ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকার

বঞ্চনা- বৈষম্যের দুই দশকে ছিল মুক্তিযুদ্ধের বীজ

বঞ্চনা- বৈষম্যের দুই দশকে ছিল মুক্তিযুদ্ধের বীজ
×

সুলতানা কামাল

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৫ | আপডেট: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:৫১

| প্রিন্ট সংস্করণ

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পাকিস্তানি শাসকদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক বঞ্চনা, বৈষম্য ও নির্যাতনের ফল ছিল এটি। মুক্তিযোদ্ধা ও মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল ব্যাখ্যা করেন, ভাষা আন্দোলনই ছিল আমাদের সব বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেরণা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে ইতিহাসে অধিষ্ঠিত থাকবেন।  সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাহেরীন আরাফাত

সমকাল: কোন প্রেক্ষাপটে পূর্ব বাংলার মানুষ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়? এ ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে?

সুলতানা কামাল: পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপটের বর্ণনা এক কথায় তুলে ধরা দুঃসাধ্য। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম এবং চূড়ান্ত অধ্যায়। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি জনসংখ্যার প্রায় প্রতিটি মানুষ, যাদের অধিকাংশই ছিলেন নিরস্ত্র, দেশের মাটিকে শত্রুমুক্ত করার জন্য হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন ২৫ মার্চের গণহত্যার প্রত্যুত্তরে। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে হানাদার বাহিনী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তখনই বাংলার মানুষ সম্মুখ সমরের সিদ্ধান্ত নেয়। তার আগে পর্যন্ত এ দেশের মানুষ নানাভাবে গণতান্ত্রিক উপায়ে ’৭০-এর নির্বাচনের গণরায় অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য আন্দোলন করে আসছিল। প্রকৃতপক্ষে সেই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে পঞ্চাশ, ষাট এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানসহ সব আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তানি শাসকদের এ দেশের প্রতি বৈষম্য ও‌ নির্যাতনমূলক আচরণের প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল। এই দীর্ঘ সময় ধরে এ দেশের মানুষের এই উপলব্ধিতে পৌঁছাতে বাকি ছিল না যে পাকিস্তানের অংশ হয়ে একসঙ্গে থাকা আর সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানি শাসকদের দ্বারা বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক– সকল প্রকার বঞ্চনা, বৈষম্য, নির্যাতন ও অবমাননার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেই অর্থে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে এ দেশের মানুষের সম্মুখ সমরের প্রেক্ষাপট দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত। 

সমকাল: সাংস্কৃতিক ভিন্নতা বা ভৌগোলিক দূরত্ব নিয়েও কোনো দেশ একত্র হয়ে টিকে থাকতে পারে। বিশ্বে এমন উদাহরণ আছে। কিন্তু পাকিস্তানে তা সম্ভব হয়নি। এর মূল কারণ কী?

সুলতানা কামাল: সাংস্কৃতিক ভিন্নতা বা ভৌগোলিক দূরত্ব সত্ত্বেও কোনো কোনো দেশ একত্রে টিকে থাকতে অবশ্যই পারে যদি সে দেশের রাষ্ট্রীয় নীতিতে এবং জনগণের প্রাত্যহিক জীবনে সত্যিকার অর্থে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন এবং পরিচালনার যে ‘সামাজিক চুক্তি’, তার শর্তগুলো নিয়মমতো পালিত ও চর্চিত হয়। সমাজবিজ্ঞান বলে, জনগণ রাষ্ট্র গঠন করে নিজেরা যেন সম্মানিত নাগরিক হিসেবে তাদের প্রাপ্য অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে জীবন যাপন করতে পারে। তাদের দৈনন্দিন জীবনে যেন স্বাধীনতা, শান্তি ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা বিরাজ করে। কোনো ভিন্নতা, কোনো পরিচয় বা কে কোথায় জন্মেছে বা বাস করে– সে জন্য তাকে কোনো রকম বৈষম্যের শিকার না হতে হয় অথবা সেসব কারণে শঙ্কা বা অভাবের মধ্যে জীবন কাটাতে না হয়। এর ব্যত্যয় ঘটলে বা বিশেষ গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারের দাপটে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর একসঙ্গে টিকে থাকা সম্ভব হয় না। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে একসঙ্গে টিকে থাকার সব শর্তই পদদলিত হয়েছিল– এমনকি এক অংশের সেনাবাহিনী দ্বারা অন্য অংশের জনগণের ওপর গণহত্যা পর্যন্ত চালানো হয়েছে। এ দেশের মানুষের প্রায় সব গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও অধিকার বোধকে কখনও খোলাখুলি, কখনও প্রচ্ছন্নভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। চরম দমননীতি চালানো হয়েছে, এর প্রকটতম দৃষ্টান্ত একাত্তরের গণহত্যা। তাই এক সময়ে এ দেশেরই অনেকের আকাঙ্ক্ষিত পাকিস্তানের দুই অংশের এক দেশ হয়ে টিকে থাকা আর সম্ভব হয়নি। 

সমকাল: ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের পারস্পরিক সম্পর্ক জানতে চাই।

সুলতানা কামাল: ভাষা আন্দোলনের সূচনাও ঘটে এ দেশের মানুষের বঞ্চনার বোধ থেকে। পাকিস্তান প্রকৃতপক্ষে একটি বহুজাতিক, বহু সংস্কৃতি, ধর্ম ও ভাষার দেশ ছিল। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকেরা সেই বৈচিত্র্য আমলে‌ না নিয়ে দেশটিকে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর দখলে রাখার নীতি গ্রহণ করেছিল। এ অঞ্চলে তার প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রভাষা‌ সংক্রান্ত ঘোষণায়, যে ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। এই ঘোষণা ছিল স্পষ্টতই পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষার অস্তিত্বের অস্বীকৃতি। এ দেশের মানুষ সেটা মেনে নিতে পারেনি। এর বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ গড়ে উঠেছিল তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ঘটে বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখে ছাত্রদের প্রতিবাদ মিছিলের মধ্য দিয়ে। আমরা সবাই জানি, সেদিন সেই মিছিলের ওপর গুলিবর্ষণে বরকত, রফিক, সালাম, জব্বারসহ কয়েকজন নিহত হন। সেই থেকে ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ আমরা পালন করে আসছি ‘অমর একুশে’, ‘শহীদ দিবস’ বা ‘ভাষা দিবস’ হিসেবে। তবে এসব নামকরণ ছাপিয়ে ভাষা আন্দোলনকে আমাদের সব বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের মূল প্রেরণা হিসেবে আমরা ধারণ করে আসছি। আমরা মনে করি, ভাষা আন্দোলনের ভেতরে উপ্ত ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বীজ।

সমকাল: তৎকালীন পাকিস্তানে একাধিক জাতিভিত্তিক আন্দোলন চলছিল। এ ক্ষেত্রে পূর্ব বাংলার বিশেষত্ব কী ছিল? পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধের প্রধান কারণ কী?

সুলতানা কামাল: আমি মনে করি, প্রতিটি জাতিভিত্তিক আন্দোলনের পেছনে থাকে সে জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। অর্থাৎ সব রকম অধিকারের বঞ্চনা থেকে বের হয়ে আসা, নিজের পরিচয়ে প্রাপ্য অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার সুযোগ পাওয়া। সেই জায়গায় আমি এ দেশের আন্দোলনের সঙ্গে পাকিস্তানের অন্যান্য অঞ্চলের আন্দোলনের পার্থক্য করি না। তবে বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসীদের সঙ্গে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সম্পর্কের যে ‘ডাইনামিক’ (গতিশীল) ছিল, এ অংশের জনগণের সঙ্গে তার বিস্তর ফারাক ছিল। পাকিস্তানের ওই অঞ্চলের ভাষা, ধর্মবোধ, সংস্কৃতিতে ভিন্নতা থাকলেও শাসকেরা তাদের যতটা কাছের মানুষ বলে মনে করতেন অথবা তারাও যতটা তাদের নিজেদের মানুষ বলে মনে করতে পারতেন, এ অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে সে রকম নৈকট্য গড়ে ওঠেনি। এ দেশের বঞ্চনা ও বৈষম্যের অনেক রকম মাত্রা ছিল, যার আলোচনা এই পরিসরে সম্ভব না। তা ছাড়া ভূরাজনৈতিক অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে বিবেচিত হতে পারে‌। এক কথায় বলতে গেলে পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধের কারণ বহুমাত্রিক। অর্থনৈতিক প্রবঞ্চনা, রাজনৈতিক নিপীড়ন, এ দেশের মানুষের সামাজিক সত্তার অসম্মান ও অস্বীকৃতি, বাংলার সংস্কৃতিকে হেয়প্রতিপন্ন করার প্রবণতা ইত্যাদি। এমনকি যে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করা, ‌এ দেশের মানুষের সেই ধর্মচিন্তা ও মূল্যবোধকে খাটো করে দেখা ও দেখানোর ঔদ্ধত্যও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। 

সমকাল: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান ভবিষ্যতে কীভাবে মূল্যায়িত হবেন বলে আপনি মনে করেন?

সুলতানা কামাল: আমি ভবিষ্যৎদ্রষ্টা নই। তবে আমি আমার দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরেরও অধিক কালের অভিজ্ঞতা ও দেশের প্রায় প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলন-সংগ্রাম এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধে আমার, পরিবার এবং সহযোদ্ধার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবেই অধিষ্ঠিত থাকবেন।

সমকাল: চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে বিতর্ক, স্থাপত্য ও ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে। এ প্রবণতা গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও সহমর্মিতার পথে কতটা সহায়ক? এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

সুলতানা কামাল: চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর যা ঘটেছে সেটা অনুসৃত হয়েছে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া থেকে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় প্রতিক্রিয়াশীলতার হাত ধরে বেশি দূর এগোনো যায় না। প্রতিক্রিয়া, প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসাপরায়ণতার প্রবণতা গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও সহমর্মিতার পথে সহায়ক না হয়ে বরং প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। শ্রীলঙ্কা এবং নেপালের দৃষ্টান্ত থেকে বলা যায়, সরকারের ভূমিকা এখানে যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারেনি।

সমকাল: সব সরকারের আমলেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সরকারের মত প্রাধান্য পেয়েছে। আবার ইতিহাস একরৈখিকও হয় না। মিথ্যা ও বিকৃতির সামনে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত অধ্যায় ও ইতিহাসের অবিকৃত পাঠ নতুন প্রজন্মের সামনে উপস্থাপনের জন্য কেমন উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে?

সুলতানা কামাল: ইতিহাসের মিথ্যা ও বিকৃতির পাঠ থেকে অবিকৃত পাঠ উপস্থাপনের জন্য একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের প্রয়োজন অপরিহার্য‌, যেখানে মুক্তবুদ্ধির চর্চা বাধাগ্রস্ত হবে না। যদি স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী দ্বারা সেই প্রয়াস চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তখন রাষ্ট্র সেখানে মুক্তবুদ্ধির চর্চার পক্ষে দাঁড়াবে, তাকে সুরক্ষা দেবে। গবেষণা, বুদ্ধিবৃত্তিক, বিজ্ঞানসম্মত এবং যুক্তিভিত্তিক আলাপ-আলোচনা, মতবিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।‌ শিক্ষা ব্যাবস্থার সংস্কারও অত্যন্ত জরুরি। দেশের সচেতন নাগরিক সমাজের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আবারও জোর দিয়ে বলতে চাই যে এ সমস্ত কর্মকাণ্ডকে সুরক্ষা দেওয়ার দায় এবং দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র নিষ্ঠা, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে নাগরিক সমাজকে সমর্থন দিতে সক্ষম হলেই একমাত্র এ কাজ করা সম্ভব।

সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। 

সুলতানা কামাল: সমকালকেও ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন

×