সাক্ষাৎকার
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা না গেলে স্বাধীনতার সুফল মেলে না
আবুল কাসেম ফজলুল হক
আবুল কাসেম ফজলুল হক
প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৪ | ২৩:৫২ | আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ২০:১০
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক দেশের প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক, লেখক, গবেষক, ইতিহাসবিদ, অনুবাদক, সমাজবিশ্লেষক, সাহিত্য সমালোচক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা শেষে অবসর নিয়েছেন। তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক। প্রবীণ এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবারের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন দেশ ও সমকালীন রাজনীতি নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি সাব্বির নেওয়াজ
সমকাল: যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জাতীয় জীবনে যে আকাঙ্ক্ষার জন্ম হয়েছিল, তার অনেকখানিই পূরণ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন আমাদের অর্জিত হয়েছে। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৬-দফা আন্দোলন– এগুলোর উদ্দেশ্যের সবটুকুই প্রায় পূরণ হয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত যেটা সফল হয়নি, তা হলো দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। গণতন্ত্র কিংবা সমাজতন্ত্র বা বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার যে চেষ্টা, সেখানে কোনো উন্নতি হয়নি, বরং অবনতি হয়েছে।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা না গেলে স্বাধীনতার সুফল পুরোপুরি মেলে না। স্বাধীনতার সুফল তখনই সম্পূর্ণ উপভোগ করা যায়, যখন গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া সম্ভব হয়।
সমকাল: গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে ব্যর্থতার কথা বলছেন, এর পেছনে কারণ কী? কেন আমরা তা পারলাম না এত দীর্ঘ সময়েও?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়ার পরও জাতীয়তাবাদী চিন্তার দরকার ছিল। গোটা জনসাধারণের মধ্যে ঐক্যের দরকার ছিল। সবাই সমান নয়। তবে এই বিভিন্নতা নিয়েও নিজেদের স্বার্থে কিছু কাজ হওয়া দরকার ছিল। সেটিই হচ্ছে জাতীয় চেতনা। তবে এই পথে আমাদের উন্নতি খুব কমই হয়েছে। কারণ, আমরা দেখি প্রতিবার জাতীয় নির্বাচনের সময় বিদেশি শক্তি এখানে আসে। তারা যেভাবে আদেশ-নির্দেশ ও পরামর্শ দেয়, এর সবটাই আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পরিপন্থি। এ রকম আরও কিছু বিষয় আছে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এলো; খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হলেন। তখন দেখলাম, নতুন সরকার আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্র সে সরকারকে কোনো রকম গ্রাহ্য না করে কথা বলছে; আদেশ-নির্দেশ দিচ্ছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন রাষ্ট্র কথা বলছে। এগুলো আমাদের স্বার্থের পরিপন্থি। এই দিক লক্ষ্য করে বলা যেতে পারে, আমাদের জাতীয়তাবোধ বাস্তবায়িত হওয়ার দিকে না গিয়ে উল্টোদিকে গেছে। ব্রিটিশ শাসনের শেষদিকে যে দাবি-দাওয়া এ অঞ্চলের মানুষের ছিল, সেগুলো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর খুব সামান্য এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর অনেকাংশে বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্রের দিকে কোনো উন্নতি হয়নি।
আর একটা বিষয় হলো, জাতীয় ঐক্য কেবল হলেই হয় না, সেটি রক্ষা করে চলতে হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ’৭১ সালে যে ঐক্য হয়েছিল, তাঁর শাসনকালে জনসাধারণ সেভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকেনি। নানা ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন চেতনা বাস্তবায়িত না হয়ে বিশৃঙ্খলায় পড়ে গেছে। পরবর্তী সময়ে যারা ক্ষমতায় এলেন তারা রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার চেষ্টা করেছেন বটে, কিন্তু মানুষের যে মূল রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা, তা বিনষ্ট হয়েছে। নতুন বাংলাদেশে নতুন বাস্তবতায় যে নতুন নতুন কর্মসূচি দরকার, এটা কোনো রাজনৈতিক দলই নিয়ে আসেনি। এই জায়গাতেই আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
সমকাল: মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা ছিল সাম্য প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্য দূর করা। জাতীয় জীবনে আরও যেসব সব স্বপ্ন ছিল, তা পূরণ না হওয়ার পেছনে আমাদের প্রতিবন্ধকতাগুলো কী কী?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: অল্প সময়ের মধ্যে বৈষম্য সম্পূর্ণভাবে দূর করা যাবে না। কিছু লোক অবশ্যই থাকবে, যারা বৈষম্য কমাতে চাইবে না। এক সময় এখানে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা জাগরণ ছিল; মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু সম্পদের সুষম বণ্টন করতে পারেননি। একটা বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে সময়টা গেছে। আমাদের জাতির জীবনের সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হলো বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী এই মর্মান্তিক অবস্থা আমাদের জাতির জীবনে একটা দুর্বলতা তৈরি করে। জাতির মধ্যে শৃঙ্খলা রক্ষা ও উন্নত রাজনৈতিক নীতি নিয়ে শিক্ষিত লোকদের বা অপেক্ষাকৃত সচ্ছল অবস্থার লোকদের যে চেষ্টা করার দরকার ছিল, যে ন্যায়নীতিবোধ অবলম্বন করার কথা ছিল, সেটা না করে কী করে তাড়াতাড়ি ধনী হওয়া যায়, তারা সেই চেষ্টা করেছেন। যারা যখন মন্ত্রী হয়েছেন, নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়ে নেতৃত্ব নিয়েছেন, তারা চেয়েছেন নিজেদের বিষয়-সম্পত্তি আরও বাড়িয়ে নিতে। তারা ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে নিয়েছেন। ধনী-দরিদ্রের বিরাট যে বৈষম্য দেশে সৃষ্টি হচ্ছে, সেটা আইনের দ্বারা পর্যায়ক্রমে আরও কমানো দরকার ছিল। কিন্তু এই চিন্তা করেননি কেউ। রাজনীতিবিদদের মধ্যে যদি শুধু স্বার্থপরতা থাকে এবং পরার্থপরতা না থাকে তাহলে রাজনীতি ভালোর দিকে যায় না বরং পতনে চলে যায়। তখন কেউ কেউ রাজনীতির বাইরে গিয়েও রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান খোঁজেন, যা চরম ভুল।
সমকাল: সেটা কেমন?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: আশির দশক থেকেই ডি-পলিটিসাইজেশন প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে বাংলাদেশে। এটিকেই বাংলায় কেউ বলছেন, নিরাজনীতিকীকরণ বা বিরাজনীতিকীকরণ। এই দুটো একই অর্থ বহন করে। অর্থাৎ নাই। এই যে রাজনীতিশূন্য করে ফেলার চেষ্টা, এটা এক বড় ঘটনা।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, কে করছে এই চেষ্টা? আওয়ামী লীগ বলতে পারে, বিএনপি কিংবা বিএনপি বলতে পারে আওয়ামী লীগ। কিন্তু এভাবে বলা ঠিক হবে না। যারা ডি-পলিটিসাইজেশনের কাজ করেছেন তার নিজেদের গোপন রেখে কাজ করছেন। তবে এটা রাজনীতিবিদদের বোঝার কথা। এই যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আনা। যদি রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের সমস্যা একেবারেই সমাধান করতে না পারেন; একটি নির্বাচনের জন্য বিদেশি শক্তির পরামর্শ নেওয়া হয়; তাদের টেনে আনার কাজটি এক সময় আওয়ামী লীগ করেছে, বিএনপিও করেছে। আওয়ামী লীগের কিছু নেতা অপজিশনে থাকাকালে আমেরিকার দূতাবাসে গিয়ে, ভারতের দূতাবাসে গিয়ে তদবির করেছেন বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সাহায্য চেয়ে। একই কাজ এখন বিএনপি করছে। কিন্তু বিদেশি শক্তির কাছে সহায়তা চেয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না। জনগণের মাঝে গণতন্ত্রের চিন্তা-চেতনা ধ্যান-ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গণতন্ত্র হঠাৎ হয়ে যাওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা একটা সংগ্রামের বিষয়, চর্চার বিষয়।
সমকাল: রাজনীতিতে বিদেশি শক্তির প্রভাব নিয়ে আপনি প্রায়ই বলছেন, লিখছেন। তাদের প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার পথ কী?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: এ প্রভাব তৈরির মূল কারণ ক্ষমতার রাজনীতি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে বিএনপি তাকে টেনে নামাতে চায়। বিএনপি থাকলে আওয়ামী লীগ তা চায়। এই ক্ষমতার রাজনীতি করতে গিয়েই উভয় পক্ষ বিদেশি শক্তিকে এদেশে প্রভাব খাটানোর সুযোগ করে দেয়। আমি মনে করি, সংসদ নির্বাচন আমাদের জাতীয় শক্তির ভিত্তিতে হওয়া উচিত। বিদেশি শক্তি এখানে এসে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করে দেবে– সেটি আশা করার কোনো কারণ নেই। দেশে এখন যে রাজনীতি চলছে, তা অস্বাভাবিক। গণতন্ত্রের কথা সবাই জোর দিয়ে বলছেন। কিন্তু গণতন্ত্রের চিন্তাভাবনা নেই। বাংলাদেশে যে সময়টি আমরা পার করছি, এ সময়ে শ্রদ্ধাযোগ্য মানুষের খুব ঘাটতি আছে। নানা রকম দলাদলি, স্বার্থের সংঘাত– এগুলোর মধ্যে কোনো মানুষকে সম্মানজনক অবস্থায় রাখার মতো বুদ্ধিজীবী কমিউনিটি কিংবা পলিটিক্যাল কমিউনিটি আমাদের নেই। কীভাবে এ পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটবে– তাও জানা নেই। এটি এক জটিল সমস্যা। একদিনে এ সমস্যা সৃষ্টি হয়নি। যে রাজনৈতিক দল যত বড়, তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও তত বেশি। বিদ্যমান রাজনীতি দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। নতুন রাজনীতি লাগবে। সেই নতুন রাজনীতি আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি দিয়ে হবে না। এখন শুধু ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতায় গিয়ে টিকে থাকার রাজনীতি হচ্ছে। দেশের সাধারণ মানুষ কী চায়, তার প্রতিফলন রাজনৈতিক নীতি, এজেন্ডা ও কর্মসূচিতে কোথায়?

সমকাল: মুক্তিযুদ্ধের ৫৩ বছর অতিক্রমকালে বাংলাদেশকে কেমন দেখছেন?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: দেশকে এগিয়ে নিতে হলে রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। ৫৩ বছর পার করে ফেলেছি; এখন এই জাতি ও রাষ্ট্রকে কীভাবে সৃষ্টিশীল ও সুসংহতরূপে গড়ে তোলা যায়, সে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রচলিত যে রাজনীতি; আওয়ামী লীগ-বিএনপি যে ধারায় চলছে, এ ধারায় তা হবে না। গুরুত্ব দিতে হবে জনগণের চাওয়া অনুযায়ী দল গঠনে। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ মুহূর্তে সুস্থ রাজনীতির জন্য। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জার্মানিসহ বিশ্বমোড়লরা আমাদের এখানে দল গঠনে আমাদের মনোযোগী করতে চায় না। তারা আমাদের শুধু নির্বাচনমুখী করে ক্ষমতা দখলের লড়াই শেখাতে চায়। অথচ শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন হলেই গণতন্ত্র হয় না।
গণতন্ত্রের সংজ্ঞা যেসব রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, দার্শনিক ও মনীষী দিয়েছেন, তারা কেউই এ কথা বলেননি। এখানেই দুর্বলতা আমাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে। আমি বলতে চাই, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো যদি জনগণের ওপরে আস্থা রেখে, জনগণকে ভরসা করে নির্বাচন করতে পারত, তবে আমরা প্রকৃত গণতন্ত্র পেতাম। দেশ এগিয়ে যেত।
ভোটের মাধ্যমেই সরকার গঠন করতে হবে। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি, কর্মপরিকল্পনা জনগণকে বলতে হবে। তারা রাষ্ট্রের সমস্যাগুলো কীভাবে সমাধান করতে চায়, তা জানাতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, দীর্ঘদিন ধরে যে তিনটি দল দেশ শাসন করে আসছে, তাদের সামনে জনগণকে আকৃষ্ট করার মতো কোনো কর্মসূচি নেই। জাতীয় স্বার্থ ও জনজীবনের সমস্যা নিয়ে তারা ভূমিকা রাখতে পারছে না। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি– তিন দলই জনগণের কাছে নতুন চিন্তা, নতুন কর্মসূচি দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
সমকাল: সুশাসন, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনে বাংলাদেশ কোথায় অবস্থান করছে বলে আপনি মনে করেন?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সুশাসন, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা কোনো জাতি-রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্ববহ। কোনো দেশ নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারলে শক্তি থাকে না। আমরা পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ বহু কিছুই করেছি। কিন্তু সেগুলো বিপুল ঋণ নিয়ে করা হয়েছে। যারা ঋণ দেয়, তারা আসলের জন্য চাপ না দিলেও সুদ নেয়। এভাবে সুদ নিয়ে তাদের অর্থ উদ্ধার হয়ে যায়। কিন্তু আসল ঋণ বহাল থাকায় তারা আমাদের নানা শর্ত দেয়। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে যাওয়ার অর্থই হলো অর্থনৈতিকভাবে বিপদে পড়ে যাওয়া। এভাবে স্বাবলম্বী হওয়া দুষ্কর।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বড় শক্তিগুলো যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন কোনো দুর্বল রাষ্ট্রের অবস্থা ভালো হোক– এটা চায় না। বিশ্বব্যাংক ঋণ দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্র এর অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করে। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি– এসব দেশ বাইরে ভালো ভালো কথা বলে; কিন্তু ভেতর থেকে কোনো দুর্বল জাতি বা রাষ্ট্র স্বাভাবিকভাবে রাজনীতির মধ্য দিয়ে শক্তি অর্জন করবে, তা চায় না। এ জন্য একটু সাহসিকতার সঙ্গে ধীর পায়ে এগিয়ে চলতে হয়। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সে রকম নেতৃত্ব আমাদের এখানে হতে পারেনি।
সুশাসন আমলাতন্ত্র দিয়ে হবে না। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নিতে হবে। সুশাসনের জন্য প্রয়োজন দুর্নীতি কমানো। আর দুর্নীতি হ্রাস করতে গেলে প্রয়োজন নতুন বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, উৎপাদন বাড়ানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি। বৈষম্য কমিয়ে সম্মানজনক জীবিকা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা আসবে। এ জন্য জনগণকে সহায়তা দিতে হবে সরকারকে; যারাই সরকারে থাকুক।
বাস্তবে আমরা দেখি, অনেক মানুষ এদেশে পেটের দায়ে উৎপাদনের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে। আর কিছু মানুষ খুব ধনী হওয়ার জন্যও চেষ্টা করে। এতে অর্থনীতিতে এক রকম উন্নতি হয়, কিন্তু তার ফল চলে যায় ধনিক শ্রেণির হাতে। বৃহত্তর মধ্যবিত্ত শ্রেণি এই সুযোগ নিতে পারে না। নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষও তা নিতে পারে না। এ রকম একটা বাস্তবতার মধ্যে আমরা আছি।
- বিষয় :
- গণতন্ত্র
- আবুল কাসেম ফজলুল হক