মত তো প্রচুর পথ কি বর্ণিল?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৩ | ২০:৩৯
সমকাল তার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের অংশ হিসেবে একটি প্রতিপাদ্য বেছে নিয়েছে– ‘বহুমত, বর্ণিল পথ’– এ প্রতিপাদ্যটির মাধ্যমে নিশ্চয় সংবাদপত্রটি বাংলাদেশের সমাজে প্রচলিত নানা দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভাবনাচিন্তার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি, অথবা আমাদের উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়ন-গবেষণা থেকে প্রাপ্ত বহুমতের, তত্ত্বের এবং প্রত্যয়ের সম্মিলনের দিকেও ইঙ্গিত দেয়নি। দিয়েছে রাজনীতির আকীর্ণ অঞ্চলের দিকে যাতে বহু মত আছে, এবং পথ আছে– থাকারই কথা, যেহেতু আমরা নিজেদের গণতান্ত্রিক বলে দাবি করি।
বহু মত যে রয়েছে তা গ্রামেগঞ্জের চায়ের দোকানে ঘণ্টাখানেক বসলেই বোঝা যায়, গণতন্ত্র বহুমতকে ধারণ করেই ঋদ্ধ হয়, বহু পথ ধরে সেসব মতকে বাধাহীনভাবে সেগুলোকে বিকশিত হতে দিয়েই শক্তিশালী হয়। মতের নিজস্ব কিছু রং থাকে, যেমন মার্ক্সবাদ ও সমাজতন্ত্র/কমিউনিজমের রং লাল, লিবিয়ার প্রয়াত শাসক গাদ্দাফি তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের রং দিয়েছিলেন সবুজ। কোনো কোনো দেশে নীল রংটি পছন্দ রক্ষণশীলদের, আর উদারপন্থিদের প্রিয় রং হলুদ। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের এবং আইনজীবীদের নানা সংগঠন, যেগুলো দেশের বড় (এবং ছোট) রাজনৈতিক দলগুলোর অনুসারী, নীল-সাদা-গোলাপি এ রকম নানা বর্ণকে তাদের প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছে। তবে সমকাল বর্ণিল বলতে শুধু এই রং বিভাজনকে নিশ্চয় বোঝায়নি, বুঝিয়েছে রঙিন একটি পরিবেশকেও, যা প্রাণবন্ত, উদযাপনপ্রবণ এবং দৃষ্টিনন্দন। এটি করতে গিয়ে অবশ্য সংবাদপত্রটি একটি হেত্বাভাসের অবতারণা করেছে, অথবা বিরোধালঙ্কারের– যাকে ইংরেজিতে বলে অক্সিমরোন, যার একটি উদাহরণ, ‘গরম বরফ’। কারণ আমাদের দেশে বহুমতের সম্মিলনে কখনও বর্ণিল কিছুর সৃষ্টি হয় না; বহু মত আছে, কিন্তু পথ কখনও বর্ণিল নয়। পথ সবসময় রুক্ষ, বন্ধুর, সংঘাতে-সংঘর্ষে অনতিক্রম্য।
তবে সকল মতের জন্য নয়, কোনো একটি সময়ে যে মতের অনুসারীরা ক্ষমতায়, সেই মতের জন্য পথটি থাকে মসৃণ, বাধাহীন। আবার কোনো কোনো মত, যেগুলো উগ্রতাকে বাহন হিসেবে বেছে নেয়, নিজেদের মতো পথ করে নেয়, কিন্তু সে পথ তাদের নিয়ে যায় ভুল ঠিকানায়। বহু মত, অবশ্যই, কিন্তু পথগুলো কঠিন। সেই পথ অনেকের জন্য বিপদের, বিনাশেরও। রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের একটা বড় অপূর্ণতা, একটা সত্যিকারের বহুমতধারী, বহু পথসঞ্চারী গণতন্ত্র এখনও আমরা তৈরি করতে পারিনি। মতের অভাব নেই, কিন্তু সব মতের নিশানা এক নয়, যা পরিপক্ব গণতন্ত্রের একটা পরিচয় বলে আমরা জানি, অর্থাৎ দেশের সকল মানুষের অংশগ্রহণে একটি কার্যকর রাষ্ট্র-পরিচালনা পদ্ধতির বিকাশ সাধন, এবং দেশের ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম– এ রকম কিছু বিষয়ে অকারণ বিতর্ক না তুলে বরং একটা ঐকমত্যের অবস্থানে পৌঁছা।
আমাদের উপনিবেশী এবং নব্য-উপনিবেশী আমলের (১৯৪৭-১৯৭১) সংগ্রাম, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, সাংস্কৃতিক বহুত্ব, সকল ধর্মের অনুসারীদের ধর্মচর্চার স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং শোষণমুক্ত একটি সমাজ গড়ার অঙ্গীকার ইত্যাদি বিষয়ে একমত হওয়ার উদাহরণ তো নেই-ই, বরং ইতিহাসকে নিজের মতো সাজিয়ে নেওয়া, সংখ্যালঘুদের ধর্মচর্চায় বাধা দেওয়া ও তাদের নিপীড়ন করা, সংস্কৃতিকে অস্বীকার করা– এসব হয়ে দাঁড়িয়েছে নিত্যদিনের চর্চা। পথ তাহলে রঙিন হয় কীভাবে? যেটুকু রং, তা যারা ক্ষমতায় থাকেন, তাদের নানা উদযাপনের, আর রাজনৈতিক সংঘাত চরমে পৌঁছালে, রক্তপাতের।
পশ্চিমা উপনিবেশী শক্তি দীর্ঘদিন পুবের যেসব দেশ শাসন করেছে, সেসব দেশের দীর্ঘদিনে বেড়ে ওঠা স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও কাঠামোগুলো ধ্বংস করেছে। যেমন বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার। সেগুলোর পরিবর্তে পশ্চিমা শাসকরা যেসব প্রতিষ্ঠান ও কাঠামো চালু করেছে, সেগুলো পরিচালিত হয়েছে পশ্চিমা মডেলে, যদিও যেসব প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্টতা, নীতি-বিধান এবং গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠিতে এগুলোর সর্বোত্তম কার্যকারিতা নিশ্চিত হওয়ার কথা ছিল, সেগুলো রয়ে গেছে পুবের, অর্থাৎ স্থানীয়। অতএব এই দু’আঁশলা বা হাইব্রিড প্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে আমাদের ঐতিহ্যগত এবং চর্চাজাত স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিনষ্ট করেছে, অন্যদিকে স্থানীয়তার বিচারে উত্তীর্ণ কোনো পদ্ধতি দিতে পারেনি। সেসব দেওয়া এগুলোর উদ্দিষ্টও ছিল না।

আমাদের দুর্ভাগ্য, দুই দফা উপনিবেশী ও নব্য-উপনিবেশী শাসনের জাঁতাকল থেকে মুক্ত হয়েও আমরা তাদের প্রতিষ্ঠান ও কাঠামোগুলো অবিকল রেখে দিয়েছি, এদের সামান্যতম এবং অতিশয় প্রয়োজনীয় কোনো সংস্কার বা পরিবর্তন আমরা করিনি। এর ফলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়োজিত চাকরিজীবী তৈরিতে, আমাদের প্রশাসন ও পুলিশ জন-অবান্ধব, ব্যবসা-বাণিজ্য অসাধু, স্থানীয় সরকার নখদন্তহীন। এমনকি আমাদের বিচারব্যবস্থাও চোখ ঢেকে বিচারের তুলাদণ্ডে সব অভিযোগ-অপরাধের মীমাংসা করে না।
বাংলাদেশ স্বাধীন হলো ৫২ বছর আগে, কিন্তু এই এতগুলো বছর এসব অত্যাবশ্যক প্রতিষ্ঠানগুলোকে– যারা দেশটার শরীরে অক্সিজেন দিয়ে তাকে সতেজ রাখে– যুগের ও জনগণের দাবি মিটিয়ে খোলনলচে পাল্টানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলো না। বরং আমরা দেখলাম, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভব যার হাত ধরে হল, সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হলো। দেড় দশক ও পরে আরও দুই বছর সামরিক শাসন চলল। গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন হলো, কিন্তু নষ্ট হয়ে যাওয়া হাইব্রিড প্রতিষ্ঠান ও কাঠামোগুলোতে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখায় সেগুলো কোনো ফল দিতে পারল না।
বহু মত অবশ্যই, কিন্তু একটু অভিনিবেশ নিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, এই বহু মতের বর্ণির সম্মিলন সম্ভব নয়, এদের সম্মিলনে পথ সকলের জন্য রঙিন হওয়া তো দূরের কথা। এর মধ্যে একটি মত আবার মুক্তিযুদ্ধের নায়কদেরকেই অস্বীকার করে, প্রকারান্তরে একাত্তরকেই অস্বীকার করে এবং পাকিস্তানপন্থায় বিশ্বাস স্থাপন করে। আরেকটি মত একাত্তরের আদর্শে সমর্পিত, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেসব আদর্শ থেকে অনেক দূরে এর অনুসারীদের অবস্থান। বহুমতের সহ-অবস্থান যখন প্রশ্নবিদ্ধ, সংঘাত-সংঘর্ষ সেখানে স্বাভাবিক। যে মুহূর্তে এই লেখাটি লিখছি, দেশে বিরাজ করছে সমূহ সংঘাতের পরিবেশ। এই প্রথম এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বাইরের কিছু শক্তির সক্রিয়তা এবং নাক গলানো প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে। আমাদের জনগণ কী চায়, সে আলোচনা বাদ দিয়ে এই শক্তিগুলো কী চায়, তা-ই এখন মুখ্য হয়ে গেছে। গোলকায়ন, নব্য-উদারনীতি– পশ্চিমের এসব বাজারশাসিত এবং সামরিক-বৃহৎ শিল্প চক্রের নির্দেশিত নব্য-উপনিবেশী অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-শিক্ষাগত ব্যবস্থাপনা গত কুড়ি-পঁচিশ বছরে পশ্চিমের ওপর আমাদের নির্ভরতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের অর্থনীতি এখন বড় এক ঝুঁকির মুখে। পশ্চিমের কোনো কোনো শক্তি নাখোশ হলে এই ঝুঁকিগুলো বিপদে রূপ নেবে।
সামনে একটি জাতীয় নির্বাচন। এবং ও নির্বাচন নিয়ে অন্তহীন তর্কাতর্কি ও বাগ্যুদ্ধ চলছে, যা সত্যিকার সহিংসতা ও সংঘর্ষে পরিণত হতে পারে, সে রকম একটা আশঙ্কা রয়ে গেছে। রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের আরেকটি অপূর্ণতা– একটি গ্রহণযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য, উদযাপনযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা আমরা এখনও করতে পারিনি। না পারার একটি কারণ আমাদের প্রতিষ্ঠান ও কাঠামোগুলোকে তাদের উপনিবেশী চরিত্র থেকে মুক্ত করে একটি স্বাধীন সর্বভৌম রাষ্ট্রের উপযোগী করে তৈরি করার অনীহা।
অনেকেই ভেবে নিচ্ছেন, একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হলে (এবং সরকার পরিবর্তন হলে) সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। যদি দলগুলোর ভেতর একটা ঐকমত্য হয়, সুন্দর এবং গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন হয়, তাহলে সংঘাতের পরিবেশ ও রক্তক্ষয়ের শঙ্কা থেকে দেশ মুক্তি পায়। হয়তো তাতে পশ্চিমা শক্তিগুলোও খুশি হবে। কিন্তু তাতে যে শেষ পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক আচরণ, শুদ্ধাচার এবং জনবান্ধবতা প্রতিষ্ঠা হবে, তা তো নয়। নতুন একটি দলীয় সরকার যদি ক্ষমতায় আসে, অর্থনীতিতে খুব দ্রুত কোনো উন্নতি হবে না, দুর্নীতির গতি সাময়িকভাবে শ্লথ হলেও কয়েক মাসের মধ্যে তাতে ঊর্ধ্বগতি আসবে। পুলিশ-প্রশাসন জনগণের সেবা করার জন্যও আস্তিন গুটিয়ে কাজে নামবে না। কিছুদিনের মধ্যেই এখন যে অবস্থায় আমরা আছি সেই অবস্থাতেই ফেরত যাব। আর বর্তমান সরকার আরেকটি মেয়াদ পেলে স্থিতাবস্থা বা স্ট্যাটাসকো ই বজায় থাকবে।
কিন্তু এর মানে এ নয় যে, আমরা পরিবর্তনের চেষ্টা করব না। আমাদের উচিত হবে নির্বাচনটা যাতে গ্রহণযোগ্য হয়, স্বচ্ছ হয়, সকল দলের যাতে অংশগ্রহণ সেই নির্বাচনে হয়, তা নিশ্চিত করা। একটি নির্বাচন যদি এভাবে আমরা সকলে মিলে সংঘাতহীনভাবে করতে পারি, তাহলে অন্যান্য নানা ক্ষেত্রেও পরিবর্তন করতে পারব। সমকাল সেই সম্ভাবনা থেকেই হয়তো বিরোধালঙ্কারখচিত প্রতিপাদ্যটি বেছে নিয়েছে। বাহান্ন বছরে আমরা যদি এই সংকল্পে না পৌঁছাতে পারি যে, এ দেশে বহু মত থাকবে, পথও বর্ণিল হবে, তাহলে জাতি হিসেবে আমরা অপ্রাপ্তবয়স্ক থেকেই যাব। পথ বর্ণিল হওয়ার চারটি পূর্বশর্ত থাকতে হয়, হয়তো সেগুলোও পূরণ হবে।
যেমন, ক. আমাদের মতগুলো একে অপরের প্রতি, দেশের সংবিধান, ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে, কোনো উগ্রতা, বিদ্বেষ, সহিংসতা সেসব মতানুসারীদের থাকবে না, খ. রাষ্ট্রের সবগুলো কাঠামো-প্রতিষ্ঠানের যুগোপযোগী সংস্কার সাধনে তাদের অঙ্গীকার ও প্রয়াস এবং তার পেছনে সকলের অংশগ্রহণ, গ. সামাজিক ও শ্রেণিবৈষম্য দূর করা, মানবাধিকার, মুক্তচিন্তা এসবের প্রতি পূর্ণমাত্রায় প্রতীজ্ঞাবদ্ধতা এবং ঘ. প্রতিটি দলের ভেতর গণতন্ত্র ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং তৃণমূলের প্রতিনিধিত্ব। এসব যদি আমরা করতে পারি, আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই তৈরি করতে পারব এবং আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সত্যিকার বর্ণিল করতে পারব।
লেখক
শিক্ষাবিদ
কথাশিল্পী
