দুর্গম জনপদে ব্র্যাক ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি চ্যালেঞ্জিং। নদীভাঙন, ঘন বনাঞ্চল, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ও উপকূলীয় অঞ্চল– এসব জায়গায় প্রচলিত ব্যাংক শাখা স্থাপন ব্যয়বহুল ও জটিল। ফলে, দীর্ঘদিন ধরে লাখো মানুষ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ছিলেন। এজেন্ট ব্যাংকিং সেই সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে দিয়েছে। এখন ব্যাংক গ্রাহকের কাছে যাচ্ছে। স্থানীয় বিশ্বস্ত উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে যাচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এতে কমেছে সময়, খরচ ও ভোগান্তি– বাড়ছে আস্থা।
এক সময় ব্যাংক মানেই ছিল শহর, পাকা রাস্তা, বড় ভবন আর কাচের দরজা। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে গেছে দেশের এমন সব প্রান্তে, যেখানে একটি ব্যাংক শাখা কল্পনাতীত ছিল। বনাঞ্চলের নিভৃত গ্রাম, নদীভাঙনে বদলে যাওয়া চর, দুর্গম পাহাড়ি পথ, কিংবা ঘূর্ণিঝড়প্রবণ উপকূল– সবখানেই এখন ব্যাংকিং সেবা মানুষের হাতের নাগালে।
গ্রামের কাঁচা রাস্তার পাশে ছোট একটি ঘর, টিনের চালার নিচে বসে লেনদেন করছেন স্থানীয় একজন প্রতিনিধি। এটিই এখন অনেক অঞ্চলের বাস্তব ব্যাংকিং চিত্র। এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ব্র্যাক ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং।
নতুন ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক
ব্র্যাক ব্যাংক জানিয়েছে, তাদের এজেন্ট ব্যাংকিং বর্তমানে ১,১২০টি আউটলেটের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চল, চরাঞ্চল, পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকায় সেবা দিচ্ছে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রাহকরা পাচ্ছেন সেভিংস ও কারেন্ট অ্যাকাউন্ট, ডিপিএস ও এফডিআর, দেশি-বিদেশি রেমিট্যান্স, ক্ষুদ্র ও উদ্যোক্তা ঋণ, সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা বিতরণ এবং ডিজিটাল লেনদেনসহ অন্যান্য মৌলিক ব্যাংকিং সেবা। ফলে শহরকেন্দ্রিক ব্যাংকিং ধারণা ভেঙে তৈরি হয়েছে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক নেটওয়ার্ক।
সংখ্যা বলে বদলের গল্প
সুন্দরবনসংলগ্ন অঞ্চল যেমন– শ্যামনগর, পাইকগাছা, দাকোপ, ফকিরহাট ও কয়রায় স্থাপিত ১৭টি আউটলেট এখন স্থানীয় মানুষের নিয়মিত ব্যাংকিং কেন্দ্র। আগে যেখানে নিরাপদ সঞ্চয়ের সুযোগ ছিল সীমিত, এখন সেখানে মানুষ নিশ্চিন্তে সঞ্চয় করছেন।
চর ও উপকূলীয় অঞ্চল যেমন– চরফ্যাসন, টেকনাফ, কুতুবদিয়া, হাতিয়া, সুবর্ণচর, মোংলা, কলাপাড়া প্রভৃতি এলাকায় ৭৬টি আউটলেটের মাধ্যমে সেবা পৌঁছে গেছে। একইভাবে রামগড়, পঞ্চড়ি, মানিকছড়ি, মাটিরাঙ্গা, লংগদু, দীঘিনালাসহ পাহাড়ি অঞ্চলে ১১টি আউটলেট নিয়মিত সেবা দিচ্ছে। এই বিস্তারের ফলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য গতিশীল হয়েছে, নগদনির্ভরতা কমেছে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমে এসেছে স্বচ্ছতা।
দুর্গম অঞ্চলগুলোতে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিস্তারের ফলে মানুষের মাঝে বেড়েছে ব্যাংকিং কার্যক্রম। ৬০ হাজারেরও বেশি গ্রাহক অ্যাকাউন্ট খুলেছেন, যাদের বেশির ভাগই প্রথমবারের মতো ব্যাংকিং সেবার আওতায় এসেছেন। এই আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ফলে ২০০ কোটি টাকারও বেশি ডিপোজিট এসেছে এবং ৬৫ কোটি টাকারও বেশি অর্থায়ন সুবিধা পেয়েছেন গ্রাহকরা।
ব্যাংকিং মানে শুধু লেনদেন নয়
দুর্গম অঞ্চলে ব্যাংকিং এখন কেবল টাকা জমা বা উত্তোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি হয়ে উঠেছে আর্থিক সচেতনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি প্ল্যাটফর্ম। ফলে আর্থিক লেনদেনে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়ছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সহজ হয়েছে। এ ছাড়া সঞ্চয়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠছে।
স্থানীয় এজেন্টরা কেবল সেবা প্রদানকারী নন; তারা আর্থিক পরামর্শদাতা হিসেবেও কাজ করছেন। ফলে, গ্রাহকের সঙ্গে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি আস্থার সম্পর্ক।
ডিজিটাল সংযোগে এগিয়ে চলা
এজেন্ট ব্যাংকিং ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় দ্রুত ও নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করছে। বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন, রিয়েল-টাইম ট্রানজেকশন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং সিস্টেমের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে গ্রাহকরা পাচ্ছেন শহরের মতোই নির্ভরযোগ্য ব্যাংকিং সেবা। এটি দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে আরও ত্বরান্বিত করছে এবং ‘ক্যাশলেস’ অর্থনীতির পথে এগিয়ে দিচ্ছে।
বদলে যাওয়ার বাংলাদেশ
আজ বন-চর-পাহাড়-উপকূলের মানুষের কাছে ব্যাংক আর দূরের কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। এটি পরিচিত মুখ, আস্থার জায়গা, প্রয়োজনের সঙ্গী। দূরত্বকে জয় করে, ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে ব্র্যাক ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং তৈরি করেছে এক নতুন দৃষ্টান্ত– যেখানে মূল দর্শন হলো অন্তর্ভুক্তি, সক্ষমতা ও টেকসই উন্নয়ন।
ব্যাংকিং এখন আর কেবল একটি সেবা নয়; এটি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা, স্বপ্নপূরণের হাতিয়ার এবং একটি বদলে যাওয়া বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।
- বিষয় :
- ব্যাংকিং ব্যবস্থা
