রাজস্ব আয় কম, পরিচালন ব্যয় ও ঋণে ঊর্ধ্বমুখী ধারা
মেসবাহুল হক
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৪:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আর্থিক খাতে নানা দুর্নীতি-অনিয়মের প্রভাব ব্যাংক খাত হয়ে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। এমন প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতির ক্ষত সারাতে নানা উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ে লাগাম টানার ঘোষণা দেয়। বাস্তবে পরিচালন বাজেটের আওতায় ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ফলে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারের পরিচালন ব্যয় মোট রাজস্ব আয়ের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হয়ে যায়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট বিগত আওয়ামী লীগ সরকার প্রণয়ন করলেও এর প্রায় পুরো বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর। রাজস্ব আদায় ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়ায় ঘাটতি মেটাতে সরকারকে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়েছে। সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতি এখনও বড় ধরনের চাপে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতিতে জনতুষ্টিবাদী পদক্ষেপের সুযোগ নেই, বাজেটে কৃচ্ছ্রসাধন বা অন্তত আর্থিক সংযম অপরিহার্য।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যয় নিয়ন্ত্রণে একাধিক প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র জারি করা হয়। তবু ২০২৪ সালের শেষ দিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা সমালোচনায় বাতিল হলেও ২০২৫ সালের জুলাই থেকে গ্রেডভেদে ১০-১৫ শতাংশ বিশেষ আর্থিক সুবিধা কার্যকর হয়।
এ ছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১৬ বছরে অবসর নেওয়া ৭৬৪ কর্মকর্তাকে উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেয়; এর মধ্যে ১১৯ জন সচিব হন এবং আরও ৭৮ জনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন; যা স্থায়ী আর্থিক দায় সৃষ্টি করেছে। অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ভাতা দ্বিগুণ ও প্রশিক্ষক ভাতা সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের ভাতাও ২০-৪২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। পুলিশ সদস্যদের ঝুঁকিভাতা ২০ শতাংশ বাড়িয়ে বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে; গ্রাম পুলিশের বেতন এক হাজার ও অবসর ভাতা ২০ হাজার টাকা বাড়ানো হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে তিন দফায় সরকারি যানবাহন কেনার মূল্যসীমা বৃদ্ধি, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৬০টি কূটনৈতিক মিশনে বৈদেশিক ভাতা ২০-৩৩ শতাংশ বাড়িয়ে বছরে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় নির্ধারণ, ১ হাজার ৫১৯টি মাদ্রাসা এমপিওভুক্তির ঘোষণা এবং জ্বালানি খাতে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার বকেয়া ভর্তুকি পরিশোধ–সব মিলিয়ে পরিচালন ব্যয় আরও বাড়িয়েছে।
রাজস্ব আয়ের চেয়ে পরিচালন ব্যয় বেশি
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রণয়ন করে। তবে পরিচালন ব্যয়ের চাপ বাড়ায় সংশোধিত বাজেটে উল্লেখযোগ্য কাটছাঁট সম্ভব হয়নি। বরং উন্নয়ন ব্যয় থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে পরিচালন খাতে ২৮ হাজার কোটি টাকা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাবদ অতিরিক্ত ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৯০ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ হার ছিল ১০ দশমিক ২৩ শতাংশ। তার আগের বছর ছিল আরও কম। অর্থাৎ পরিচালন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি স্পষ্ট।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৬ লাখ ২৮ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ছিল ৪ লাখ ৭৪ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা, অথচ অনুদানসহ মোট রাজস্ব সংগ্রহ হয় ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব পাওয়ার তুলনায় পরিচালন ব্যয় প্রায় সাড়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি হয়।
গত অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় আগের অর্থবছরের তুলনায় ৫৭ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৫১ হাজার ৭৭১ কোটি টাকায়। আগের অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ছিল ২ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে প্রকল্প স্থগিত, পুনর্মূল্যায়নসহ নানা কারণে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো সম্ভব হয়নি।
কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়েনি রাজস্ব
সরকারি ব্যয় বাড়লেও রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। ফলে অর্থনীতি বর্তমানে প্রচণ্ড রাজস্ব ঘাটতির মুখে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি ছিল ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি। যদিও মোট রাজস্ব আগের বছরের তুলনায় কিছুটা বেড়ে ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে, তবু তা ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কর-জিডিপি অনুপাতও হতাশাজনকভাবে কমে গত অর্থবছর শেষে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় এক্ষেত্রে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা কম হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে বড় অঙ্কের ব্যয় বৃদ্ধি ভবিষ্যতে সরকারের ওপর ব্যাপক আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অর্থনীতিবিদরা করের হার না বাড়িয়ে প্রশাসনিক দক্ষতা, সুশাসন ও করজাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।
১৫ মাসে ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণ
সরকারি আয়-ব্যয়ের ঘাটতি মেটাতে গিয়ে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে বেশি মাত্রায় ঋণ নিতে হয়েছে সরকারকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পুরো সময় এবং চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাস অর্থাৎ ১৫ মাসে মোট ঋণ নেওয়া হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ প্রকাশিত সর্বশেষ ডেট বা ঋণ বুলেটিন অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪ কোটি টাকা।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ডেট বুলেটিনে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ৩২ হাজার ২৮২ কোটি টাকা উল্লেখ ছিল। পরবর্তী সময়ে বৈদেশিক ঋণকে নতুন বিনিময় হারে রূপান্তর করার কারণে এর পরিমাণ ৫৬ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা বেড়েছে। অর্থাৎ এর পরবর্তী ১৫ মাসে সরকার দেশি-বিদেশি উৎস থেকে মোট ঋণ নিয়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা।
সরকারের ঋণ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার অভ্যন্তরীণ ঋণের চেয়ে বৈদেশিক উৎস থেকে বেশি ঋণ নিয়েছে। এই সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের কিস্তি পাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর থেকে বাজেট সহায়তা নিয়েছে। গত অর্থবছরে ৩৪৪ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা নেওয়া হয়। তার আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২০০ কোটি ডলার। ১৫ মাসে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণের পরিমাণ ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৯ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৪ সালের জুনে অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল ১০ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা, তা গত সেপ্টেম্বর নাগাদ বেড়ে হয়েছে ১১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার মেগা প্রকল্প থেকে সরে আসার পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে উন্নয়ন ব্যয় ব্যাপকভাবে কমালেও ঋণনির্ভরতা কমাতে পারেনি। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ করতে না পারা এবং আগের ঋণ পরিশোধের চাপের পাশাপাশি পরিচালন ব্যয়ে লাগাম টানতে না পারায় ঋণ বাড়াতে হয়েছে। একই সঙ্গে আগের সরকারের বিভিন্ন বকেয়া পরিশোধের কারণে বাড়তি ঋণের প্রয়োজন হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ সমকালকে বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সাধারণত রাজস্ব আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি কিছু উন্নয়ন ব্যয় ব্যবহার হয়। কিন্তু পরিচালন ব্যয়ের সমান রাজস্ব না আসাটা আশঙ্কার। এ ছাড়া উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে পরিচালন ব্যয় বাড়ানোও যৌক্তিক নয়। বরং সরকারকে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব বাড়াতে হবে। কারণ উন্নয়ন ব্যয় না বাড়লে জিডিপির প্রবৃদ্ধি যেমন হবে না, তেমনি কর্মসংস্থানও তৈরি হবে না। আগামীতে এসব বিষয়ে সরকারের বাড়তি নজরদারি প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীতে ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু: অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বর্তমানে অর্থনীতি একটি বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন সরকার সেই সংকটকালে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এখানে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এক, সমষ্টিগত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বর্তমানে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। দুই, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি একটি নির্ভরযোগ্য অবস্থানে নেই। তিন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বর্তমানে অনেক সীমাবদ্ধ। তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকারের প্রথম কাজ হবে বাজেট সংশোধন করা। এ সংশোধনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কাঠামো প্রস্তুত করা। এরপর ধীরে ধীরে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকে এগোনো। তবে তা অবশ্যই আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে করা উচিত।
- বিষয় :
- রাজস্ব আয়
