বৈদ্যুতিক গাড়িতে বিনিয়োগ বাড়ছে অবকাঠামোই বড় চ্যালেঞ্জ
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির বিস্তার এবং জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর দিকে নজর দিচ্ছে আধুনিক বিশ্ব। এ জন্য বিশ্ববাজারে দ্রুত চাহিদা বাড়ছে ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি) বা বৈদ্যুতিক যানবাহনের। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের পরিবহন খাতও হাঁটছে একই পথে। ইতোমধ্যে এ খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ চার হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বমানের ব্যাটারি ও ইভি প্রযুক্তি উৎপাদনে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের এই আগাম বিনিয়োগ দেশের ‘সবুজ অর্থনীতি’ (গ্রিন ইকোনমি) পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে। তবে দেশে জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব ইভি প্রসারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পর্যাপ্ত চার্জিং অবকাঠামোর অভাব, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা এবং নীতিগত জটিলতা। এ ছাড়া অ্যাসেম্বলিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে প্রধানত চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার এবার বাজেটে এ খাতে অনেক শুল্ক-কর ছাড় দিয়েছে, যা বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করবে। তবে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অর্থায়ন সহজ করা এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দ্রুত চার্জিং স্টেশন স্থাপন। তাহলে এ খাতে এক ধরনের নীরব বিপ্লব ঘটবে, যা দেশের জ্বালানি সংকট দূর করতে বড় ভূমিকা রাখবে। তবে গাড়ি সরবরাহ পর্যায়ের ভ্যাট নিয়ে উদ্যোক্তাদের দুশ্চিন্তা রয়েছে। তাদের ভাষ্য, উৎপাদন পর্যায়ে ছাড় দেওয়া হলেও পরিবেশক ও ডিলার পর্যায়ে কর না কমলে গাড়ির চূড়ান্ত দাম কমবে না।
খরচে বড় সাশ্রয় ও উচ্চ কার্যক্ষমতা
সম্প্রতি ইভি খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পেট্রোল, ডিজেল বা সিএনজিচালিত যানবাহনের তুলনায় ইভির পরিচালন ব্যয় অনেক কম। যেখানে জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত একটি গাড়ির কিলোমিটারে খরচ পড়ে ১১ থেকে ১৪ টাকা, সেখানে ইভিতে এই খরচ মাত্র দুই টাকা ৮০ পয়সা থেকে তিন টাকা ৮০ পয়সা। এ ছাড়া ইঞ্জিন জটিলতা না থাকায় ইভির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কম এবং শক্তি দক্ষতা ৭৫ থেকে ৯০ শতাংশ, যা প্রচলিত গাড়ির চেয়ে বহুগুণ বেশি।
বিনিয়োগ চিত্র
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রথমবারের মতো ইভি উৎপাদন শুরু করেছে বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। চট্টগ্রামের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এনএসইজেড) ১০০ একর জায়গায় কারখানা নির্মাণ করে প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মাসুদ সমকালকে বলেন, পাইপলাইনে তাদের আরও ৫-৬শ’ কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে।
জানা গেছে, ইভি উৎপাদন ও চার্জিং স্টেশন স্থাপনে নাসির গ্রুপ ৫০০ কোটি টাকা এবং আকিজ গ্রুপ ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। চীনভিত্তিক বিশ্বখ্যাত বিওয়াইডি ব্র্যান্ডের ইভি আমদানি করে বাজারজাত করছে রানার। এখন তারা নিজেরাও উৎপাদনে যাচ্ছে। বিওয়াইডি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিদ সাকিফ খান সমকালকে বলেন, ইভি কারখানায় রানারের বিনিয়োগের লক্ষ্য ৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে ময়মনসিংহের ভালুকায় বিদ্যমান কারখানায় ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।
র্যানকন গ্রুপ ফোর-হুইলার ইভি উৎপাদন ও চার্জিং স্টেশন করার পরিকল্পনা নিয়ে প্রাথমিকভাবে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া মূলত ইভি স্কুটার উৎপাদনে ওয়ালটন এবং প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ২০০ কোটি টাকা করে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটিতে দেশি-বিদেশি ১৪টি কোম্পানি প্রায় ২৪৫ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব করেছে, যা ইভি অ্যাসেম্বলিং, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি তৈরি, স্পেয়ার পার্টস প্রস্তুত এবং আইওটিভিত্তিক চার্জিং নেটওয়ার্ক স্থাপনে ব্যবহৃত হবে। এর মধ্যে ১১টি শতভাগ দেশীয় কোম্পানির বিনিয়োগ প্রস্তাব ১৬১ কোটি ৮৭ লাখ টাকার। এককভাবে সবচেয়ে বড় প্রস্তাবটি দিয়েছে গ্রেটওয়াল হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ। গাজীপুরের শ্রীপুরে ৯০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। নেপালভিত্তিক যৌথ উদ্যোগের সিজি রানার বিডি সাভারে ৭১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বিনিয়োগে যাত্রী ও পণ্যবাহী বাণিজ্যিক ইভি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। রাজবাড়ীর ডিএক্স নিউ এনার্জি ইন্ডাস্ট্রিজ ব্যাটারি ও ইভি স্পেয়ার পার্টস তৈরিতে ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে। এ ছাড়া কনফিডেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার সাড়ে ১১ কোটি, বাংলামার্ক প্রায় ১০ কোটি এবং বেসেটেক গ্লোবাল প্রায় ১০ কোটি টাকার বিনিয়োগ করবে।
ইভি ও বাজার বাস্তবতা
বর্তমানে বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ বেঞ্জ, আউডিসহ কয়েকটি ব্র্যান্ডের ইভি বাংলাদেশে বাজারজাত করা হচ্ছে, যারা বছরে আনুমানিক ২০০ থেকে ৩০০টি গাড়ি বিক্রি করে। মার্সিডিজ বেঞ্জ বাংলাদেশের হেড অব সেলস ফয়সাল আহমেদ সমকালকে বলেন, সাধারণ গাড়িতে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার জ্বালানি লাগলে, ইভিতে সমপরিমাণ ব্যবহারে মাত্র ২-৩ হাজার টাকার বিদ্যুৎ বিল আসে। যানজটেও ইভি ব্যাটারিতে কম খরচ হয়। তবে বাজেটে সাধারণ ইভিতে কর কিছুটা কমালেও বিলাসবহুল ইভিতে কর উল্টো বাড়ানো হয়েছে। যদিও প্লাগ-ইন হাইব্রিডে শুল্ক কিছুটা কমেছে। তিনি আরও জানান, ফুয়েল স্টেশনগুলোতে এখনও চার্জিং সুবিধা গড়ে না ওঠায় আপাতত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব অর্থায়নে সীমিত পরিসরে চার্জিং পয়েন্ট বসাচ্ছে, যেখানে বড় বিনিয়োগ দরকার।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যমতে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ৮৩০টি বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে চারটি, ২০২২ সালে দুটি, ২০২৩ সালে ৩৮টি, ২০২৪ সালে ৬৬টি ও ২০২৫ সালে ২৩৮টি বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন হয়েছে। এর বিক্রি দ্রুত বাড়ছে। চলতি বছরের এ পর্যন্ত ৪৭৮টি বৈদ্যুতিক গাড়ি নিবন্ধন নিয়েছে বলে জানা গেছে।
বাজেটে দেওয়া সুবিধা ও লক্ষ্যমাত্রা
এ খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকার চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ইভি আমদানিতে মোট করের বোঝা ৯৩ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশ করেছে। এ পদক্ষেপ ইভির দাম কমাতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে ৩ ও ৪ চাকার ইভি বডি তৈরি, ওয়েল্ডিং, পেইন্টিং ও সংযোজনকারীদের কাঁচামাল আমদানিতে ৩ শতাংশ শুল্ক বাদে বাকি সব শুল্ক-কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। চার্জিং যন্ত্রপাতির ওপরও শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে এবং চার্জিং স্টেশন অপারেটরদের জন্য আর্থিক প্রণোদনার চিন্তাভাবনা চলছে।
এ ছাড়া শিল্প মন্ত্রণালয়ের খসড়া ইভি শিল্প উন্নয়ন নীতিমালায় চার্জিং স্টেশন ব্যবসার জন্য ১০ বছরের আয়কর অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ৩০ শতাংশ যানবাহন ইভিতে রূপান্তর এবং এক হাজার ২০০টি বাণিজ্যিক ইভি চার্জিং স্টেশন স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
র্যানকন গ্রুপের অটো ডিভিশন-২ নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রশিদ ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশ তৈরি পোশাক ও ওষুধের পর জাহাজ বা ইলেকট্রনিকস শিল্পে যেমন ধাপে ধাপে সক্ষমতা অর্জন করেছে, অটোমোবাইল শিল্পেও একইভাবে সম্ভব। প্রথমে হয়তো অ্যাসেমব্লি ও বডি নির্মাণের মাধ্যমে শুরু হবে। কিন্তু এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে একদিন বাংলাদেশ নিজস্ব নকশা, সফটওয়্যার ও ব্র্যান্ড পরিচয়ে গাড়ি তৈরি করবে। সরকার, বিনিয়োগকারী এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি একটি সম্মিলিত লক্ষ্য নিয়ে একযোগে কাজ করে, তবে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা গাড়ি আর কেবল স্বপ্ন হয়ে থাকবে না, বরং আমাদের জাতীয় অর্জনে পরিণত হবে।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ সমকালকে বলেন, দেশে ইভির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ দুটিই রয়েছে। ইভিতে পরিচালন খরচ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম। ফলে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব।
তিনি বলেন, বাজেটে ইভিতে কর কমানোর ফলে উদ্যোক্তারা আকৃষ্ট হবেন। ইভির সম্ভাবনা বাস্তবায়নে প্রধান বাধাগুলো হচ্ছে অপর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশন, বিদ্যুৎ সংকট ও পর্যাপ্ত ডিপোর অভাব। পাশাপাশি বর্তমানে আনুমানিক ৬০ লাখ অনিবন্ধিত থ্রি-হুইলার মান নিয়ন্ত্রণের অভাবে পরিবেশ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। সরকার কর প্রণোদনা ও খসড়া নীতিমালা এনেছে ঠিকই, কিন্তু টেকসই ইকোসেস্টেম গঠনে সমন্বিত উদ্যোগ এখনও নেয়া হয়নি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব ও সমন্বিত নীতি বাস্তবায়ন দরকার।
বিডার ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের প্রধান নাহিয়ান রহমান রোচি সমকালকে বলেন, ইভি খাত যেন দ্রুত প্রসার লাভ করতে পারে সেজন্য বাজেটে বেশ কিছু সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে এ খাতে বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। কিছু পাইপলাইনে আছে। স্থানীয় উদ্যোক্তার পাশাপাশি বিদেশিরাও এগিয়ে আসছে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীন এ খাতে বড় বিনিয়োগে আগ্রহী। এই মুহূর্তে বিনিয়োগের পরিমাণ বলা যাচ্ছে না, তবে দেশ দুটি বড় বিনিযোগের পরিকল্পনা নিয়েই এগিয়ে আসছে।
- বিষয় :
- গাড়ি ক্রয়