অভিমত
নিরাপত্তা ও আস্থায় এগিয়ে যাক ডিজিটাল অর্থনীতি
জাকিয়া সুলতানা
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৭ | আপডেট: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ১৫:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
ডিজিটাল লেনদেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা যখন কথা বলি, তখন সাধারণত আমাদের আলোচনার কেন্দ্রে থাকে লেনদেনের সংখ্যা, কার্ডের ব্যবহার কিংবা ডিজিটাল মাধ্যমে মানুষের অংশগ্রহণের হার। কিন্তু আমার কাছে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–মানুষ কতটা আস্থার সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেন করছে।
ডিজিটাল রূপান্তরের সাফল্য শুধু কত মানুষ ক্যাশ থেকে ডিজিটাল লেনদেনে এলেন, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। গ্রাহক যদি লেনদেনের সময় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, তাহলে এই পরিবর্তন কখনোই তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাবে না। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির পরবর্তী অধ্যায় তাই শুধু উদ্ভাবনের নয়; এটি হবে নিরাপত্তা, আস্থা ও অন্তর্ভুক্তির অধ্যায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহার এবং এর মাধ্যমে লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহার বাড়ার প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এই পরিবর্তন শুধু কার্ডের সংখ্যা বাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের লেনদেনের অভ্যাস ও পছন্দও দ্রুত বদলাচ্ছে। কার্ড ও অন্যান্য ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যম এখন দৈনন্দিন কেনাকাটার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, জীবনযাপন, ব্যবসা ও বিভিন্ন সেবার সঙ্গে ক্রমেই আরও গভীরভাবে যুক্ত হচ্ছে।
কিন্তু ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বও বাড়ে। ডিজিটাল লেনদেন যত বাড়ছে, প্রতারণার কৌশলও তত পরিবর্তিত ও জটিল হচ্ছে। তাই আমাদের এখন এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়, বরং প্রতিটি লেনদেনের স্বাভাবিক অংশ। এখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতারণা শনাক্তকরণ প্রযুক্তির গুরুত্ব। বিপুলসংখ্যক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই প্রযুক্তি অস্বাভাবিক আচরণ শনাক্ত করতে পারে এবং সন্দেহজনক লেনদেন দ্রুত চিহ্নিত করতে সহায়তা করে। একইভাবে, টোকেনাইজেশন প্রযুক্তি অনলাইন লেনদেনের সময় প্রকৃত কার্ডের তথ্যের পরিবর্তে একটি বিকল্প ডিজিটাল পরিচয় ব্যবহার করে। ফলে লেনদেনের সময় প্রকৃত কার্ড নম্বর সরাসরি প্রকাশের প্রয়োজন হয় না, যা সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মাস্টারকার্ডে আমরা এই প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতের বিষয় হিসেবে দেখি না; এটি ইতোমধ্যে আমাদের বর্তমানের অংশ। বিশ্বজুড়ে মাস্টারকার্ডের ৩০ শতাংশের বেশি লেনদেন এখন ‘টোকেনাইজড’। ২০৩০ সালের মধ্যে সব অনলাইন লেনদেন ‘টোকেনাইজড’ করার লক্ষ্য আমাদের। নিরাপত্তার পাশাপাশি পরিচয় যাচাইয়ের আধুনিক প্রযুক্তিও আমরা ব্যবহার করছি, যাতে প্রকৃত কার্ডধারীকে আরও নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করা যায়।
তবে আমাদের কাছে নিরাপত্তার অর্থ শুধু প্রযুক্তি নয়। নিরাপত্তার চূড়ান্ত ফল হলো আস্থা। একজন শিক্ষার্থী যখন প্রথম ডিজিটাল লেনদেন করছেন, একজন ফ্রিল্যান্সার যখন আন্তর্জাতিক পারিশ্রমিক গ্রহণ করছেন, কিংবা একজন ছোট ব্যবসায়ী যখন নিজের ব্যবসার লেনদেন পরিচালনা করছেন–প্রত্যেকেরই জানতে হবে যে ব্যবস্থাটি নিরাপদ এবং তিনি এর ওপর নির্ভর করতে পারেন।
বাংলাদেশে মাস্টারকার্ডের সম্পৃক্ততাও এই আস্থা ও উদ্ভাবনের দীর্ঘ যাত্রার অংশ। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে মাস্টারকার্ডের কার্ড একসেপট্যান্স চালুর মাধ্যমে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ১৯৯৭ সালে প্রথমবারের মতো মাস্টারকার্ড ব্র্যান্ডেড ক্রেডিট কার্ড চালু এবং পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালে ঢাকায় কান্ট্রি অফিস স্থাপনের মধ্য দিয়ে দেশের ব্যাংক, আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী এবং অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে আমাদের কাজ আরও বিস্তৃত হয়েছে। আজ আমরা নিজেদের শুধু একটি পেমেন্ট নেটওয়ার্ক হিসেবে দেখি না; আমরা নিরাপদ, উদ্ভাবনী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রযুক্তিগত অংশীদার হিসেবে কাজ করছি।
বাংলাদেশে উদ্ভাবনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। নম্বরবিহীন ডেবিট কার্ড যেমন কার্ডের তথ্যের দৃশ্যমানতা কমিয়ে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি বাংলাদেশে বিশ্বের প্রথম বায়োমেট্রিক মেটাল ক্রেডিট কার্ডও চালু হয়েছে। এসব উদ্যোগ আমাদের কাছে শুধু নতুন প্রযুক্তির প্রদর্শন নয়; এগুলোর উদ্দেশ্য হলো মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনকে আরও নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করা।
তবে প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, একা তা সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। সম্প্রতি কার্ডের ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে (জুন, ২০২৬) ক্যাশলেস অর্থনীতির পথে ডিজিটাল অবকাঠামোর ঘাটতি, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে আর্থিক সাক্ষরতার ঘাটতি, সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার অভাবকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ব্যাংক, ফিনটেক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা ছাড়া একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও ক্যাশলেস লেনদেনের সুবিধার পাশাপাশি এর ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে।
মাস্টারকার্ড বিশ্বজুড়ে ইতোমধ্যে ১০০ কোটি মানুষ এবং সাড়ে ছয় কোটির বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাকে ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে আরও ৫০ কোটি মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসাকে ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত ও সুরক্ষিত করার লক্ষ্য আমাদের। বাংলাদেশের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল বাজারে এই লক্ষ্য আমাদের কাজের সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তাই বাংলাদেশের সামনে এখন প্রশ্নটি শুধু কত দ্রুত আমরা ক্যাশের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারব, তা নয়। প্রশ্ন হলো–আমরা কতটা নিরাপদ, আন্তঃসংযুক্ত এবং সবার জন্য সহজলভ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা তৈরি করতে পারব।
আমাদের বিশ্বাস, বাংলাদেশের পরবর্তী ডিজিটাল অর্থনীতির অগ্রযাত্রা শুধু আরও বেশি কার্ড, আরও বেশি লেনদেন কিংবা আরও নতুন প্রযুক্তির গল্প হবে না। এটি হবে এমন একটি ব্যবস্থার গল্প, যেখানে একজন শিক্ষার্থী, একজন ফ্রিল্যান্সার, একজন উদ্যোক্তা, প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন ক্ষুদ্র বিক্রেতা কিংবা একজন সাধারণ ভোক্তা–প্রত্যেকেই সমান আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেন করতে পারবেন। কারণ একটি ক্যাশলেস অর্থনীতি তখনই সফল, যখন মানুষ শুধু জানেন না যে, প্রযুক্তি কাজ করে, তারা বিশ্বাস করেন প্রযুক্তি তাদের সুরক্ষিত রাখে। সেই আস্থাই হবে বাংলাদেশের আধুনিক অর্থনীতির ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শক্তি।
লেখক : কান্ট্রি ম্যানেজার, বাংলাদেশ, মাস্টারকার্ড
- বিষয় :
- অভিমত
- ডিজিটাল লেনদেন