বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎসাহিত করতে প্রকল্প প্রস্তাব
বিআরটিসির ই-বাসের জন্য চারটি চার্জিং স্টেশন হবে
দ্রুতগতির চার্জিং স্টেশন স্থাপনে খরচ হবে প্রায় ৮ কোটি টাকা
মেসবাহুল হক
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং দেশের পরিবহন খাতে জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে বড় ধরনের নীতিগত উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক যান (ইভি) চালু এবং এ খাতের জন্য একটি টেকসই ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে বাংলাদেশ এনাবলিং ইলেকট্রিক ভেহিকল অ্যাডপশন (বিভা) শীর্ষক একটি বিশেষ কারিগরি সহায়তা প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) এবং পরিবেশ অধিদপ্তর। শিগগিরই প্রকল্পটি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (এসপিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই সভার জন্য প্রস্তুত করা কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত পরিবহন খাতে বায়ুদূষণ, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার যে সংকট রয়েছে, তা মোকাবিলায় এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি শুধু একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প নয়, বরং পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থায় রূপান্তরের ক্ষেত্রেও একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।
সিংহভাগ অর্থ অনুদান থেকে
কার্যপত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ‘বিভা’ প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫ কোটি ৩৪ লাখ সাত হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে দুই কোটি ৩০ লাখ টাকা। বাকি অর্থের মধ্যে আন্তর্জাতিক পরিবেশ অর্থায়ন সংস্থা গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ) দেবে ২১ কোটি ৮২ লাখ টাকা এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) দেবে এক কোটি ২২ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে বৈদেশিক অনুদান পাওয়া যাবে ২৩ কোটি চার লাখ ৫৩ হাজার টাকার সমপরিমাণ, যা প্রায় ১৮ লাখ ৮৮ হাজার মার্কিন ডলার। প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০২৯ নভেম্বর।
ই-বাসের জন্য উচ্চক্ষমতার চার্জিং স্টেশন
প্রস্তাবিত প্রকল্পের কারিগরি উপাদান পর্যালোচনায় দেখা যায়, এতে রাজধানী ঢাকায় বৈদ্যুতিক বাস পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্যোগ হলো বিআরটিসির বৈদ্যুতিক বাসের জন্য সাত কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয়ে চারটি ৩০০ থেকে ৫০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার দ্রুতগতির চার্জিং স্টেশন স্থাপন। এসব স্টেশনের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে ই-বাস চার্জ দেওয়া সম্ভব হবে।
ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার কারখানা
পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যে প্রকল্পের আওতায় এক কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে দেশে প্রথমবারের মতো একটি বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার ও নিরাপদ নিষ্পত্তির পাইলট কারখানা স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে ব্যবহারের মেয়াদ শেষ হওয়া লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশসম্মত উপায়ে নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা হবে।
এ ছাড়া দুই ও তিন চাকার বৈদ্যুতিক যানের জন্য এক কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ে সৌর বিদ্যুৎচালিত তিনটি হাইব্রিড চার্জিং স্টেশন স্থাপন করা হবে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা নিতে ব্যয় ধরা হয়েছে তিন কোটি ৭৬ লাখ টাকা। পাশাপাশি বিআরটিসির চালক ও কারিগরি কর্মীদের দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য প্রায় দুই কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
পরিবহন খাতকে ধাপে ধাপে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থায় রূপান্তরের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই প্রকল্প শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বায়ুদূষণ কমানো ও আধুনিক গণপরিবহন নিশ্চিত করতে সরকার সারাদেশে পর্যায়ক্রমে প্রায় এক হাজার ৪০০টি বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে। বিআরটিসির বহরে ইতোমধ্যে ই-বাস যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে এসব বাসের চার্জিং ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে অবকাঠামো প্রয়োজন হবে, তার ভিত্তি তৈরি করবে ‘বিভা’ প্রকল্প।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটেও বৈদ্যুতিক যানশিল্প বিকাশে বিভিন্ন কর-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ইভি আমদানিতে শুল্ক ছাড়, ব্যক্তিগত বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধনে রেয়াতি সুবিধা এবং চার্জিং স্টেশন স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য আয়কর ছাড়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সরকারের ধারণা, এসব নীতিগত প্রণোদনা ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক উভয় ক্ষেত্রেই বৈদ্যুতিক যান ব্যবহারের গতি বাড়াবে।
পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণ
পরিকল্পনা কমিশন এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত ইতিবাচক বলে মনে করছে। তবে প্রস্তাবিত প্রকল্পে জনবল, প্রেষণ এবং আউটসোর্সিং পদের সংখ্যায় কিছু অসংগতি রয়েছে উল্লেখ করে এগুলো সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কমিশনের পক্ষ থেকে। কমিশন আরও বলেছে, ৩০০ থেকে ৫০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার চার্জিং স্টেশন কোথায় স্থাপন করা হবে ও সেখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ বিভাগের অনাপত্তিপত্র নিতে হবে। এ ছাড়া ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার কারখানা পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা পুরোপুরি অনুসরণ নিশ্চিত করারও সুপারিশ করা হয়েছে।
সমন্বিত বাস্তবায়নই সফলতার শর্ত
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত দুই দশকে পরিবহন খাতের অনেক বড় প্রকল্প সমন্বয়ের অভাবে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ‘বিভা’ প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে দেশে বৈদ্যুতিক যানব্যবস্থার জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হবে।
তাদের মতে, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, বিআরটিএ, বিআরটিসি, বিদ্যুৎ বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমবে। সেই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব নগর পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হবে।
- বিষয় :
- গাড়ি ক্রয়