ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

বিশ্বমারি মোকাবিলার প্রস্তুতি

বিশ্বমারি মোকাবিলার প্রস্তুতি
×

মুশতাক হোসেন

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৩ | ০৩:১১ | আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০২৩ | ০৩:১১

মাত্র কিছুদিন আগে কভিড-১৯ বিশ্বমারি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। আমরা তথা বিশ্ববাসী এ ধরনের বিশ্বমারি মোকাবিলায় যথাযথ প্রস্তুত ছিলাম না। ফলে দেশে দেশে করুণ দৃশ্য দেখতে হয়েছে। যদিও ২০০০ সাল থেকে বিশ্বের রোগতত্ত্ববিদরা ইনফ্লুয়েঞ্জা দ্বারা বিশ্বমারি সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে এসেছিলেন। সে অনুযায়ী বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে ইনফ্লুয়েঞ্জা নজরদারি শুরু করা হয়, ল্যাবরেটরিকে উন্নত করে ভাইরাসের আধুনিক পরীক্ষায় সক্ষম করে তোলা হয়।

২০০৯ সালে যখন বিশ্বজুড়ে প্যানডেমিক এইচ১এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জা (‘সোয়াইন ফ্লু’ নামে পরিচিত) ছড়িয়ে পড়ল এবং তা বছরখানেকের মধ্যে চলেও গেল– তখন মনে হলো শিগগিরই আবার বিশ্বমারি আসছে না। প্যানডেমিক এইচ১এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জা বিশ্বমারিতে ২০০৯-১০ সময়কালে কোটি কোটি মানুষ আক্রান্ত হলেও এর মৃত্যুহার মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জার চেয়ে বেশি ছিল না। তাই বিশ্বমারি নিয়ে উদ্বেগের পারদ অনেক নিচে নেমে গেল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাতেও এ জন্য বাজেট কমে গেল, দেশে দেশেও একই হাল হলো।

ঠিক এমনই এক ঢিলেঢালা মুহূর্তে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো হানা দিল কভিড-১৯ বিশ্বমারি। ইনফ্লুয়েঞ্জাকে কেন্দ্র করে যতটুকু প্রস্তুতি ছিল, ততটুকু দিয়েই বাংলাদেশসহ সারাবিশ্ব কভিড-১৯ মোকাবিলা করেছে। বিশ্বমারির সময় থেকেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরবর্তী বিশ্বমারি মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য এখনই ব্যবস্থা নিতে বিশ্বনেতাদের আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছেন। কারণ কভিড-১৯ বিশ্বমারি পার হলেই সব দেশ ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতির কথা ভুলে যাবে।

বিশ্বমারি প্রস্তুতির জন্য আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিধি ২০০৫ অনুযায়ী সব দেশকেই কতগুলো সক্ষমতা অর্জন করতে হয়। এগুলোকে মোটাদাগে এভাবে ভাগ করা যায়– প্রস্তুতি, প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ ও মোকাবিলা/ সাড়া দেওয়া। আরও সংক্ষেপে বলা যায় প্রস্তুতি ও মোকাবিলা। 

উল্লেখ্য, মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জার সঙ্গে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। ভয় হচ্ছে ইনফ্লুয়েঞ্জার নতুন কোনো ভাইরাসের উৎপত্তি নিয়ে। নতুন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস যদি মানবস্বাস্থ্যের জন্য তীব্র অসুস্থতা সৃষ্টি করে এবং তা দ্রুত মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হয়, তবে সেটাই হতে পারে ইনফ্লুয়েঞ্জার নতুন মহামারি ও বিশ্বমারি। এ জন্য সবসময় ইনফ্লুয়েঞ্জার গতি-প্রকৃতির ওপর নজরদারি প্রয়োজন।

২০০৯-১০ সালে নতুন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস এইচ১এন১ (‘সোয়াইন ফ্লু’ নামে খ্যাত) দ্বারা বিশ্বমারির পরে যেভাবে বিশ্বমারি প্রস্তুতিতে শৈথিল্য দেখায়, একইভাবে কভিড-১৯ বিশ্বমারি চলে যাওয়ার পরে একই রকম শৈথিল্যের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ রূপে শুরু হয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেনে যুদ্ধ। তীব্র মানবিক সংকট, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যয় গোটা বিশ্বে প্রভাব ফেলেছে। যুদ্ধে লিপ্ত পক্ষ-বিপক্ষ শক্তিগুলো সমরাস্ত্রে ব্যয় বাড়িয়েছে বহুগুণ। স্বাস্থ্য, খাদ্য ইত্যাদি খাতে অর্থের টানাটানি দেখা দিয়েছে বিশেষ করে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।

বিশ্বমারি প্রস্তুতির জন্য ন্যূনতম প্রয়োজন রোগ নজরদারি ব্যবস্থা, রোগ নির্ণয়ে সক্ষম ল্যাবরেটরি ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় সংখ্যায় স্বাস্থ্য পেশাজীবী। কিন্তু দেশব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সুবিধা না থাকলে এগুলো তো বিচ্ছিন্নভাবে থাকতে পারে না। বিশেষ করে শহর-গ্রাম নির্বিশেষে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেশের সব মানুষের জন্য সহজলভ্য ও নাগালের মধ্যে থাকতে হবে। যেখানে রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে, সেখানেই তো নতুন রোগ ধরা পড়বে। যেখানে সাধারণ রক্ত, মল-মূত্র পরীক্ষার ল্যাবরেটরি সুবিধা নেই, সেখানে নতুন রোগজীবাণু শনাক্ত করার অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি কীভাবে গড়ে উঠবে বা টিকে থাকবে? প্রচলিত স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনার জন্য যদি উপযুক্ত স্বাস্থ্য জনবল না থাকে তাহলে মহামারি বা বিশ্বমারি ঘটাতে সক্ষম এমন রোগ প্রতিরোধ-শনাক্ত-ব্যবস্থাপনার উপযুক্ত স্বাস্থ্য জনবল কীভাবে পাওয়া যাবে?

এ দিকটি বিবেচনায় রেখেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বমারি প্রস্তুতির পূর্বশর্ত হিসেবে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলেছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) স্বাক্ষরকারী পৃথিবীর সব দেশ (বাংলাদেশসহ) ২০৩০ সাল নাগাদ যার যার দেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি মানুষ মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা পাবে অর্থনৈতিক সামর্থ্য নির্বিশেষে। প্রথমত, ভৌগোলিক, আর্থসামাজিক অবস্থা নির্বিশেষে সব মানুষ। দ্বিতীয়ত, সব মানুষ একই রকম যথাযথ মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা পাবে। তৃতীয়ত, অর্থের অভাব যেন কোনো মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিতে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। বাংলাদেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আংশিক ব্যবস্থা রয়েছে মাত্র ৫১ শতাংশ। 

বিশ্বমারি প্রস্তুতির জন্য আরও প্রয়োজন সর্বদা প্রস্তুত একটি নেতৃত্ব কাঠামো– অনেকটা সামরিক বাহিনীর মতো। বিশ্বমারি/ মহামারি প্রতিদিন না ঘটলেও জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি প্রায়ই ঘটে থাকে। যেমন এখন সারাদেশে ডেঙ্গু মহামারি চলছে। শীতকালে প্রায়ই নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব ঘটে। রোগ প্রাদুর্ভাব হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকাতে হঠাৎ করে কোনো পুরোনো রোগের মাত্রা স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনায় তাৎপর্যপূর্ণভাবে বেড়ে যাওয়া। তবে অজানা কোনো নতুন রোগ বা দেশের ভেতর দেখা দেয়নি এমন কোনো রোগ যদি একটাও শনাক্ত হয়, তাকে রোগ প্রাদুর্ভাব বা আউটব্রেক বলা যাবে

আর এর বিস্তৃতি যদি অনেক মানুষের মধ্যে ঘটে ও অনেক বড় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, তবে সেটা হবে মহামারি বা এপিডেমিক। দেশ থেকে দেশে, মহাদেশ থেকে মহাদেশে তা ছড়িয়ে পড়লে তা হবে বিশ্বমারি বা প্যানডেমিক। আমাদের দেশে মহামারি বললেই হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুজনিত পরিস্থিতি বলে ধারণা করেন অনেকেই। এ জন্য কোনো বড় আকারের রোগ প্রাদুর্ভাবকে মহামারি বলে আখ্যায়িত করতে কর্তৃপক্ষের অনেকেই বিব্রত বোধ করেন। কারণ হিসেবে তারা বলেন, এতে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়বে এবং আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ঘটতে পারে। এ কথায় যুক্তি থাকলেও আমাদের এ বিষয়ে মানুষকে পর্যায়ক্রমে পরিচিত করাতে হবে। নতুবা পরিস্থিতির গুরুত্ব জনসাধারণ বা দেশের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক নেতৃত্বকে বোঝানো যাবে না। এ ধরনের অবস্থাই ঘটে চলেছে বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে।

রোগ প্রাদুর্ভাব তদন্ত ও মোকাবিলার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে আইইডিসিআর। তারা এ জন্য সারা বছর রোগ নজরদারিও করে থাকে। রোগ প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় আইইডিসিআর পরিচালক নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। এ জন্য আইইডিসিআর-এ একটি জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি পরিচালনা কেন্দ্র (পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার-পিএইচইওসি) রয়েছে। সেটা একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আইইডিসিআরের গোটা অফিস রোগ প্রাদুর্ভাব ব্যবস্থাপনা করে থাকে। কিন্তু পিএইচইওসিকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে এটাকে বিশেষায়িত করা দরকার। দেশব্যাপী মহামারি ঘটলে তা মোকাবিলার সরাসরি নেতৃত্ব দেবেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। তিনি পিইএচইওসির মাধ্যমেই সেটা করবেন। তখন আইইডিসিআরের পরিচালক তার সার্বক্ষণিক সংস্পর্শে থাকবেন। আর বিশ্বমারি ঘটলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সরাসরি নেতৃত্ব দেবেন, প্রশাসনিক দায়িত্ব পাবে সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। তখনও পিএইচইওসি বিশ্বমারি নিয়ন্ত্রণের কাজ করবে।

তখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআর একযোগে বিশ্বমারি মোকাবিলা ও নিয়ন্ত্রণের কাজ করবে। এ কাজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, আইইডিসিআরের পরিচালক, রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক একা করবেন না। প্রয়োজনীয়সংখ্যক কমিটি, উপকমিটি, সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে এ কাজটি করতে হবে। শুধু তাই নয়, কেন্দ্রের অনুরূপ জেলা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন, বিভিন্ন সেক্টরে কমিটি, উপকমিটি, সমন্বয় কমিটি করতে হবে। কভিড-১৯ বিশ্বমারির সময় মোটামুটি এ নীতি মেনে কাজ চললেও, ওই সময় নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ (কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল) ব্যবস্থাপনায় অনেক সমস্যাও ধরা পড়ে। সেগুলো এখন সমাধান করা দরকার।

বিশ্বমারি মোকাবিলায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে জনসাধারণকে ঝুঁকি সম্পর্কে জানানো ও জনগণকে বিশ্বমারি মোকাবিলায় সম্পৃক্ত করা (রিস্ক কমিউনিকেশন অ্যান্ড কমিউনিটি এনগেজমেন্ট)। কাজটি কভিড-১৯-এ হয়েছে। তবে তা হয়েছে শৌখিনভাবে, অপেশাদরিভাবে ও অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে। আরও বেশ কয়েকটি উপাদান রয়েছে বিশ্বমারি মোকাবিলা প্রস্তুতির জন্য। যেমন– আন্তঃমন্ত্রণালয় ও আন্তঃসেক্টর সমন্বয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, পিএইচইওসির অভ্যন্তরে ঘটনা ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি (ইনসিডেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম), জরুরি সময়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় সম্পদ-জনবল-সরঞ্জামাদি সংগ্রহের আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা, স্ট্যান্ডিং অর্ডার (যা জরুরি অবস্থায় সঙ্গে সঙ্গে সরকারের সব পর্যায়ে কার্যকর হবে), জনসম্পৃক্তির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা (জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নেতৃত্ব সমন্বয়ে), ‘এক স্বাস্থ্য’ দৃষ্টিভঙ্গি-কর্মপদ্ধতি, কাঠামো প্রভৃতি।

আজকের দিনে নতুন নতুন রোগের শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ প্রাণীদেহ থেকে মানুষে সংক্রমিত হচ্ছে। তাই প্রাণীর স্বাস্থ্য যদি সুরক্ষিত না থাকে, তাহলে মানুষের স্বাস্থ্যও সুরক্ষিত থাকবে না। আরেকদিকে পরিবেশ যদি মানবদেহের জন্য স্বাস্থ্যকর না হয়, তাহলে মানুষ-প্রাণী অসুস্থ হয়ে পড়বে। তাই বর্তমান বিশ্বে বিশ্বমারি প্রস্তুতির সঙ্গে মানুষ-প্রাণী-পরিবেশের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত হয়ে পড়েছে। একে বলা হয় ‘এক স্বাস্থ্য’ দৃষ্টিভঙ্গি। ‘এক স্বাস্থ্য’ হচ্ছে মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও বাস্তুতন্ত্রের (পরিবেশের) স্বাস্থ্যকে সর্বোত্তম পর্যায়ে টেকসই ও তাদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। এটা একটা সমন্বিত ও একত্রিত পন্থা। ‘এক স্বাস্থ্য’ স্বীকৃতি দেয় যে, মানুষ, গৃহপালিত ও বন্যপ্রাণী, সার্বিক পরিবেশ (বাস্তুতন্ত্রসহ) খুবই ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত এবং একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। এ পন্থা বহু সেক্টরকে, বিষয়কে ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের জনগোষ্ঠীকে সমাবিষ্ট করে। উদ্দেশ্য, সবাই ভালো থাকা এবং স্বাস্থ্য ও বাস্তুতন্ত্রের প্রতি হুমকি মোকাবিলা করা; একই সঙ্গে সবার প্রয়োজনীয় পরিষ্কার পানি, শক্তি (এনার্জি) ও বায়ু, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য জোগানের বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেওয়া; জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে কাজ করা এবং টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখা।

বাংলাদেশে ২০০৭ সাল থেকে ‘এক স্বাস্থ্য’ আন্দোলন শুরু হয়েছে। বিশ্বব্যাপী এটা শুরু হয়েছে ২০০৪ সালে। সরকারের তিনটি মন্ত্রণালয় (স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, বন পরিবেশ জলবায়ু পরিবর্তন) সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করেছে ‘এক স্বাস্থ্য’ সচিবালয় স্থাপন করে। ২০১৬ সালে আইইডিসিআর-এ সচিবালয়টি কাজ শুরু করে। প্রাণীবাহিত রোগগুলোর যৌথ নজরদারি, রোগ প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা ইত্যাদি কাজের সমন্বয় সাধন করে এ সচিবালয়।

ইনফ্লুয়েঞ্জা, জলাতঙ্ক (র‌্যাবিস), অ্যানথ্রাক্স, নিপাহ, জাপানিজ এসকেফোলাইটিস, কভিড-১৯ প্রভৃতি প্রাণীবাহিত রোগ প্রতিরোধ-নজরদারি-শনাক্ত-প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা কার্যক্রম ‘এক স্বাস্থ্য’ সচিবালয় সমন্বয় সাধন করে। এ ছাড়া অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (জীবাণুবিরোধী ওষুধের প্রতিরোধ) একটি ‘এক স্বাস্থ্যে’র সমস্যা। গৃহপালিত বা খামারের মুরগি বা গবাদি প্রাণীকে যদি অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হয় এবং সে কারণে যদি সেগুলোর মধ্যে ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণু তৈরি হয়– খাদ্যের মাধ্যমে তা মানবদেহে সংক্রমিত হবে। অনুরূপভাবে গবাদি প্রাণীতে যদি অ্যানথ্রাক্স (তড়কা) রোগ দেখা দেয় এবং মানুষ যদি সে প্রাণীকে স্পর্শ করে, জবাই করে কাঁচা মাংস স্পর্শ করে, তবে তার চামড়ায় অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ ঘটতে পারে। বাদুড় যদি খেজুরের কাঁচা রসের হাঁড়িতে মুখ দেয় বা প্রস্রাব করে, তবে সে কাঁচা রস নিপাহ ভাইরাস দ্বারা দূষিত হতে পারে। সে রস মানুষ পান করলে নিপাহ ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কুকুর যদি জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষকে কামড়ায় তাহলে মানুষও জলাতঙ্কে আক্রান্ত হচ্ছে।

বিশ্বমারি প্রস্তুতির কাজটি আমাদের প্রতিনিয়ত করতে হবে। প্রায় প্রতি মাসে মানুষ, প্রাণী (গৃহপালিত ও বন্য) ও পরিবেশে রোগ প্রাদুর্ভাব ঘটছে, তৈরি হচ্ছে জনস্বাস্থ্য, প্রাণী জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশে জরুরি পরিস্থিতি। তা একক ও সমন্বিত মোকাবিলার মধ্য দিয়েই আমরা বিশ্বমারি মোকাবিলায় আরও সক্ষম ও কার্যকর হয়ে উঠব। প্রয়োজন এ বিষয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া। এটা যেমন বাংলাদেশের জন্য সত্য, গোটা বিশ্বের নেতৃত্বের জন্যও সত্য। 

লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আইইডিসিআর

আরও পড়ুন

×