ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বাড়তে পারে ভর্তুকির চাপ

বাড়তে পারে ভর্তুকির চাপ
×

মেসবাহুল হক

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জ্বালানি আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুতের ভর্তুকির জন্য সরকারের বরাদ্দ রয়েছে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। গত জানুয়ারির মধ্যেই ২২ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। গ্যাস খাতের জন্য বরাদ্দ ছিল ছয় হাজার কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে।

অর্থ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, গত বুধবার প্রতি ইউনিট এলএনজি (মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট বা এমএমবিটিইউ) প্রায় ২২ ডলারে তিনটি কার্গো আমদানি করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধের আগে এই দাম ছিল মাত্র ১০ ডলার। কর্মকর্তা আরও জানান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে প্রতি কার্গো এলএনজি ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা কিনতে হচ্ছে এক হাজার থেকে ১১শ কোটি টাকায়। গত দুই সপ্তাহে দ্বিগুণেরও বেশি দামে পাঁচটি কার্গো কেনার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে এবং আরও তিনটি কার্গো কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এই অবস্থায় দাম কমার সম্ভাবনা নেই, ফলে সরকারের ভর্তুকি চাপ আরও বাড়বে।

জ্বালানি বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এপ্রিল, মে ও জুন এই তিন মাসে ৩১টি কার্গো এলএনজি আমদানি করার কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি কমিয়ে ২৫টি অথবা আরও কমিয়ে ২২টি করা হতে পারে। পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার এবং স্পট এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২০ ডলার ধরে নেওয়া হয়, তাহলে ৩১টি কার্গো আমদানিতে ২০ থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হবে। কার্গো সংখ্যা ২৫-এ নামালে ভর্তুকি লাগবে ১৬ থেকে ১৭ হাজার কোটি টাকা, আর ২২ কার্গো হলে প্রয়োজন হবে ১৪ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার।

বর্তমানে দেশে চাহিদা অনুযায়ী সব বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই কিছু কেন্দ্র চালাতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও চালু রাখা হয়েছে। কয়লা সরবরাহে তেমন সমস্যা নেই, কারণ এটি ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা যায়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম প্রতি টনে ২০ থেকে ৫০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে অতিরিক্ত খরচ তৈরি করেছে।

অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বুধবার এর ক্লোজিং প্রাইস ছিল ব্যারেলপ্রতি ১৫৮ ডলার, যেখানে যুদ্ধ শুরুর আগে দাম ছিল প্রায় ৮৬ ডলার। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বাড়তি দামে জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে বিপিসির আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। গত বছরের বিপিসির মুনাফা থেকে কিছু খরচ করা হচ্ছে, এবং ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থও ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে। ডলারের দাম বাড়ায় আমদানির ব্যয় আরও বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে এলএনজি, তেল, কয়লা, সার এবং ডলারের দাম বাড়ায় সরকারের ভর্তুকি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। বাজেটে বিদ্যুতের ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। তবে কতটা বাড়ানো হবে, তা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর চাহিদা পাওয়ার পর নির্ধারণ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, এলএনজি, জ্বালানি তেল, কয়লা এবং সার এই চার খাতে এক মাসে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তি ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে। পরে এটি অনেক কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় হয়েছে ৫৯ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া এলএনজিতে গত বছর ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে সরকার।

আরও পড়ুন

×