ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিদেশি পত্রপত্রিকায় গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণ

বিদেশি পত্রপত্রিকায় গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণ
×

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ০৮:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

দ্য টাইমস

মার্চ ৩০, ১৯৭১

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের পুড়ে যাওয়া লাশ এখনও তাদের হলের বিছানার ওপর পড়ে আছে। এক বিশাল গণকবর খুব দ্রুতই ভর্তি করা হয়েছে …)
(মিশেল লরেন্ট, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের একজন ফটোগ্রাফারের বরাতে, তিনি পাকিস্তান আর্মিদের লুকিয়ে ঢাকায় চলাচল করেছিলেন)
ঢাকা, মার্চের ২৯ তারিখ। প্রায় দুইদিন ধরে উপর্যুপরি গোলাবর্ষণে শুধু ঢাকা শহরেই মারা যায় সাত হাজারের বেশি মানুষ। বৃহস্পতিবার রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমেরিকার সরবরাহকৃত M24 ট্যাঙ্ক, মেশিনগান ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে শহরের প্রায় বেশির ভাগ অংশে ধ্বংসলীলা চালায়।
এই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল বিশ্ববিদ্যালয়, শহরের পুরোনো অংশে যেখানে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের তুমুল জনপ্রিয়তা ছিল এবং শহরের উপকণ্ঠে শিল্পাঞ্চলে, যেখানে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের আবাস ছিল।
শনি ও রবিবার জ্বলন্ত শহরে ঘুরে দেখা গেল, বিনা নোটিশে শহর দখল করে নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে পুড়ে যাওয়া লাশগুলো তখনও বিছানার ওপর পড়ে ছিল। হলগুলোতে সরাসরি ট্যাঙ্ক ব্যবহার করা হয়। খুব দ্রুতই জগন্নাথ হলের সামনে একটি গণকবর ঢেকে দেওয়া হয়। ইকবাল হলে প্রায় ২শর মতো মারা গিয়েছে বলে জানা যায়। প্রায় ২০টার মতো লাশ তখনও মাঠে ও হলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, সৈন্যরা ঢাকা মেডিকেল কলেজে বাজুকা নিক্ষেপ করেছিল। যদিও হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা জানা যায়নি।
এত কিছুর পরও পশ্চিম পাকিস্তান প্রশাসন থেকে বলা হয়, ঢাকা শহরের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়ে আসছে। যদিও হাজারো মানুষ ন্যূনতম জিনিসপত্র নিয়ে শহর ছাড়ছিল। কেউ কেউ ঠেলাগাড়ি নিয়ে যাচ্ছিল। সেগুলো ছিল খাদ্য আর বস্ত্রসামগ্রীতে পরিপূর্ণ। সামরিক সরকারের আদেশে খুব অল্প সংখ্যক মানুষই সরকারি চাকরিতে ফেরত আসে।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ছিল ন্যূনতম। পাকিস্তানিরা মিলিটারি অর্ডারে অস্ত্র জমা দিয়ে দিয়েছিল।
আবারও বেশির ভাগ সরকারি অফিসগুলোতে পাকিস্তানের পতাকা উড়তে দেখা গেল। যদিও মাত্র ১০ দিন আগেও সেখানে হলুদ ও সবুজে রাঙা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা শোভা পেত।
পুরান ঢাকার বেশির ভাগ অংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তবুও বয়স্ক পুরুষ এবং মহিলারা তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত জিনিসপত্রের মাঝে খোঁজাখুঁজি করছিলেন।
ফাঁকা সড়কগুলোতে সেনারা অস্ত্রে সজ্জিত সাঁজোয়া গাড়িসহ টহল দিত। লোকজন ওপেন ফায়ার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গাড়িতে পাকিস্তানের পতকা টানিয়ে রাখত। যত্রতত্র লাশ পড়ে থাকতে দেখা গেল, যারা কিনা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্রসফায়ারে পড়ে মারা যায়। রেলস্টেশনের পাশের বস্তি পুড়িয়ে দেওয়া হলো। লোকজন এখন হতবিহ্বল।
বিদেশি সাংবাদিকদের চলাফেরার ক্ষেত্রে সরকার হার্ডলাইনে চলে গেল। যাতে করে তাদের কর্মকাণ্ড বিশ্ব দরবারে উঠে না আসে।
প্রায় ৩৫ জনের মতো বিদেশি সাংবাদিককে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। শুধু আমি এবং একজন ব্রিটিশ সাংবাদিক সেনা বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হই। পরবর্তী সময় সেনারা এয়ারপোর্টে আমাকে তল্লাশি করে ছবি ও রিপোর্ট জব্দ করে।
পরবর্তী সময় করাচি বিমানবন্দরে পুলিশ আমাকে আবার তল্লাশি করে এবং বাকি ছবিগুলোও জব্দ করে।
 

দ্য নিউ নেশন

সিঙ্গাপুর, ৬ এপ্রিল, ১৯৭১

সম্পাদকীয়
–পূর্ব পাকিস্তানে চলমান এই হত্যাযজ্ঞ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে–

বিদেশি নাগরিকদের থেকে প্রাপ্ত কিছু চাক্ষুষ তথ্যপ্রমাণ পূর্ব পাকিস্তানের ওপর ঘটে যাওয়া কিছু নৃশংস দৃশপট উন্মুক্ত করে, যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইয়াহিয়া খান তার সেনাবাহিনী কর্তৃক ঘটিয়েছিলেন।
যা ঘটছিল, তা মূলত গণহত্যার সমতুল্য। পাকিস্তানি আর্মি অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় ও শোচনীয় হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে একটি বিদ্রোহ দমন করতে চাইছিল, যা পরবর্তী সময় লাগামহীন হয়ে পড়ে।
এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আচরণ থেকে এটা স্পষ্ট হয়, তাদের যে কোনো কিছু দমনের জন্য আইনসিদ্ধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। নির্দিষ্ট পরিকল্পনামাফিক শিশু, মহিলাসহ অন্যান্য নাগরিকদের ইচ্ছামতো হত্যা করারও অনুমতি দেওয়া হয়, যাতে জনমনে পূর্ণ ত্রাসের সৃষ্টি করা যায়।
তবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পুরোপুরি সফল ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরোধ যদিও বিশৃঙ্খল ও লক্ষ্যহীন ছিল, তথাপি তা প্রতিনিয়ত অদম্য ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছিল। বড় শহরগুলোর বাইরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর শাসন চলছিল না।
পূর্ব পাকিস্তানের সহজাত যাতায়াতের সমস্যার কারনে ৭০ হাজার পাকিস্তানি সেনা সদস্যের জনবল অপ্রতুল ছিল। মোট জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আর্মির সংখ্যা আরও কয়েক গুণ করা দরকার ছিল। এবং আজ থেকে ছয় সপ্তাহ পরে, বর্ষা ঋতুর আগমনের সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীর অগ্রগতি যে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে, তা বলাই বাহুল্য।
অফিসিয়ালভাবে পাকিস্তানি সেনারা এটা আর লুকাতে পারছিল না যে, তারা যেই স্বভাবিক অবস্থার কথা বলছে, তা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। তাছাড়া শিল্পকারখানাগুলোতে অচলাবস্থা বিরাজ করছে এবং প্রচুর পরিমাণে সরকারি কর্মকর্তা কাজ থেকে বিরত আছেন।
যদি না প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া দ্রুতই তার সেনাবাহিনী অপসারণ করেন, তাহলে বিশ্ববাসী এটাকে আর পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিতে পারেন না।
পূর্ব পাকিস্তানে ঘটতে থাকা গণহত্যা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। ইতোমধ্যে ভারত, রাশিয়া ও ব্রিটেন রাওয়ালপিন্ডির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। সার্বভৌমত্বের দোহাই দিয়ে আর মানবতা হত্যা করা যাবে না মর্মে আরও দেশকে একত্রিত হয়ে আওয়াজ তোলা উচিত। 
l বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র  অষ্টম খণ্ড থেকে 

আরও পড়ুন

×