সাক্ষাৎকার
পাহাড়িকন্যা ডনুচিংয়ের হকি জয়
পাহাড় ডিঙিংয়ে হকিতে আলো কাড়া ডনুচিং মারমা সুইহ।
...
প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৩:০৩
পাহাড়িকন্যা আনুচিং মারমা। স্বর্ণ ছিল মনিকা-ঋতুপর্ণা চাকমার মতো ফুটবলার হবেন। প্রাথমিকে পড়ার সময় ফুটবল নিয়েই পড়ে থাকতেন। কিন্তু ২০২৩ সালে চট্টগ্রামে ফুটবল ট্রায়ালে নেমে ফেল করেন। ডনুচিংয়ের স্বপ্নের সমাধি ঘটে। কিন্তু তার মামা তাকে নতুন স্বপ্ন দেখান। খানিকটা অনিচ্ছা নিয়েই হকির স্টিক-বল হাতে তুলে নেন। ট্রায়ালে ড্রিবলিং আর পাসে সবাইকে মুগ্ধ করেছেন তিনি, জয় করেছেন হকি। সম্প্রতি কুর্মিটোলার শাহীন দ্বীপে সমকালকে এসব গল্প বলেছেন ডনুচিং মারমা সুইহ। শুনেছেন সাখাওয়াত হোসেন জয়
সমকাল: পাহাড়ের মেয়েরা সাধারণত বেশি ফুটবল খেলে। আপনি কীভাবে হকিতে এলেন?
ডনুচিং: আমাদের এলাকায় কেউ হকি খেলত না। সত্যি বলতে, জানতই না হকি কী! আমি নিজেও হকি খেলার নাম শুনিনি কখনও। ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ২০২৩ সালে আমি চট্টগ্রামে ট্রায়াল দিতে যাই। সে সময় ফুটবলে আমাকে নেয়নি। মামা বলেছে, হকিতে ট্রায়াল দাও। আমি রাজি ছিলাম না। বলেছিলাম, হকি খেলব না; ফুটবলই খেলব। সে সময় আমার এক স্যার স্টিক আর বল হাতে দেয়। আমি জানতাম না, এটা কী দিয়েছে আমার হাতে? পরে ট্রায়ালে ভালো করি এবং ঢাকায় চার দিনের ক্যাম্প করি। সেখান থেকে ওই বছরই বিকেএসপিতে ভর্তি হই। আর ২০২৪ সালের শেষের দিকে মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৮ হকি জাতীয় দলে সুযোগ পাই। এ বছর বয়সভিত্তিক এশিয়ান কাপ প্রতিযোগিতায় আমরা ব্রোঞ্জ জিতি।
সমকাল: মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৮ এশিয়ান কাপে ব্রোঞ্জ জেতা। এই সাফল্য কীভাবে দেখছেন?
ডনুচিং: মেয়েদের হকিতে প্রথমবার আমরা ব্রোঞ্জ পদক জিতেছি। ভবিষ্যতে আরও ভালো করতে চাই। চীন-জাপানের মতো দলকে হারাতে চাই। প্রথমবার ব্রোঞ্জ পেয়েছি, পরেরবার চেষ্টা করব চ্যাম্পিয়ন হতে।
সমকাল: পাহাড়ি জীবন আর বর্তমান জীবনের মধ্যে কেমন পার্থক্য অনুভব করছেন?
ডনুচিং: এখানকার মতো কালচার সেখানে (পাহাড়ে) নেই। সেখানে আমরা আমাদের মতো থাকি। বিকেএসপিতে যখন ভর্তি হই, তখন অনেক কিছুই মিলত না, বিশেষ করে ভাষাগত সমস্যায় বেশি পড়েছি। সে সময় এখানে থাকতে ভালো লাগত না। সব সময় বাসায় ফোন দিয়ে কান্না করতাম যে আমি থাকব না, চলে যাব। একবার একদিন বাড়িতে গিয়ে আর আসিনি। পরে আমার মামাকে স্যার বুঝাইছে যে এখানে থাকলে ভালো হবে। আমি কান্না করতাম যে যাব না। পরে আমাকে নিয়ে আসছে। থাকতে থাকতে এখন অনেক ভালো লাগে। বাসায় এখন আর যেতে মন চায় না। আর প্রথম প্রথম খাবারে সমস্যা হইত। খাবার প্রায় একই; কিন্তু এখানকার খাবার পছন্দ হইত না। এখন খেতে খেতে মানিয়ে নিয়েছি।
সমকাল: পরিবার কি চেয়েছিল আপনি খেলাধুলা করেন? আর এখনই বা কী বলে?
ডনুচিং: শুধু ফুটবলের প্রতি আমার মনোযোগ ছিল সব। আর হকি তো জানত না। বলত যে এটা কী খেলা! যাওয়ার দরকার নাই। হকি খেলে যেটুকু আয় করি, তা পরিবারকে দিই। এসব দেখে আমার পরিবার এখন বলে, কেন বাসায় আসবা। ভালোয় খেলতাছো। আর ওখানে তো ভালোই আছো। বাসায় এসে এখন কী করবে?
সমকাল: আপনাকে দেখে আপনার এলাকার মেয়েরা কি হকি খেলায় আগ্রহী হয়েছে?
ডনুচিং: হ্যাঁ, আমাকে দেখার পর অনেকেরই আগ্রহ হচ্ছে। সেখানে আমার একটা কোচ আছে, উনি মেয়েদের খেলার জন্য ব্যবস্থা করে দেন। কিন্তু ওখানে স্টিক-বলের অভাব। আর খেলা হয় ঘাসের মাঠে, তাই সমস্যা হয়। কারণ, আমাদের তো টার্ফে খেলা লাগে। হকি মাঠ সেখানে নেই।
সমকাল: পাহাড়ি অঞ্চলের বলে পাহাড় ডিঙাতে হয়। সেই অভিজ্ঞতা কি এখানে কাজে লেগেছে?
ডনুচিং: খাগড়াছড়িতে তো আমি সব সময় দৌড়ে বেড়াইতাম। একটু সময় পেলে খেলতাম। এখানে এসে যখন আমাকে দৌড়াইতে বলত, আমি কখনও পিছিয়ে থাকতাম না। আগে থেকেই অভিজ্ঞতা থাকায় দৌড়াতে কষ্ট হতো না।
সমকাল: হকি নিয়ে আপনার স্বপ্নটা কী?
ডনুচিং: আগে ভাবতাম, হকি খেলব না; ছেড়ে দেব। এখন ভাবি, হকি কখনও ছাড়ব না। আরও চেষ্টা করব অনেক ভালো খেলার। সামনে বিশ্বকাপ খেলার চেষ্টা করব।
সমকাল: মেয়েদের হকি সেভাবে জনপ্রিয় হয়নি। সে ক্ষেত্রে করণীয় কী?
ডনুচিং: মেয়েদের হকি এগিয়ে নিতে হলে বেশি বেশি ম্যাচ আয়োজন করতে হবে। মাঠে নিয়মিত খেলা রাখতে হবে। খেলা থাকলে অভিজ্ঞতা বাড়ে। বাইরের দেশে যখন খেলতে যাই, তখন দেখা যায় প্রতিপক্ষের চেয়ে আমরা অভিজ্ঞতায় অনেক পিছিয়ে। এর বড় কারণ নিয়মিত খেলা হয় না।
সমকাল: পাহাড়ে তো আপনাদের নানা উৎসব হয়। সেগুলো মিস করেন কিনা?
ডনুচিং: হ্যাঁ, অনেক মিস করি। এপ্রিল মাসে চাকমাদের বিজু হয়, অনেক খেলাধুলা হয়। সেগুলো খুব মিস করি।
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার
- হকি
