ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

বিশ্বকাপে 'আরব বসন্ত'

বিশ্বকাপে 'আরব বসন্ত'
×

ক্যামেরুনের সীমানায় আক্রমণের চেষ্টা সার্বিয়ার আলেক্সান্ডার মিত্রোভিচের। আল জানিয়ুব স্টেডিয়ামে হয়েছে ছয় গোলের রোমাঞ্চকর ম্যাচ এএফপি

দোহা থেকে সঞ্জয় সাহা পিয়াল

প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৮ নভেম্বর ২০২২ | ২৩:৩৩

তপ্ত দুপুরে রোদে শুকানো রাস্তাগুলোর পাশে একলা দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোকে মাঝেমধ্যে সঙ্গ দেয় শালিক-ঘুঘুর দল। পুরোনো বিল্ডিংগুলোর জানালার ধারে পায়রাও আসে মাঝেমধ্যে। মরুভূমে কান পাতলে শোনা যায় এদেরই কিচিরমিচির, সেখানে কোকিলের সুর খোঁজা উন্নাসিক অবাস্তবতা। কিন্তু বিশ্বকাপে যে এখন চলছে 'আরব বসন্ত'! ইউরোপ-লাতিনের বড় জায়ান্টদের হারিয়ে দিচ্ছে আরব্যভূমির একেক খণ্ড। কাতারে বিশ্বকাপ কাভার করতে আসা পশ্চিমা লিখিয়েরা এটাকে প্রাচ্যের অঘটন বলে 'দেখা যাবে...' ভঙ্গিতে উড়িয়ে দিলেও সেদিন রেড ডেভিলস বেলজিয়ামকে ২-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর তাঁরাই এখন ল্যাপটপ খুলে খুঁজছেন শেষবার কবে আরবে বসন্ত এসেছিল।

উত্তর আফ্রিকা থেকে মরক্কো বিশ্বকাপের টিকিট নিলেও আদতে তা আরব ভূখণ্ডই। কাতার, সৌদি আরব, মিসর, ইরাক, সোমালিয়া, সুদানসহ অন্তত ২২টি দেশ নিয়ে আরব ভূখণ্ডের বিস্তৃতি। সেখানে বিশ্বকাপে এবার মাঠে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গাওয়ার সুযোগ মিলেছে কাতার, সৌদি আরব, মরক্কো আর তিউনিসিয়ার। এরই মধ্যে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে সৌদি আরব আর ডেনমার্কের সঙ্গে ড্র করে তিউনিসিয়াও চমকে দিয়েছে। কাতার সেভাবে দাগ কাটতে না পারলেও গোল করেছে একটি সেনেগালের বিপক্ষে। আর মরক্কো তো এখন গ্রুপ 'এফ'-এর দ্বিতীয় স্থানে। ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে ড্র করার পর বেলজিয়াম-বধ। বিশ্বকাপে ২৪ বছর পর প্রথম জয় পেয়েছে মরক্কো। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে সর্বশেষ স্কটল্যান্ডকে হারিয়েছিল মরক্কো।

কিন্তু সেই মরক্কোর এই নতুন প্রজন্মের কাছে এখন তা শুধুই রূপকথার গল্প। তারা চাইছিল নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে। রোববার আল থুমামার গ্যালারিতে যে লাল রঙের আভা ছিটকে পড়ছিল, তাদের বেশিরভাগই মরক্কোর নতুন প্রজন্মের ফুটবলপ্রেমী। তারা বেশিরভাগই মেসি-নেইমারের সঙ্গে পিএসজিতে তাদের প্রিয় তারকা আশরাফ হাকিমির খেলা দেখে অভ্যস্ত। তারা ইংলিশ লিগে চেলসিতে মরক্কোর অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হাকিম জিয়াচকে দেখে প্রতি সপ্তাহে। মরক্কোর হয়ে সেদিন যে দু'জন গোল করেছেন, তাঁদের একজন আব্দেল হামিদ সাবিরি খেলেন ইতালিয়ান সিরি-এতে সাম্পদোরিয়ার হয়ে। অন্যজন জাকারিয়া আবুখলিল খেলেন ফ্রান্সের লিগ ওয়ানে। মরক্কোর এই দলে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, জার্মান লিগে খেলা অনেকে রয়েছেন। সুতরাং হৃদয়ে আরব সংস্কৃতি ধারণ করেও তাদের ফুটবল পাঠশালা এখন ইউরোপে। আর আরবের এই নতুন প্রজন্মের হাত ধরেই সেখানে বসন্তের হাওয়া বইছে।

দোহার ডাউন টাউনের দিকে যেসব দুর্গের মতো বাড়ি আর প্রাসাদ রয়েছে স্থানীয় কাতারিদের, সেখানে বিশ্বকাপের শুরুতে দেখা যেত শুধুই কাতারের পতাকা ঝোলানো। ধীরে ধীরে এখন সেসব বাড়িতে কাতারের পতাকার পাশে ঠাঁই পাচ্ছে সৌদি আরব, মরক্কো আর তিউনিসিয়ার পতাকাও। অবশ্য বিশ্বকাপে এই আরব্য রজনির নেতিবাচক ঢেউ লেগেছে ইউরোপের অন্ধকার গলিতে। কাতারের মিডিয়া সেন্টারের আইটি বিভাগে কাজ করা মরক্কোর তরুণ সেটিই বলছিলেন আক্ষেপ করে। মরক্কোর কাছে হারার পর বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে নাকি দাঙ্গা হয়েছে। তিনি চিন্তিত কারণ, তাঁর বোন থাকেন নেদারল্যান্ডসের একটি ছোট্ট শহরে। খবর এসেছে, সেখানেও নাকি মরক্কোর কলোনিতে হামলা হয়েছে।

তবে এটুকু টেনশনের বাইরে মরক্কানরা এখন স্বপ্ন দেখছেন আরও এগিয়ে যাওয়ার। তাঁদের কোচ ওয়ালিদ রেগ্রাগুই বুঝিয়ে দেন, তাঁদের পথ এখানেই শেষ নয়, আরও দূরে। 'জয়টি ঐতিহাসিক আমাদের জন্য, তবে এখানেই লক্ষ্য শেষ হয়ে যায়নি। পরের রাউন্ডে যেতে হবে। কাতারে এসে মনে হচ্ছে, নিজেদের মাঠেই খেলছি। মরক্কো আর আরবের দর্শক মিলে আমাদের যে প্রেরণা দিচ্ছে, তাতে খেলোয়াড়দের ক্লান্তি আসতে পারছে না। আমরা ইউরোপিয়ান স্টাইলে খেলছি। আমরা জানি, কীভাবে বড় ম্যাচ জিততে হয়।'

কোচের কথার মধ্যে যে আত্মবিশ্বাস, সেটাই তো আরব বসন্ত। গুগলে সার্চ দিলে 'আরব বসন্ত' বলতে ইঙ্গিত দেয় বছর দশেক আগে তিউনিসিয়াসহ আরবের অনেক দেশে গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলনের কথা। সেটা ছিল আরবে একটা পরিবর্তনের ঝটকা হাওয়া। এবারের বিশ্বকাপেও মরুতে তেমনই একটা হাওয়া বইছে। বসন্ত এসে গেছে...।

আরও পড়ুন

×