ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিশ্বের জন্য তিনটি সতর্কবার্তা

বিশ্বের জন্য তিনটি সতর্কবার্তা
×

বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের মুখ্য ভূমিকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৪২ | আপডেট: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৪৮

প্রায় ৯ মাস আগেও বিশ্ব ঠিক একই রকম উদ্বেগের মধ্যে পড়েছিল। ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল পারস্পরিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে নানা দেশের সরকারপ্রধানদের মাথা ঘুরিয়ে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিষয়টি বাণিজ্যকেন্দ্রিক হলেও এর সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার উদ্বেগ ছিল।

গত শনিবারের ঘটনা বিশ্বকে আরেকবার নাড়িয়ে দিয়েছে। এবারও মুখ্য ভূমিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্প। চলচ্চিত্রের চূড়ান্ত নাটকীয়তার গল্পকেও ছাড়িয়ে গেছে নিকোলাস মাদুরোকে নিজ দেশ ভেনেজুয়েলার আবাসস্থল থেকে তুলে আনার ঘটনা। দৃশ্যটা ঠিক এ রকম– হাতকড়া আর পানির বোতল নিয়ে হাঁটছেন একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্ট (সদ্য ক্ষমতাচ্যুত)। আর হামলাকারী দেশের প্রেসিডেন্ট সংবাদ সম্মেলনে গিয়ে বলছেন, আজ থেকে ওই দেশ (ভেনেজুয়েলা) আমরা চালাব। তাদের তেলের খনি আমাদের।

অনানুষ্ঠানিক আলাপে এমন কর্মকাণ্ডকে বর্ণনা করা হয় ‘জোর যার মুল্লুক তার’ বলে। বৈশ্বিক কূটনীতির রীতিতে এটিকে অ্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে ‘আগ্রাসন’, ‘হস্তক্ষেপ’, ‘সাম্রাজ্যবাদ’ কিংবা ‘বলপ্রয়োগ’ হিসেবে। সাধারণত, এক বাড়িতে ডাকাতি হলে প্রতিবেশীরা কয়েক রাত জেগে সতর্ক থাকে। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের ঘটনাটিও বিশ্বনেতাদের মাঝে এমন উদ্বেগ আর সতর্কতার আবহ তৈরি করেছে।

এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সতর্ক হওয়ার মতো তিনটি বিষয় তুলে ধরেছেন অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক ডোনাল্ড রথওয়েল। গতকাল সোমবার এ নিয়ে তাঁর লেখা প্রকাশ হয়েছে গবেষণা ও বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধের প্ল্যাটফর্ম দ্য কনভারসেশনে।

রথওয়েল বলছেন, এ ঘটনা থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। প্রথমত, ট্রাম্প প্রশাসন দেখিয়েছে, খেয়ালখুশির ভিত্তিতে যাকে ইচ্ছা নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার ব্যাপক ক্ষমতা তাদের আছে। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা করপোরেশন– সবাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশ, আইন ও শক্তি প্রয়োগের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ফলে অনেকেই এখন উচ্চ সতর্কতায় থাকবে। ভেনেজুয়েলায় মূল হামলার আগে কয়েক ধাপে নৌযান ও তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা করে মার্কিন বাহিনী।

দ্বিতীয় শিক্ষা ও সতর্কতা হিসেবে রথওয়েল বলছেন, এই ধারাবাহিক পদক্ষেপগুলো জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন। কিন্তু এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি জাতিসংঘ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র সংস্থাটির নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। তাদের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা আছে। আর সংস্থাটিকে যে ট্রাম্প পাত্তা দেন না, তা আগে বহুবার বক্তব্যের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। ফলে জাতিসংঘ এখানে অসহায়। 

তৃতীয়ত, ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসনের সময় মার্কিন বাহিনী কোনো প্রতিরোধের মুখে পড়েনি। কিন্তু ভবিষ্যতে এমন অভিযান চালাতে গিয়ে যদি শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়ে তাহলে, ন্যাটো ও ‘এএনজেডইউএস’ জোটভুক্ত দেশগুলোর জন্য একটি দায়বদ্ধতা তৈরি হবে। এই দায়বদ্ধতা হলো যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করার। কারণ, ন্যাটোভুক্ত কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে অন্য সদস্য দেশও আক্রান্ত হয়েছে ধরে নিয়ে অভিযান চালাতে বাধ্য থাকবে। সেটি হলে বড় ধরনের বৈশ্বিক সংঘাত বাধবে।

এই তিনটি বিষয় দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আছে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা, জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ মোকাবিলার উপায় ও জোটভুক্ত শক্তিশালী দেশগুলোর সমর্থন পাওয়ার নিশ্চয়তা। তাই রথওয়েল বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ভবিষ্যতেও আগ্রাসনের পথে এগোয়, তাহলে তাদের হস্তক্ষেপবাদী নীতির ভুক্তভোগী হতে পারে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দেশ।

দুর্বল নেতারা বড় মিত্র খুঁজবে
মাদুরোকে তুলে আনার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ আমেরিকার আরও কয়েকটি দেশের নেতাদের উদ্দেশ্যে হুমকি দিয়েছেন। এ কাতারে আছে কলম্বিয়া, কিউবা ও মেক্সিকো। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের শাসকরাও দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের হুমকির মুখে আছেন।

একদিকে বাণিজ্যিক ক্ষতির আশঙ্কা, অন্যদিকে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ভয়– এ অবস্থায় করণীয় কী? মার্কিন রাজনীতি বিশ্লেষক ড্যানিয়েল ডব্লিউ ড্রেজনার ‘দ্য শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের’ নিবন্ধে লিখেছেন, ভেনেজুয়েলায় অভিযান একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেটি হলো, বিদেশি নেতাদের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা রীতিনীতি মানা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ মাথাব্যথা নেই। মাদুরোর বিরুদ্ধে নেওয়া এই পদক্ষেপকে ট্রাম্প প্রশাসন ভবিষ্যতে অবাধ্য মিত্র ও দুর্বল প্রতিপক্ষকে হুমকির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। যেখানে ইঙ্গিত থাকবে, তারাও পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারেন।

ডব্লিউ ড্রেজনার বলছেন, এ ধরনের হুমকি বাস্তবেও কাজ করতে পারে। যেসব দেশের পেছনে কোনো বড় শক্তির পৃষ্ঠপোষকতা নেই, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক চাপের কাছে আরও নতিস্বীকারে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। অবশ্য এর আরেকটি সম্ভাব্য ফলও আছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ‘বীমা’ হিসেবে অনেক দেশের নেতারা অন্য বড় শক্তির সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার পথ বেছে নিতে পারেন।

ট্রাম্পের জন্যও সতর্কবার্তা
মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভেনেজুয়েলা অভিযান উনিশ শতকের সাম্রাজ্য বিস্তারের যুগের সঙ্গে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। মাদুরোকে আটকের ঘোষণা দেওয়ার পর ট্রাম্প ‘মনরো ডকট্রিন’ এর কথা তুলে ধরেন। যা ১৮২৩ সালে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ঘোষিত পররাষ্ট্র নীতির একটি রূপান্তর। ওই নীতিতে ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে পশ্চিম গোলার্ধে হস্তক্ষেপ বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। 

গত মাসে হোয়াইট হাউস প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রে মনরো ডকট্রিনের আদলে ‘ট্রাম্প করোলারি’র কথা উল্লেখ করা হয়। যেখানে বলা হয়, নিজেদের ভূখণ্ড ও পুরো অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার রক্ষা করা হবে।

দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা মাইকেল বার্নবাউমের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগের সঙ্গে বড় ধরনের ঝুঁকিও আছে। ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী বা জনগণ যদি ট্রাম্পের পরিকল্পনার সঙ্গে একমত না হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র একটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে। এতে রাশিয়া ও চীনের কাছে প্রতিবেশীদের ওপর হস্তক্ষেপ বন্ধ-সংক্রান্ত যুক্তি তুলে ধরা কঠিন হবে। 

মাইকেল বার্নবাউম বলছেন, এটি বৈশ্বিক রাজনীতির গতিপথও বদলে দিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য ও স্থিতিশীলতার জন্য ওয়াশিংটনের নিশ্চয়তার ওপর নির্ভরশীল ছোট দেশগুলো তখন বিকল্প নিরাপত্তা ও অংশীদারিত্বের খোঁজে অন্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলবে।

আরও পড়ুন

×