ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

এক যুগেও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি সিইটিপি, ভুগছে চামড়াশিল্প

এক যুগেও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি  সিইটিপি, ভুগছে চামড়াশিল্প
×

জসিম উদ্দিন বাদল

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৭:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাভারের চামড়া শিল্পনগরী কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) নিয়ে প্রায় এক যুগেও সংকট কাটছে না। ঢাকার হাজারীবাগ থেকে পরিবেশ রক্ষার জন্য ট্যানারি সরিয়ে নেওয়া হয়। হাজার কোটি টাকায় শিল্পনগরী স্থাপন হলেও তা এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ পরিবেশসম্মত রূপ পায়নি। ফলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ না হওয়ায় বাংলাদেশি ট্যানারিগুলো কাঙ্ক্ষিত দামে বিশ্ববাজারে চামড়া রপ্তানি করতে পারছে না। লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদ না পাওয়ায় ইউরোপ-আমেরিকার বড় বাজারে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ দেশে প্রতিবছর পানির দরে বেচাকেনা হচ্ছে কোররবানির পশুর কাঁচা চামড়া।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চামড়া খাতের জন্য কোনো সমন্বিত রপ্তানি নীতি বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই। সিইটিপি নির্মাণের পর সেটির দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও অর্থায়নে সরকারের ধীরগতি, অস্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বয়হীনতার কারণেই এই সংকট দীর্ঘায়িত হয়েছে। তারা বলেন, শুধু কোরবানির মৌসুমেই পরিবেশ দূষণ, চামড়ার দর পতন ও শিল্পের দুরবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়। কয়েকদিন পরই তা আড়াল হয়ে যায়। 

ট্যানারি মালিকরা বলছেন, সিইটিপির জরুরি সংস্কার ও পূর্ণসক্ষমতায় পরিচালনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এলডব্লিউজি সনদ পাওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। বন্ড সুবিধা বা ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত রাসায়নিক আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা ও সহজ অর্থায়ন করতে হবে। এতে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে দেশের চামড়ার প্রবেশ সহজ হবে, রপ্তানি মূল্য বাড়বে এবং কোরবানির চামড়ার দামও বাড়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে সরকারের সংশ্লিষ্টরা জানান, গত দুই বছরে সিইটিপির ব্যাপক সংস্কার হয়েছে। পুরোনো স্পেয়ার পার্টস, পাম্প এবং ব্লোয়ার পরিবর্তন বা মেরামত করা হয়েছে। এর ফলে সিইটিপির কিছু কিছু প্যারামিটার এখন বেশ ভালো অবস্থায় রয়েছে। আগে কঠিন বর্জ্য নিয়ে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকলেও বর্তমানে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে সিইটিপির নকশাগত ত্রুটিগুলোর স্থায়ী সমাধান করা হবে।

প্রকল্পের পটভূমি ও বর্তমান অবস্থা
২০০৩ সালে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে বুড়িগঙ্গা নদী দূষণমুক্ত করতে ট্যানারিগুলোকে সাভারে স্থানান্তরের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্পটি দুই বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এটি সম্পন্ন করতে প্রায় দুই দশক সময় লেগেছে। প্রকল্পের ব্যয় ১৭৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার ১৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সেখানে সিইটিপির কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ২০১২ সালে। ২০১৭ সালের মধ্যে এর কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ২০২১ সালে কাজ ‘সমাপ্ত’ ঘোষণা করা হয়। তবে ট্যানারি মালিকদের মতে, এটি কারিগরিভাবে ‘অসম্পূর্ণ’ এবং ‘পরিবেশবান্ধব নয়’। বিশেষ করে সেন্ট্রাল ক্রোম রিকভারি, সেন্ট্রাল সেডিমেন্টেশন এবং টারশিয়ারি ট্রিটমেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ কম্পোন্যান্টগুলোতে পুরোপুরি কার্যকর ছিল না।
সাভার ট্যানারি শিল্পনগরে কারখানা স্থাপন করা উদ্যোক্তারা জানান, শুরুতে একটি চীনা কোম্পানি সিইটিপি নির্মাণ করে। চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণ শেষে দুই বছর কমিশনিং অর্থাৎ নির্মাণ শেষে আরও দুই বছর কারিগরি পরিচালনা, পরীক্ষামূলক কার্যক্রম ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রকল্প পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার আগেই ওই কোম্পানিকে বিদায় করে দেওয়া হয়। পরে সিইটিপি পরিচালনার জন্য একটি কোম্পানি গঠন করা হয়। নানা সমস্যা নিয়েই ওই কোম্পানির অধীনে চলছে সিইটিপি। প্রথম বছর সরকার প্রায় ৩০ কোটি টাকার মতো সহায়তা দিয়েছিল। 
পরে আর অর্থায়ন হয়নি। এখন ট্যানারি মালিকদের দেওয়া ইউটিলিটি বিল ও ফি দিয়েই সিইটিপি চলছে। ফলে বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি বা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করার মতো সক্ষমতা কোম্পানির নেই।

সিইটিপির কার্যকারিতা কম কেন 
জানা গেছে, চীনা প্রতিষ্ঠানটি সিইটিপির নকশায় ত্রুটি রেখে গেছে। বিশেষ করে বর্জ্য বহনের পাইপের ব্যাস ৩৮ ইঞ্চির বদলে মাত্র ১৮ ইঞ্চি রাখা হয়েছে, যা অতিরিক্ত বর্জ্যের চাপ নিতে পারে না। সিইটিপির দৈনিক শোধন ক্ষমতা ২৫ হাজার ঘনমিটার। অথচ স্বাভাবিক সময়ে ট্যানারিগুলো থেকে ২৮ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য উৎপাদিত হয়। তবে কোরবানির সময় ৪০ থেকে ৫০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য উৎপাদিত হয়। বর্জ্য থেকে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম আলাদা করার ইউনিটটি অকেজো থাকায় বর্জ্য সরাসরি ধলেশ্বরী নদীতে ফেলা হয়। এ কারণে নদীটি বর্তমানে পরিবেশগত বিপর্যয়ের সম্মুখীন। বিষাক্ত ক্রোমিয়াম খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে, যা মাছ ও পোলট্রি মুরগির মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, এই পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে।

এলডব্লিউজি সনদের অভাবে রপ্তানিতে হতাশা 
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ট্যানারি শিল্পের সবচেয়ে বড় বাধা এলডব্লিউজি সনদ। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও এলডব্লিউজি সনদ না থাকায় ট্যানারিগুলো ইউরোপ-আমেরিকায় চামড়া রপ্তানি করতে পারছে না, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছেও পণ্য বিক্রি করতে পারছে না। ফলে তারা পশ্চিমা বাজারের তুলনায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কম দামে চীনে রপ্তানি করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে বছরে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের রপ্তানি আয় হারাচ্ছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে দেশের বেশির ভাগ ট্যানারিকে নিজেদের কাঁচামাল ব্যবহার না 
করে বিদেশি থেকে ফিনিশড চামড়া আমদানি করতে হয়।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সমকালকে বলেন, ট্যানারিপল্লির অনেকেই এখন এই সনদ পাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক অডিটে অন্তত ২০টি ট্যানারিকে এলডব্লিউজি সনদের জন্য উপযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু সিইটিপির কারণে কেউ আবেদনই করতে পারছে না। অর্থাৎ সিইটিপি আন্তর্জাতিক মানের না থাকায় পুরো শিল্পনগরই সনদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশে মাত্র চারটি ট্যানারি এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে। সবগুলোই সাভার ট্যানারিপল্লির বাইরে অবস্থিত।
চামড়ার দাম কমার প্রসঙ্গে এই ট্যানারি মালিক বলেন, ব্র্যান্ডের ক্রেতা সংকটে এক সময়ের হাজার টাকার কাঁচা চামড়া এখন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। তা ছাড়া চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ রাসায়নিক আমদানি করতে হয়। এসব কেমিক্যালের ওপর গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক রয়েছে।

অর্থায়ন নিয়ে জট
বিটিএ সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, সিইটিপি সচল রাখতে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার সংস্কার ও উন্নয়ন দরকার। এ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হলেও বাস্তব অগ্রগতি হয়নি। সাবেক শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান প্রথমে বলেছিলেন, সরকার অনুদান হিসেবে অর্থ দেবে। পরে বলা হলো সিইটিপি কোম্পানিকে অর্থ নিতে হবে ঋণ হিসেবে। কিন্তু এই ঋণের দায় কে নেবে, তা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। ফলে ওই অর্থ আর পাওয়া যায়নি।

বেপজায় হস্তান্তর ও চ্যালেঞ্জ
সিইটিপির এই অবস্থার উন্নয়নে সরকার সাভার এস্টেটের ব্যবস্থাপনা বিসিকের কাছ থেকে নিয়ে বেপজার কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা করছে। তবে এতে কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে। ট্যানারি মালিকদের এক থেকে দেড় হাজার কোটি টাকার অনাদায়ী ব্যাংক ঋণ রয়েছে। বিসিকের ৯৯ বছরের লিজের বিপরীতে বেপজার নিয়ম ৩০ বছরের, যা আইনি জটিলতা সৃষ্টি করছে। বেপজা দায়িত্ব নিলে সিইটিপি ব্যবহারের ফি কয়েক গুণ হয়ে যেতে পারে। তা ছাড়া বেপজার শ্রমিকদের মজুরিও বেশি। এসব খরচ ছোট ট্যানারিগুলোর বহন করা কঠিন হবে। এমন প্রেক্ষাপটে বেপজার অধীনে বিসিককে হস্তান্তর করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কোরবানির সময় বাড়তি চাপ সামলানোর উদ্যোগ 
প্রতিবছর কোরবানির পরই সিইটিপির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। কারণ অল্প কয়েক দিনের মধ্যে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে হয়। শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গতবারের ধারাবাহিকতায় এবারও ধাপে ধাপে ঢাকায় কাঁচা চামড়া প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথম ১০ দিন শুধু ঢাকা জেলার চামড়া এবং পরে অন্যান্য জেলার চামড়া ঢুকতে দেওয়া হবে। যাতে একসঙ্গে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সেজন্যই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিগত দুই বছরের সংস্কার কার্যক্রম
কিছু সংস্কার করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো ক্রোম শেভিং ডাস্ট থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোটিন পাউডার তৈরির প্রজেক্ট শুরু হয়েছে– যা চীন, ইন্দোনেশিয়া ও রাশিয়ায় রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া চামড়ার টুকরো থেকে জিলাটিন এবং জিলাটিন থেকে ক্যাপসুল কাভার তৈরির প্রকল্পও বাস্তবায়িত হয়েছে। সলিড ওয়েস্ট ব্যবহার করে টাইলস তৈরির কাজ পরীক্ষামূলকভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং এখন তা বাণিজ্যিকীকরণের পর্যায়ে রয়েছে।

সিইটিপির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম শাহনেওয়াজ সমকালকে বলেন, আগে বিদ্যুৎ বিল মাসে ৯০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা আসত, তা ৫৫ থেকে ৬০ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। গত দুই-আড়াই বছরে এভাবে প্রায় আট থেকে ১০ কোটি টাকা সাশ্রয় করে তা দিয়ে পুরোনো স্পেয়ার পার্টস, পাম্প এবং ব্লোয়ার মেরামত করায় সিইটিপির কিছু কিছু প্যারামিটার এখন বেশ ভালো আছে। তিনি বলেন, সিইটিপির পূর্ণাঙ্গ ওভারহোলিং কাজ চলছে। কেমিক্যাল ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। কঠিন বর্জ্য সাময়িকভাবে রাখার জন্য দুটি পুকুর সংস্কার করা হয়েছে। 
শিল্প সচিব মো. ওবায়দুর রহমান সমকালকে বলেন, সিইটিপি যেভাবে হওয়ার কথা, প্রকৃতপক্ষে সেভাবে হয়নি। শুরু থেকে অনেক সমস্যা ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কিছু নতুন যন্ত্রপাতি লাগানো হয়েছে, যাতে কোরবানির অতিরিক্ত চাপ নিতে সক্ষম হয়। 
সিইটিপিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার কাজ চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে ইতালীয় প্রতিষ্ঠান ‘ইটালপ্রগতি’ বর্তমানে সিইটিপির পূর্ণাঙ্গ 
কারিগরি মূল্যায়ন করছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট পাওয়া গেলে নকশাগত ত্রুটিগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন

×