ও বাস্তবতা বলছে হ্যাঁ, সম্ভব।
গাজীপুরের কাপাসিয়া অঞ্চলের নামকরণ হয়েছে ‘কার্পাস’ বা তুলা থেকে। শীতলক্ষ্যা নদীর দুই তীরে একসময় মিহি আঁশের তুলা উৎপন্ন হতো, যা দিয়ে তৈরি হতো বিশ্ববিখ্যাত মসলিন। খ্রিষ্টপূর্ব সময় থেকেই এ অঞ্চলে তুলা চাষের ইতিহাস রয়েছে। তবে বর্তমানে বাংলাদেশে তুলা চাষ প্রায় উপেক্ষিত। দেশের প্রায় ৮০ লাখ হেক্টর আবাদযোগ্য জমির মধ্যে ৭ লাখ হেক্টরে পাট, ১ লাখ হেক্টরে তামাক, আর মাত্র ৪০ হাজার হেক্টরে তুলা চাষ হয়। বাকি জমিতে মূলত ধানসহ খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়।
প্রতি হেক্টরে গড়ে সাড়ে ৭ বেল তুলা উৎপাদন হয়। যদি দেশের সুতার চাহিদার অন্তত ২৫ শতাংশ অর্থাৎ ২১ লাখ বেল সুতা স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের লক্ষ্য ধরি, তবে তার জন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ৩ লাখ হেক্টর জমিতে তুলা চাষ। এতে বছরে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব।
তাহলে প্রশ্ন হলো এই সম্ভাবনা সত্ত্বেও কৃষক কেন তুলা চাষে আগ্রহী নন? তুলা চাষে কৃষকের অনাগ্রহের পেছনে আছে আর্থসামাজিক কারণ। তুলার বীজ লাগিয়ে ফসল তুলতে লাগে ৬ মাস। অন্যদিকে ধান চাষে সময় লাগে মাত্র ৩ থেকে ৪ মাস। তবে আমার কিছু বিশ্লেষণ এখানে উল্লেখ করব যে, কেন কৃষকের জন্য ৬ মাসের ফসল হলেও, তুলা উৎপাদন, ৩-৪ মাসের ধান উৎপাদনের চেয়ে অলাভজনক নয়।
ধরা যাক, এক বিঘা জমিতে তুলা উৎপাদন করতে খরচ পড়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং উৎপাদন হয় প্রায় ১৫ মণ, যা বিক্রি হয় প্রায় ৫৭ হাজার টাকায়। ফলে লাভ থাকে প্রায় ৩৭ হাজার টাকা। তুলা চাষের সমান প্রায় ছয় মাস সময়ে এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করে দেড় গুণ সময়কে কাজে লাগানো সম্ভব হয়। এই সময়ে প্রায় ৩০ মণ ধান উৎপাদন করা যায়। এতে কৃষকের খরচ হয় আনুমানিক ১৩ হাজার টাকা এবং বিক্রি করা যায় প্রায় ৩৯ হাজার টাকায়। ফলে লাভ থাকে প্রায় ২৬ হাজার টাকা। তুলা চাষে একই জমিতে লাভ হয় প্রায় ৩৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ ধানের তুলনায় তুলা চাষ করে প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা বেশি লাভ করা সম্ভব।
তাহলে কীভাবে বাংলাদেশে তুলা উৎপাদনের আগ্রহ সৃষ্টি করা যায়? এক্ষেত্রে আমরা পাট চাষের সাম্প্রতিক উদাহরণ বিবেচনা করতে পারি। পাট চাষের ক্ষেত্রেও একসময় একই অবস্থা ছিল। কিন্তু সরকার পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে ৭ থেকে ১৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ায় বর্তমানে পাটের আবাদ ৩ লাখ হেক্টর থেকে বেড়ে প্রায় ৭ লাখ হেক্টরে পৌঁছেছে। তুলার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করা যেতে পারে। বিশ্বের বড় তুলা উৎপাদনকারী দেশগুলো কৃষকদের ভর্তুকি দিয়ে থাকে। চীনে প্রতি কেজি তুলায় ১২ সেন্ট, ভারতে ৭ সেন্ট এবং তুরস্কে ১০ সেন্ট পর্যন্ত প্রণোদনা দেওয়া হয়। ভারতে রয়েছে ‘মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস’ বা এমএসপি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম পড়ে গেলে সরকার কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে দেয়। বাংলাদেশেও তুলা চাষে একই ধরনের ন্যূনতম মূল্য সহায়তা চালু করা গেলে কৃষকরা তুলা চাষে আগ্রহী হবেন।
তুলা উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি অর্থনীতিবিদ, বাজার ব্যবস্থাপনা ও শিল্পখাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী প্যানেল তৈরি করতে হবে। এই প্যানেল উৎপাদন, দাম নির্ধারণ, প্রণোদনা, বাজার নিশ্চয়তা এবং শিল্প খাতের চাহিদার মধ্যে সমন্বিত নীতি কাঠামো তৈরি করবে। এতে করে তুলা উৎপাদনকে শুধু কৃষিপণ্য হিসেবে নয়, বরং একটি লাভজনক অর্থকরী ফসলে রূপান্তরিত করা যায়। স্থানীয়ভাবে তুলার উৎপাদন বাড়াতে পারলে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো সহজে ও প্রতিযোগিতামূলক দামে কাঁচামাল পাবে। এতে সুতার দাম কমবে, পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে এবং একই সঙ্গে বস্ত্রখাত ও তৈরি পোশাকশিল্প উভয়ের স্বার্থই রক্ষা পাবে। সঠিক নীতিসহায়তা পেলে তুলা আবারও হতে পারে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল।
লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টেড গ্রুপ ও সাবেক পরিচালক, বিজিএমইএ
- বিষয় :
- সুতা আমদানি
