ঢাকা মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খাতসংশ্লিষ্টদের মত

বেভারেজ শিল্পে উচ্চ করহারে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে

বেভারেজ শিল্পে উচ্চ করহারে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৭:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে বেভারেজ অত্যন্ত কৌশলগত একটি খাত। এ খাতে বিনিয়োগ শুধু উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা দ্রুত বিকাশমান ভোক্তাপণ্য, প্যাকেজিং, পরিবহন, কোল্ড চেইন অবকাঠামোসহ সংশ্লিষ্ট শিল্পে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে উদ্বুদ্ধ করে। বিনিয়োগ বাড়ার মাধ্যমে দেশের রাজস্ব আহরণও বাড়ে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা হচ্ছে, অর্থনীতির আকারের তুলনায় সরকারি রাজস্ব আয় এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ উভয় ক্ষেত্রেই অনেক পেছনে, বিশ্বে সর্বনিম্ন পর্যায়ের। গত অর্থবছরে বাংলাদেশের নিট বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) ছিল জিডিপির মাত্র ০.৪ শতাংশ, যেখানে একই ধরনের উদীয়মান অর্থনীতি ভিয়েতনামে এই অনুপাত ৪ শতাংশেরও ওপরে। উচ্চ কর এবং জটিল কর ব্যবস্থাকে বাংলাদেশের স্বল্প এফডিআই প্রবাহের অন্যতম বড় কারণ বলে মনে করা হয়।
বাংলাদেশে কার্বনেটেড বেভারেজ বা কোমল পানীয় শিল্পে করহার তিন বছর ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই অস্বাভাবিক কর বৃদ্ধিতে কোমল পানীয়ের দাম বেড়েছে এবং বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় এ খাতের কোম্পানিগুলোর রাজস্ব ও মুনাফা কমছে। ফলে বিদ্যমান বিনিয়োগ এখন স্পষ্টভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে অনিশ্চিত ও উচ্চ করনীতির কারণে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে, যা শিল্পটির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করছে। করহার বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির যে লক্ষ্য সরকার নিয়েছিল, বাস্তবে তা অর্জিত হয়নি। বরং করের বোঝা বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন ও বিক্রি কমে যাওয়ায় এ খাত থেকে সরকারের মোট রাজস্ব আয় বাড়েনি, বরং কমেছে।

বিনিয়োগকারীরা বলছেন, করহার যৌক্তিক করা হলে এই খাতের টেকসই উন্নয়ন হবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং দীর্ঘ মেয়াদে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। আগামী অর্থবছরের (২০২৬-২৭) বাজেট সামনে রেখে ইতোমধ্যে বেভারেজ শিল্পের পক্ষ থেকে এনবিআরের কাছে করের বোঝা কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। 

২০২৩-২৪ অর্থবছরের আগে কার্বোনেটেড বেভারেজ কোম্পানির ন্যূনতম কর অন্যান্য খাতের কোম্পানির মতো মোট বিক্রির ওপর ০.৬০ শতাংশ ছিল। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ন্যূনতম কর পাঁচ গুণ বাড়িয়ে ৩ শতাংশ করা হয়, যা এখনও বহাল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সম্পূরক শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেভারেজ কনসেনট্রেটের ওপর কাস্টমস ডিউটি ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। এর সঙ্গে সরবরাহের প্রতিটি স্তরে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আগে থেকেই আছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে বেভারেজ শিল্পে এখন মোট করভার আনুমানিক ৫৩ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। ভারতে এই হার ৪০ শতাংশ, নেপালে ৩৮ শতাংশ, ভুটানে ৩০ শতাংশ এবং মালদ্বীপে মাত্র ৬ শতাংশ। অন্যদিকে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে বেভারেজ শিল্পে মোট করভার ২০ শতাংশের কাছাকাছি। 
বেভারেজ শিল্পের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এবং একই সঙ্গে এই খাত থেকে রাজস্ব আয় বাড়াতে এনবিআরের কাছে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তাদের প্রস্তাব, বেভারেজ কনসেনট্রেটের ওপর আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে আবার ১০ শতাংশ করা হোক। মোট বিক্রির ওপর ন্যূনতম কর ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হোক। সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হোক। এ ছাড়া বোতলজাত পানি একটি প্রয়োজনীয় পণ্য হওয়ায় এর ওপর সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা হোক। 
এনবিআরের সঙ্গে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট সভায় বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফিকি বলেছে, ২০২৩ সালে কার্বনেটেড বেভারেজ কোম্পানির মোট প্রাপ্তির ওপর আগের তুলনায় ৫০০ শতাংশ করহার বৃদ্ধি ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত, অযৌক্তিক এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্ধিত করের বোঝা বহন করার জন্য কোম্পানিগুলো বিক্রয় মূল্য বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে কোমল পানীয়ের দাম ভোক্তাদের ক্রয়সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। পণ্যের চাহিদা হ্রাস কেবল কোম্পানিগুলোর আয়কে প্রভাবিত করেনি, বরং সরকারের এই শিল্প থেকে সামগ্রিক রাজস্ব সংগ্রহের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।

আরও পড়ুন

×