ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

বিশ্লেষণ

রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ জোরালো ও পরিষ্কার নয়

রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ জোরালো ও পরিষ্কার নয়
×

স্নেহাশীষ বড়ুয়া

স্নেহাশীষ বড়ুয়া

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ | ০৯:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসা পরিচালনায় ব্যয় কমানো এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে বাজেট প্রস্তাব করেছেন, তা নিঃসন্দেহে স্বাগতযোগ্য। তবে কর অব্যাহতির পরিধি ক্রমাগত বাড়তে থাকায় কর ব্যয়ের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন একটি সময়ে এই কর অব্যাহতি বাড়ানো হচ্ছে, যখন বিশাল বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের দিক থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য তেমন শক্তিশালী ও সুস্পষ্ট উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

বাজেটে অর্থমন্ত্রী ব্যবসার খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা প্রশংসার দাবিদার। বিশেষ করে উৎসে আয়কর ও উৎসে মূসক কাটার হার কমানো, বিভিন্ন পণ্যের আমদানি শুল্ক হ্রাস, কর ও ভ্যাট-সংক্রান্ত আপিল দায়েরের ব্যয় কমানো এবং ব্যবসায়িক ব্যয়ের যৌক্তিকীকরণ। এসব উদ্যোগ ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে এসব সুবিধার প্রকৃত সুফল যেন সাধারণ ভোক্তার কাছে পৌঁছে, সেজন্য সরকারের কঠোর বাজার তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।

ব্যবসায় খরচ কমানোর পাশাপাশি দেশীয় শিল্প ও ব্যবসার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার আঞ্চলিক প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারতেন অর্থমন্ত্রী। বিশেষ করে উৎপাদনমুখী ও মূলধননির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো, যারা বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, তারা এ ধরনের কর-সুবিধা থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতো। একইভাবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর চাপ কমাতে টার্নওভার করের হার আরও কমার দাবিও বিবেচনায় নিতে পারতেন অর্থমন্ত্রী।
সুখবর হলো–এ বছর ব্যক্তিগত আয়করের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ছে। আগামী কয়েক বছরে করহার কী হবে, তাও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের সুযোগ ছিল। মূল্যস্ফীতির কারণে যেন করদাতার ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা না পড়ে, সে জন্য করের ধাপগুলোকে ভোক্তা মূল্যসূচকের (সিপিআই) সঙ্গে সমন্বয় করার প্রয়োজন ছিল। পাশাপাশি সর্বোচ্চ প্রান্তিক করহার পুনর্বিবেচনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর করহার প্রায় ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যা বিনিয়োগ ও আয় ঘোষণার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
এছাড়া ঘোষিত বাজেটে ব্যবসার ব্যয় কমানোর কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও ভ্যাট ও শুল্ক কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা দেখা যায়নি। অথচ একটি আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির জন্য এ ধরনের সংস্কার অত্যন্ত প্রয়োজন। অর্থমন্ত্রী বাজেট চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে তা বিবেচনা করবেন বলে আশা করি।

তবে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য সামনে রেখে শুল্ককাঠামো যৌক্তিক করার বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। একই সঙ্গে করের আওতা কার্যকরভাবে সম্প্রসারণের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে করদাতারা হয়রানির শিকার হবেন না।

নাগরিকের আয়-ব্যয় বা লেনদেনে একটি সমন্বিত ডেটা সেন্টার করার ধারণা দিয়ে অর্থমন্ত্রী করের আওতা বাড়াতে এনবিআরকে সে ডেটা সেন্টারসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডারে প্রবেশাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন। এটি ভালো উদ্যোগ, তবে বাস্তবমুখী করা প্রয়োজন। যেমন–ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে ব্যক্তি নির্বিশেষে সবার টিআইএন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে বিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে প্রচলিত ব্যাংকিং ধারায় অনেক মানুষকে যুক্ত হতে নিরুৎসাহিত করবে। এতে হিতে বিপরীত হওয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
দীর্ঘ মেয়াদে করভিত্তি শক্তিশালী করতে হলে ভ্যাট ও কর নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সব আর্থিক লেনদেন সঠিক ও পূর্ণাঙ্গভাবে রিটার্নে প্রতিফলিত হওয়া নিশ্চিত করতে হবে। এতে রাজস্ব ফাঁকি কমবে এবং কর ব্যবস্থার ওপর আস্থা বাড়বে।

একই সঙ্গে কর অব্যাহতিগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ করছে কিনা, সাধারণ ভোক্তা বাস্তবে এর সুফল পাচ্ছেন কিনা এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় শিল্পকে কতটা প্রস্তুত করতে পারছে–এসব বিষয় নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন ও নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ব্যবসা সহজীকরণের জন্য প্রস্তাবিত নিয়ন্ত্রণ শিথিলের উদ্যোগগুলো অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য নতুন অর্থবছর শুরুর আগেই একটি সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সবশেষে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি–করজাল ও করভিত্তি সম্প্রসারণ করা না গেলে বিদ্যমান করদাতার ওপরই করের চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকবে। চাণক্যের ভাষায় বলা যেতে পারে, ‘যেমন কেউ অপরিপক্ব ফল ছিঁড়ে নেয় না, তেমনি একজন শাসকেরও উচিত নয় কোনো নাগরিকের সম্পদ অকালে নিঃশেষ করে দেওয়া। কারণ তা জনঅসন্তোষ সৃষ্টি করে এবং ভবিষ্যতের রাজস্ব ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়।’
দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বার্থে সরকার, ব্যবসায়ী, করদাতা ও নাগরিক–সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই হতে পারে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

লেখক: কর বিশেষজ্ঞ ও পরিচালক, এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস

আরও পড়ুন

×