নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রতিবন্ধকতা
সালমা আলী
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৩ | ০২:২৬ | আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০২৩ | ০২:২৬
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ের মধ্যে নারীর ক্ষমতায়ন অন্যতম। নারী মুক্তি, নারী উন্নয়ন, নারীর প্রতি সহিংসতার ব্যাখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে নারীর ক্ষমতায়ন এ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ বা উল্লেখযোগ্য পদ্ধতি। নারী সমাজের উন্নয়নের উদ্দেশ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর তাত্ত্বিকদের দ্বারা ক্ষমতায়ন ধারণার উৎপত্তি, গবেষণা ও বিকাশ ঘটেছে।
আমাদের দেশে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং পারিবারিক প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈষম্য বিরাজমান। ফলে নারী মুক্তির আন্দোলনের ধারা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও নারীর সামগ্রিক কল্যাণ অর্জন সম্ভব হয়নি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নীতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন নারীর ক্ষমতায়ন। ব্যাখ্যার বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, প্রক্রিয়া পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে (সম্পদ, পছন্দ-সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে) নারী ও পুরুষের মধ্যকার বৈষম্য দূর করে নারীকে তাঁর সমকক্ষতায় প্রতিষ্ঠিত করা, নারীকে তার যোগ্য অধিকার ও মর্যাদার স্থানে সম্পৃক্ত করা নারীর ক্ষমতায়নের মূল সূত্র।
নারীর ক্ষমতায়ন বলতে তার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় শাসনতন্ত্রের সব তার পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নারীর অংশগ্রহণ ও তার অধিকারকে নিশ্চিত করা।
যে সমাজে মেয়েদের ক্ষমতায়ন যত বেশি, সেই সমাজ তত বেশি অগ্রসর হয়েছে। জাতিসংঘের মতে, ক্ষমতায়ন একটি গুচ্ছপ্রক্রিয়া; যা নারী কল্যাণ সমতা ও সম্পদ আহরণের সমান সুযোগ অর্জনের লক্ষ্যে জেন্ডার বৈষম্য অনুধাবন, চিহ্নিতকরণ ও বিলোপ সাধনের জন্য একজোট। ১৯৭৫ সালে মেক্সিকোতে নারী সম্মেলনে নারী অধিকার সংরক্ষণ নীতির মূল ভাষ্য ছিল নারীর ক্ষমতায়ন।
নারী মানবসমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানবীয় জীবনযাপন প্রণালির সাক্ষী। প্রাকৃতিক, জৈবিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ইতিবাচক রূপান্তর বা বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় নারী জড়িয়ে আছে আবহমান কাল থেকে। বাংলাদেশের সংবিধানে নারীর অধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধারা সন্নিবেশিত হয়েছে। ১৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জাতীয় জীবনে সর্বস্তরে নারীদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের ক্ষমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে। ২৭নং ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। ২৮(১), ২৮(২), ২৮(৩), ২৮(৪), ২৯(১) ও ২৯(২) ধারায় নারী-পুরুষ ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সমান অধিকারের বিধান রয়েছে। ৬৫(৩) ধারায় নারীর জন্য জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনে, স্থানীয় শাসনসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংরক্ষিত প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। ১৯৭৫-১৯৮৫ সালকে নারী দশক হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীকে অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগানোর জন্য National strategy for Accredited Poverty Reduction (NSAPR-11) এ বিভিন্ন কার্যক্রম সন্নিবেশ করা হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির ৭৬ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাতে নারী শ্রমিকের অবদান সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে নারী শ্রমশক্তির পরিমাণ প্রায় ২৫ বিলিয়ন।
ক্ষমতায়নের অন্তরায়
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে নারীর ক্ষমতায়ন সন্তোষজনক নয়। নারীর প্রতি সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষা ক্ষেত্রে অসহযোগিতা, অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও আইনি পদক্ষেপ, সংকীর্ণ চিন্তা-চেতনা ক্ষমতায়নের পথে অন্তরায়।
এখনও অনেক পরিবারে নারীকে তার মত প্রকাশের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা হয়। নারী নিজ পরিবারে কোনো না কোনোভাবে সহিংসতার শিকার হয়। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭ করা হলেও আশানুরূপ সুফল পাওয়া যায়নি। আজকের বিশ্বায়নের যুগে এসেও পরিবারে নারীরা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না বা তাদের সিদ্ধান্ত সমাজ বা পরিবারের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। শিক্ষিত হয়েও অনেক নারী চাকরি করার সুযোগ পায় না বা পরিবার থেকে করতে দেওয়া হয় না। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি থেকেও তারা অনেক সময় বঞ্চিত হয় বা নিজের অংশ ছেড়ে দিতে হয়। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) অনুযায়ী সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও গ্রামাঞ্চলে বহু নারী শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। শিক্ষার অভাবে তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারে না। ক্ষমতায়নের জন্য এটা একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ সমাজের চোখে স্বাভাবিকভাবে গৃহীত হয় না। শিক্ষা বা আত্মবিশ্বাস কম থাকায় নারীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। নারীর সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যাপক হারে নারীর রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তবেই তারা শুধু নারীদের উন্নয়ন নয়, দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে।
প্রখ্যাত নারীবাদী লেখিকা ইস্টার বোসেম্প তাঁর বিখ্যাত ‘উইমেন রোল ইন ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট’ গ্রন্থে নারীর অন্যতম শত্রু হিসেবে দরিদ্রতাকে চিহ্নিত করেছেন। আমাদের দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী শতকরা ৪০ ভাগ জনগোষ্ঠীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই নারী। পরিবারেও তার শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন হয় না। অর্থনৈতিক মানদণ্ডে এই শ্রমের কোনো মূল্য নেই। নারীকে অর্থনীতির মূলস্রোতধারায় যুক্ত না করলে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হবে। উন্নত বিশ্বে একটি কথা এখন বহুল প্রচলিত ‘Economy, if not engendered will be endangered’।
নারীর ক্ষমতায়নের জন্য নিজেদের সচেতন হতে হবে। নারী শিক্ষার হার বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য, প্রশিক্ষণ, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে রূপান্তর করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে তার সমান মজুরি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ অপরাধীদের শান্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, ভুক্তভোগী নারীদের মামলা পরিচালনায় প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তাসহ নারী নির্যাতনের মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ভিকটিমকেন্দ্রিক ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণের পাশাপাশি পুনর্বাসন প্রক্রিয়ারও যথোপযুক্ত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কর্মসূচিগুলোর আওতায় থাকতে হবে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনগুলোর সুষ্ঠু প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাপক আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব। আত্মনির্ভরশীল নারী তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা প্রয়োগ করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের দিকনির্দেশনাকে প্রভাবিত করতে পারবে। নিজেরাই নিজেদের চালিকাশক্তি হবে।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি
- বিষয় :
- বিশ্বায়ন
- সালমা আলী
- প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী-২০২৩
