সাক্ষাৎকার : আজম জে. চৌধুরী
দেশীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও জ্বালানির নিশ্চয়তায় গুরুত্ব দিতে হবে
আজম জে. চৌধুরী চেয়ারম্যান ইস্ট কোস্ট গ্রুপ
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৭:০৭
সমকাল: আপনি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। প্রতি বছরের জাতীয় বাজেটকে একজন ব্যবসায়ীর দৃষ্টিতে কীভাবে মূল্যায়ন করেন? আগামী বাজেটে কোন বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত বলে মনে করেন?
আজম জে. চৌধুরী: বাজেট কোনো সাধারণ বিষয় না। এটি প্রতি বছর মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। ধনী-গরিব, ব্যবসায়ী-চাকরিজীবী সবার জন্যই জাতীয় বাজেট খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাতীয় বাজেট এক বছরের জন্য হলেও সরকারের উচিত বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং প্রতিটি বাজেটকে জোড়া দিলে যেন সহজেই বোঝা যায়, দীর্ঘমেয়াদে জীবনমান এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের পদক্ষেপ আছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমার মতে, এবারের বাজেটে পুঁজিবাজার থেকে টাকা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া উচিত, যাতে ব্যাংক ঋণ কমানো যায়। বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরিতে বাজেটে সঠিক দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। এবারের বাজেটে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত জ্বালানি খাত। কারণ জ্বালানি সরবরাহ ঠিক না থাকলে অর্থনীতি সঠিকভাবে চলবে না।
সমকাল: প্রতি বছর বাজেটের আগে এমন আলোচনা হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আপনারা যা চান তা কি পান? বাজেট কি ভীতিকর কিছু হয়ে আসে?
আজম জে. চৌধুরী: বাজেট সবসময় ভীতিকর থাকে না। রাজনৈতিক সরকারের কাছে মানুষের অনেক প্রত্যাশা
থাকে। যেমন– বর্তমান সরকার যে কার্ডগুলোর মাধ্যমে কৃষক ও ভোক্তাদের সহায়তা দিচ্ছে, বাজেটে তার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকা খুব জরুরি। কারণ এই টাকা মার্কেটে সার্কুলেট হবে এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করবে। সরকারের পাঁচ বছরের ম্যান্ডেট আছে, তাই বাজেটে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। এবার জ্বালানির পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। প্রয়োজনে বাজেট বড় করতে হবে।
সমকাল: বাজেট বড় করতে গেলে তো অর্থায়নের সংকট বাড়ে। কর রাজস্ব কম। আবার ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে করহার না বাড়ানোর জোরালো দাবি আছে।
আজম জে. চৌধুরী: ১৮ কোটি মানুষের চাহিদা পূরণ করতে হলে বাজেট বড় করতে হবে। আবার এটাও ঠিক যে, সরকারের কর-রাজস্ব যথেষ্ট নয়। এই পরিস্থিতির জন্য দুটি প্রধান কারণ দায়ী। প্রথমত, আগেকার সরকারের সময় নিয়ম না মেনে করা বিভিন্ন কাজ এবং অনেকগুলো অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রজেক্টের কারণে ঋণ বেড়ে গেছে। ফলে বাজেটের এক-তৃতীয়াংশ চলে যাচ্ছে ঋণ ও সুদ পরিশোধে। বর্তমান সরকারকে অযৌক্তিক প্রকল্প বাদ দিতে হবে। সরকারকে এখন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বড় বিনিয়োগ করতে হবে। শুধু খরচ করলে চলবে না, গুণমান নিশ্চিত করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন করতে হবে। অন্যথায় কখনই দক্ষ জনশক্তি পাব না। জনশক্তিকে যদি দক্ষতাসম্পন্ন না করা হয়, তাহলে উন্নয়নের যে স্বপ্ন তা বাস্তবায়ন হবে না। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক নানা সংকটে দেশের অর্থনীতি চাপে পড়ে। এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে বা টাকা ছাপলে মুদ্রাস্ফীতি হবে। এই মুদ্রাস্ফীতি কমানোর জন্য উৎপাদনশীলতা এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে।
সমকাল: ব্যবসায়ীরা এবার জ্বালানি নিশ্চয়তার কথা বলছেন। কীভাবে এটা নিশ্চিত করা সম্ভব?
আজম জে. চৌধুরী: জ্বালানি নিশ্চয়তা থাকতেই হবে, না হলে ব্যবসার খরচ বেড়ে গিয়ে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়বেন। আমি মনে করি, জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়টিও বেসরকারি খাতের জন্য উন্মুক্ত করা উচিত। যেমন– এলপিজি খাতটি এখন বেসরকারি খাতই ভালোভাবে পরিচালনা করছে।
সমকাল: বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা দেখেছি, এতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
আজম জে. চৌধুরী: দেখুন, নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও যদি তার অপব্যবহার করা হয়, তবে সেজন্য বেসরকারি খাতকে দায়ী করা ঠিক নয়। সারাবিশ্বেই ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার কোম্পানি আছে এবং তারা সফলভাবে কাজ করছে। কিন্তু আমাদের দেশে যখন চুক্তি করা হয়েছে, তখন বেসরকারি খাতকে কিছু অস্বাভাবিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে যা অন্য কোনো দেশে দেখা যায় না। এখানে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়েছে।
সমকাল: আমলাতন্ত্র নিয়ে ব্যবসায়ীদের অনেক অভিযোগ থাকে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
আজম জে. চৌধুরী: আমলারা অনেক সময় সরকারকে মিসগাইড এবং প্রক্রিয়াগুলোকে জটিল করে রাখেন। দুর্নীতি কমাতে হলে এবং অর্থনীতি সচল করতে হলে প্রসেস সিম্প্লিফিকেশন বা প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ– কাস্টমসে কোনো মেশিনারি এলে ডিক্লারেশন অনুযায়ী দ্রুত খালাস করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। যদি কেউ ভুল তথ্য দেয় তবে পরে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, কিন্তু এক মাস পণ্য আটকে রাখা ঠিক নয়। ডিজিটাল বা অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশন কমিয়ে আনতে হবে।
সমকাল: বাজেটে আপনার বিশেষ কোনো চাওয়া আছে কি?
আজম জে. চৌধুরী: প্রথমত, জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও কারিগরি প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে যাতে প্রবাসীরা বিদেশে গিয়ে আরও বেশি আয় করতে পারে। তাদের আয়ে দেশের ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ঠিক থাকছে, সামষ্টিক অর্থনীতি ভালো আছে। বিশ্বে আমাদের আর শুধু সাধারণ অদক্ষ শ্রমিক করে যেন রাখা না হয়, যেন দক্ষতা বাড়ানো হয়। যেমন, একজন সাধারণ ক্রু বা শিপ ইঞ্জিনিয়ার মাসিক আয় তিন হাজার ডলারের কম নয়, থাকা-খাওয়া সব ফ্রি। আমাদের এমন কর্মী তৈরি করতে হবে।
তৃতীয়ত, দেশি বিনিয়োগকে আগে উৎসাহিত করতে হবে। এ জন্য বাজেটে বিশেষ উদ্যোগ থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের মানুষ বিনিয়োগ না করলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না।
চতুর্থত, বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের কর-রাজস্ব বাড়াতেই হবে। এ জন্য করের আওতা বাড়াতে হবে। শুধু শহরের কিছু মানুষের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে সারাদেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটা নির্দিষ্ট ট্যাক্স বা ক্যাপাসিটি চার্জের আওতায় আনতে হবে।
সমকাল: ব্যবসায়ীরা অনেক সময় ট্যাক্স বা কাস্টমস কর্তৃপক্ষের হয়রানি নিয়ে কথা বলেন। এই হয়রানি বন্ধে কী চান?
আজম জে. চৌধুরী: ‘প্রসেস সিম্পল’ করলেই হয়রানি কমবে। যেমন, জমি মিউটেশন বা ট্রেড লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া যদি সহজ হয়, তবে মানুষ নিজ থেকেই ফি জমা দেবে এবং দুর্নীতি কমবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘ডব্লিউপিপিএফ’ আইন রিভিজিট করা। এখানে শ্রমিক ও কর্মকর্তার সংজ্ঞা স্পষ্ট না থাকায় শ্রমিকদের পাওনায় কর্মকর্তারা ভাগ বসায়। অন্য অনেক কারণের মধ্যে এই কারণেও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আসতে চায় না। সম্প্রতি এ হার কমিয়ে দেড় শতাংশ করা নিয়ে অনেক সমালোচনা হচ্ছে। কিন্তু মূল আইনে সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনতে হবে। এ ছাড়া লভ্যাংশের ওপর দ্বৈত কর ব্যবস্থা বাতিল করতে হবে। কোম্পানি যে আয়ের পর কর দিয়ে উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিল, তার ওপর ফের কর ধার্য করা যৌক্তিক নয়। এটা বদলাতে হবে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহীম
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার
