স্কোয়াড বিশ্লেষণ
ইতিহাস গড়েছিল ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার পারা না পারার ৪ দিক
জাম্বিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে গোলের পর উদযাপন করেন আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা। ৩১ মার্চ বুয়েন্স এইরেসে। ছবি: এএফপি
ফক্স স্পোর্টস
প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬ | ১৮:৩১
আসন্ন বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা এমন এক কঠিন লক্ষ্য নিয়ে খেলতে যাচ্ছে, যা অর্জন করা নিয়ে ইতিহাসে মাত্র দুটি উদাহরণ আছে।
এখন পর্যন্ত টানা দুইবার শিরোপা জিতেছে কেবল ইতালি ও ব্রাজিল। প্রশ্ন উঠছে, আর্জেন্টিনা ২৬ সদস্যের যে দল ঘোষণা করেছে, সেটি কি চার বছর আগের গৌরবময় অর্জনের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর জন্য যথেষ্ট? এর উত্তর হয়তো সময়ই বলে দেবে। তবে স্কোয়াডটি বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক পাওয়া যায়। সেগুলো তুলে ধরা যাক।
ব্যাক-টু-ব্যাক ডেসটিনি?
কিংবদন্তি কোচ ভিত্তোরিও পোজোর অধীনে ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপে প্রথম এই কীর্তি গড়েছিল ইতালি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ট্র্যাজেডি না ঘটলে হয়তো তারা এই ধারা আরও বজায় রাখতে পারত (যুদ্ধের কারণে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপ বন্ধ ছিল)। এর আট বছর পর, ১৯৫৮ সালে পেলে নামের বিস্ময়ের কারণে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায় ব্রাজিল। ১৯৬২ সালে এই দলটি টানা দ্বিতীয় শিরোপা জেতে গারিঞ্চা ও আমারিলদোর নৈপুণ্যে।

২০১৮ সালে রাশিয়ায় বিশ্বকাপ জেতা ফ্রান্স ২০২২ সালের ফাইনালে পৌঁছে এলিট ক্লাবটিতে যুক্ত হওয়ার খুব কাছাকাছি গিয়েছিল। কিন্তু ম্যাচের ১২৩তম মিনিটে রান্দাল কোলো মুয়ানির প্রায় নিশ্চিত গোলের শটটি এমিলিয়ানো মার্টিনেজ ঠেকিয়ে দিলে সব হিসাব পাল্টে যায়। ওই মুহূর্তটিই সামনে আনছে ‘ভাগ্যের লিখন’ শব্দটিকে। টানা দ্বিতীয় শিরোপা জেতার ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনার ভাগ্য কি সুপ্রসন্ন হবে?
আর্জেন্টিনার স্কোয়াড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক ফুটবলে সম্ভবত এটিই সবচেয়ে সুসংহত ও ঐক্যবদ্ধ দল। এই একতাবদ্ধ শক্তির জোরেই দলটি একের পর এক সাফল্য পেয়ে আসছে। কাতারে বিশ্বকাপ, দুই বছর পর কোপা আমেরিকা জয়- সবকিছুই প্রমাণ করে, নতুন কেউ সিংহাসন না নেওয়া পর্যন্ত তারাই বিশ্বের সেরা দল।
তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে। এবারের দলটিতে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। তাই ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল বা ইংল্যান্ডের মতো ইউরোপের পরাশক্তি, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল কিংবা অন্য কোনো ‘ডার্ক হর্স’ যে আর্জেন্টিনার জয়রথ থামিয়ে দিতে পারে- তা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
মেসির ‘লাস্ট ড্যান্স’ কেমন হবে?
এবারের বিশ্বকাপটি ৩৯ বছর বয়স পূর্ণ করতে যাওয়া মেসির ক্যারিয়ারের ষষ্ঠতম। ক্যারিয়ার দীর্ঘ হওয়ার একটি নেতিবাচক দিক হলো শারীরিক ফিটনেসের অনিশ্চয়তা। গত সপ্তাহে ইন্টার মায়ামির হয়ে ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের বিপক্ষে খেলার সময় বাঁ উরু চেপে ধরে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল মেসিকে। বর্তমানে তিনি হ্যামস্ট্রিংয়ের মাংসপেশির ক্লান্তির সমস্যায় ভুগছেন।

কোচ স্কালোনি এখন মেসির পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার অপেক্ষায়। তবে আমেরিকার বৈরী আবহাওয়ার মৌসুমে হতে যাওয়া বিশ্বকাপে মেসিকে শতভাগ প্রস্তুত রাখতে আর্জেন্টিনার ট্রেইনার ও মেডিকেল টিমকে সেরাটা ঢেলে দিতে হবে।
ধারণা করা হচ্ছে, এবারের আসরই মেসির শেষ বিশ্বকাপ। অর্থাৎ, বিশ্বমঞ্চে তাঁর বিদায়ী অধ্যায় দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। তাই আর্জেন্টাইন স্কোয়াডকে এখন থেকেই মেসির ওপর নির্ভরতা কমানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এমন এক কঠিন বাস্তবতা সামনে রেখেই টানা দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের মিশনে নামবে আলবিসেলেস্তেরা। মাঠের খেলায় সেটির প্রভাব কেমন হবে তা সময়ই বলে দেবে।
এসেছে নতুন ‘শিশু’
চূড়ান্ত দলে ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়ানো জায়গা পাননি। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ১৮ বছর বয়সী এই তরুণ রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে পারেননি। আশার কথা হলো, বয়স এখনো তাঁর পক্ষেই আছে।

২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপজয়ী ১৮ জন তারকা ফুটবলারের সঙ্গে এবার যোগ দিয়েছে আট নতুন মুখ। তাদের মধ্যে বিশেষভাবে নজর কেড়েছেন হোসে ম্যানুয়েল লোপেজ বা ফ্লাকো লোপেজ। কোচ স্কালোনির স্কোয়াডে তাঁর অন্তর্ভুক্তি এক বড় চমকই বটে। কারণ দক্ষিণ আমেরিকার বাইরে তাঁর পরিচিতি কিছুটা কম। ২৫ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার খেলেন ব্রাজিলের ক্লাব পালমেইরাসের হয়ে। চলতি মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ইতোমধ্যে তিনি ১৪টি গোল করেছেন। নজর কেড়েছেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ও লা লিগার বেশ কয়েকটি ক্লাবের।
আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ বা ফরোয়ার্ড লাইন এমনিতেই বেশ শক্তিশালী ও গভীর। তবে লোপেজ দলে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করবেন। গোল করার পাশাপাশি সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রেও তাঁর দারুণ দক্ষতা (৯টি অ্যাসিস্ট) আছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়া অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার অনুপস্থিতিতে, লোপেজ চমৎকার বিকল্প হতে যাচ্ছেন।
আলভারেজ কি প্রস্তুত?
এই স্কোয়াডে দিয়েগো সিমিওনের এক ধরনের পরোক্ষ প্রভাব থাকাটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা বলে মনে হয় না। কোচ স্কালোনি খেলোয়াড়দের মধ্যে এক ধরনের ইস্পাতকঠিন মানসিক দৃঢ়তা দেখতে চান। আর দলে অ্যাটলেতিকো মাদ্রিদের ছয়জন খেলোয়াড়ের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতভাবেই সেই চারিত্রিক দৃঢ়তার বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে।

তবে ওই ছয়জনের মধ্যে হুলিয়ান আলভারেজের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে মেসি যখন মাঝমাঠের একটু নিচে নেমে খেলবেন তখন আলভারেজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। পাশাপাশি এটি তাঁর জন্য টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে ওঠারও দারুণ সুযোগ এনে দেবে।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম লক্ষ্য হবে গ্রুপ পর্বে (আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডান) চ্যাম্পিয়ন হওয়া। কাগজে-কলমে এটি তাদের জন্য সহজ হওয়ার কথা। কিন্তু এরপর নিশ্চিতভাবেই কঠিন চ্যালেঞ্জ সামনে আসবে। তাই মেসিকে ছাড়া কিংবা মেসিকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু তারা কি পারবে? সময়ই হয়তো উত্তর দেবে।
(বিশ্লেষণটি লিখেছেন, ফক্স স্পোর্টসের অ্যানালিস্ট লুইস মিগেল এচেগারাই)
