সাক্ষাৎকার
সাগর এবার একাই পাড়ি দিতে চান
ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে সাগর ও হিমেল দেশের পতাকা উচিয়ে ধরেন।
সাখাওয়াত হোসেন জয়
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৫ | ১৫:৩৭
অফিসিয়ালি লেখা ৩৬ থেকে ৩৭ কিলোমিটার। তবে সাঁতার করার সময় তা ৪০-৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত হয়ে যায়। ছয়জন মিলে ১২ ঘণ্টা ১০ মিনিটে লন্ডন থেকে প্যারিস ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়েছেন মাহফিজুর রহমান সাগর। ১৯৮৮ সালে মোশাররফ হোসেনের পর বাংলাদেশের দুই সাঁতারু সাগর ও নাজমুল হক হিমেল বিখ্যাত ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়েছেন। তাদের এই অসাধ্য সাধনের গল্পগুলো বুধবার ইংল্যান্ড থেকে হোয়াটসঅ্যাপে সমকালের সঙ্গে বলেছেন সাগর। তা শুনেছেন সাখাওয়াত হোসেন জয়।
সমকাল: ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিলেন। অনুভূতিটা একটু বলেন?
সাগর: এটা অসাধ্য সাধন করার মতো। কারণ, ইংলিশ চ্যানেলের ব্যাপারটা আমাদের কাছে বিশাল কিছু। আটলান্টিক সাগর পাড়ি দেওয়া মানে, ইংল্যান্ড থেকে ফ্রান্সে যাওয়া। যে সাগর পাড়ি দিতে অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হয়। সেগুলো ওভারকাম করে আমরা ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়েছি। এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। স্বপ্ন সত্যি হওয়ার আনন্দে ভাসছি আমরা।
সমকাল: কতটা চ্যালেঞ্জ ছিল ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়াটা?
সাগর: অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল। শুরু থেকেই চ্যালেঞ্জ ছিল। জেলিফিশ, ঠান্ডা পানি, কম তাপমাত্রা– সবকিছুই তো প্রতিকূলে ছিল। একটানা দম ধরে রেখে সাঁতার কাটাটাও তো কষ্টকর।
সমকাল: কীভাবে চ্যানেলটা পাড়ি দিয়েছেন?
সাগর: প্রথমে আমাদের চারজনের সাঁতরানোর কথা ছিল। পরবর্তী সময়ে আমাদের পরিকল্পনা পরিবর্তন হয়। আমরা বাংলাদেশের দুজন– আমি ও হিমেল, ভারতের তিনজন এবং মেক্সিকোর একজন। সব মিলিয়ে আমরা ছয়জন রিলেতে নামি। রিলের প্রথমে শুরুটা করি আমি। আর শেষটাও আমার মাধ্যমেই হয়েছে। ঠান্ডা পানি আর অন্ধকারের মধ্যে সাঁতার কেটেছিলাম আমরা। তার সঙ্গে সি সিকনেস হয়েছিল। আমি প্রথম ঘণ্টা করার পর যখন বোটে ওঠি, তখন বমি করেছিলাম। গভীর রাতে শুরু করার পর শেষ করতে দুপুর হয়েছিল। ছয়জন হওয়াতে সবারই একটু পরিশ্রম কম হয়েছে। সবাই এক ঘণ্টা করে দুবার দুই ঘণ্টা সাঁতরেছি। পুলের সাঁতার রিলের মতো এখানেও এক ঘণ্টা সাঁতারের পর টিমমেটকে স্পর্শ করলে সে নেমেছে। পাঁচজন দুই ঘণ্টা সাঁতরেছি, আমি ১০ মিনিট বেশি। সব মিলিয়ে ১২ ঘণ্টা ১০ মিনিট সাঁতরানোর পর আমরা ফ্রান্সে পৌঁছাই।
সমকাল: অতীতে কখনও এতদূর সাঁতরেছেন কিনা?
সাগর : এর আগে ২০১৩ সালে ভারতের ভাগীরথী নদীতে ১৯ কিলোমিটার সাঁতার কেটেছিলাম।
সমকাল: ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার সময় কোনো ভয় কাজ করেছিল কিনা?
সাগর : এত বড় একটা চ্যানেল পাড়ি দিতে নামলে ভয় কাজ করাটাই স্বাভাবিক। এখানে যে কোনো কিছু হতে পারে, আবার লক্ষ্য পূরণও হতে পারে। আমাদের স্লট বারবার পরিবর্তন হওয়ায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। অনেক সময় দেখা গেল, আমরা হোটেল থেকে বের হয়েছি, জানানো হলে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাঁতার করা যাবে না। এই অবস্থায় সাঁতার করতে পারব কিনা, সেই শঙ্কাও ছিল। তার ওপর রাত আড়াইটায় নদীতে নেমেছি। নানা ভয় আর শঙ্কার মধ্যে সাঁতার শেষ করতে পেরেছি বলে তৃপ্ত আমরা।
সমকাল : এর আগে ব্রজেন দাস ও মোশাররফ হোসেন– দুজন একাই পাড়ি দিয়েছিলেন। আপনার এ রকম ইচ্ছা ছিল কিনা?
সাগর : ইচ্ছা তো ছিল তাদের মতো একাই ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেব। কিন্তু একা পাড়ি দিতে ২০-২৫ লাখ টাকার মতো প্রয়োজন, যা আমার পক্ষে একা বহন করা সম্ভব নয়। এখানে অনেক কিছু জড়িত। প্রথম থেকেই একা করার ইচ্ছা ছিল। এটা তো আমার একটা বিপ টেস্ট বলতে পারেন। আমরা একটা অজানা জিনিস করতে চাই, সেটা কী, তা এখন বুঝেছি। রিলেতে সাঁতার করার পর একটা অভিজ্ঞতা হলো। ভবিষ্যতে ইচ্ছা আছে একা সাঁতরানোর।
সমকাল : এত বড় অর্জন। দেশ থেকে উচ্চ পর্যায়ের কারও কাছ থেকে অভিনন্দন পেয়েছেন?
সাগর : বাংলাদেশ সাঁতার ফেডারেশন থেকে অভিনন্দন জানিয়েছে। তবে বিশেষ কারও কাছ থেকে কোনো অভিনন্দন পাইনি।
সমকাল : ক্রিকেট-ফুটবলে কোনো কিছু করলে উন্মাদনা শুরু হয়। কিন্তু আপনাদের ক্ষেত্রে তো তা হয়নি।
সাগর : উচ্চ পর্যায় থেকে কেউ কিছু করেনি বা অভিনন্দন জানায়নি বলে খারাপ লাগা কাজ করছে না। কারণ, এই দেশটা ক্রিকেট পাগল প্লাস ফুটবলেরও এখন প্রচুর উন্মাদনা। সেই হিসেবে ধরেই নিয়েছি আমরা যত ভালো করি না কেন, অনেক ক্ষেত্রে এই জিনিসগুলো আমাদের ফেস করতেই হতে পারে। আমরা বড় কারও কাছ থেকে অভিনন্দন পাব– এমন প্রত্যাশা অন্তত আমি করিনি। করলে অবশ্যই ভালো লাগত।
সমকাল : যখন শেষ করলেন, তখন বিশ্বাস হচ্ছিল যে আপনারা পেরেছেন?
সাগর : এর চেয়ে ভালো আর লাগতে পারে বলে মনে হয় না। আমরা জানতাম ব্রজেন দাস, মোশাররফ করিম এই ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়েছেন। আর এখনও যদি ব্রজেন দাসের কথা ওঠে, তাঁকে অনেকেই চেনে। আমরা আবার একটা মাইলস্টোন করেছি। বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছি– এটার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
- বিষয় :
- সাঁতারু
- ইংলিশ চ্যানেল
