ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

যে ম্যাচে সবাই ‘ম্যাচসেরা’

যে ম্যাচে সবাই ‘ম্যাচসেরা’
×

ছবি- এএফপি

সঞ্জয় সাহা পিয়াল

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:২৮

ক্রিকেট পরম মায়াবিনী, তার চেয়ে বোধ হয় বেশি পাষাণী! কখনও কখনও বড্ড নিষ্ঠুর তার বিচার। আহমেদাবাদে আফগানিস্তান আর দক্ষিণ আফ্রিকার মহানাটকীয় ম্যাচ যার সাক্ষী হয়ে রইল কাল। যেখানে গুরবাজের তিন ছক্কার উল্লাস মুহূর্তে বিষাদ হয়ে যায়, যেখানে দুই-দুটি সুপার ওভার শেষে শরীরের সমস্ত শক্তি নিংড়ে নিয়ে ‘স্কোরকার্ডটাই’ শুধু সত্যি হয়ে যায়। লেখা হয়ে যায় একটি টাই ম্যাচ ‘সুপার ওভার’ জিতেছে প্রোটিয়ারা। যা লেখা হয় না, শুধু হৃদয়ে গাঁথা হয়ে থাকে তা হলো, আফগান ট্র্যাজেডির ‘ইডিপাস’ হয়ে রহমানউল্লাহ গুরবাজকে মাঠ ছাড়তে দেখা। 

যে ছেলেটা সারাদিন লড়াই করল, যার ব্যাটে ভর করে আফগান স্বপ্ন ডানা মেলল, সেই ছেলেটাই কিনা ফিরল চোখে জল নিয়ে। এই হারের পর কার্যত বিশ্বকাপের সুপার এইটে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই আফগানদের। কিন্তু এদিন তারা প্রোটিয়াদের শেষ বলটি পর্যন্ত যে হৃৎকম্পনের পরীক্ষায় ফেলল, যেভাবে নুর-ওমরজাই-ফারুকিরা যেভাবে পৈশাচিক ডাবল সুপার ওভারের সঙ্গে সবটুকু দিয়ে লড়ল, তাতে বিশ্বক্রিকেট এই অবিশ্বাস্য এক ম্যাচ উপহার দেওয়ার কুর্নিশ জানায় নীল জার্সির ১১ আফগান যোদ্ধাকে। ‘যে ম্যাচে কেউ হারেনি, যে ম্যাচের সবাই ম্যাচসেরা’– বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে ডেইল স্টেইনের কুর্নিশ এভাবেই।

দিনে তিন তিনটি ম্যাচ, গতকালের প্রথম ম্যাচটি হয়তো অনেকেই সরাসরি দেখতে পারেননি, আহমেদাবাদের গ্যালারিতেও ভরদুপুরে মেরেকেটে হাজারের মতো দর্শক ছিল। প্রায় ৩১ ডিগ্রি গরমের মধ্যেই ম্যাচটি একটু একটু করে আগুনে তাপ ছড়াতে থাকে। প্রথমে প্রোটিয়াদের তোলা ১৮৭ রানের জবাবে আফগানদের ১৮৭, এরপর প্রথম সুপার ওভারে আফগানদের তোলা ১৭ রানের উত্তরে প্রোটিয়াদেরও ১৭। দ্বিতীয় সুপার ওভারে প্রোটিয়াদের ২৩ রানের পাল্টা আফগানদের ১৯। একবারে ‘টাই’ ‘টাই’ জয় প্রোটিয়াদের। ম্যাচ নয় এ যেন রীতিমতো থ্রিলার মুভি, যার ট্রেলার অবশ্য এটা নয়। ম্যাচটির পরতে পরতে ছিল আফগান বীরত্ব আর প্রোটিয়াদের প্রাণশক্তির প্রদর্শন।

প্রথমে ব্যাটিং নেমে ছয় উইকেটে ১৮৭ রান তোলে দক্ষিণ আফ্রিকা। ডি কক ৪১ বলে  ৫৯ আর রিকেলটন ২০০ স্ট্রাইকরেটে ৬১ রান তোলেন। জবাব দিতে নেমে চার ওভারের মধ্যেই ৫০ রান তুলে নেয় আফগানিস্তান। এনগিনি এক ওভারেই দুই উইকেট আর রাবাদা একটি উইকেট তুলে নিলে কিছুটা থমকে যায় আফগানিস্তান। কিন্তু ৪২ বলে ৮৪ রান করে দলের জয়ের সম্ভাবনা বাঁচিয়ে রাখেন গুরবাজ। নাটকের প্রথম অঙ্ক তখনও বাকি। শেষ ওভারে জয়ের জন্য ১৩ রান দরকার ছিল আফগানিস্তানের, হাতে শেষ উইকেট। আর সেই ওভারের প্রথম বলেই নুর আহমেদকে বোল্ড করে দেন রাবাদা। দক্ষিণ আফ্রিকা জয়ী ১২ রানে– স্কোর বোর্ডে ফলাফল লিখতে লিখতেই ফাঁকা মাঠে সাইরেন বেজে ওঠে। টিভি আম্পায়ার সংকেত দেন ওভারস্টেপের কারণে বলটি ‘নো’। জীবন পেয়ে সেই ওভারেই ছক্কা হাঁকান নুর। শেষ বলটিতে জয়ের জন্য দুই রান নিতে গিয়ে রানআউট হন ফারুকি। ম্যাচ টাই।

থ্রিলারের দ্বিতীয় অঙ্ক শুরু হয় প্রথম সুপার ওভারে। যেখানে এনগিডির কাছ থেকে আজমাতুল্লাহ জাজাই দুই ছক্কায় ১৭ রান নিয়ে নেন। জবাব দিতে নেমে ফারুকির শেষ বলে ছক্কা হাঁকিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ‘টাই’। ভাগ্যদেবতা কাউকে যেন কাঁদাবেনই। শুরু হয় দ্বিতীয় সুপার ওভার, যেখানে মিলার আর স্টাবস মিলে তিন ছক্কায় মোট ২৪ রান তুলে নেন। জবাব দিতে নেমে কেশব মহারাজের দ্বিতীয় বলেই আউট নবি।

ক্রিজে আসেন গুরবাজ, হিসাব ৪ বলে ২৪। পরপর তিন ছক্কা হাঁকিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে রীতিমতো যমের দুয়ারে নিয়ে গেছেন গুরবাজ। কিন্তু শেষ বলে সেই তিনিই ক্যাচ তুলে কাটা পড়েন। হেরে যায় তাঁর দল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসে টি২০তে তিনবার এমন দুটি করে সুপার ওভার হয়েছে। যার দুটিতেই ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়েছে আফগানদের। বছর দুই আগে চেন্নাইয়ে ভারতের সঙ্গে ভাগ্যের কাছে হেরে গিয়েছিল তারা, আর গতকাল হারল সেই প্রোটিয়াদের কাছে, যারা কিনা চাপে মুখে ভেঙে পড়ে বলে অপবাদ আছে। এদিন যেন তারা সেই শাপ মোচন করতেই মাঠে নেমেছিল। ম্যাচ শেষে আফগান অধিনায়ক রশিদ খান বলেছেন, ‘আমি গর্বিত এই দল নিয়ে, আমরা গর্বিত এই লড়াই করে।’ সত্যিই গর্বিত তারা। তবে সেই গর্বের অন্তরালে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল, সেটা তাঁর ম্লান মুখটাই বলে দিচ্ছিল।

আরও পড়ুন

×