ট্রাইওন্ডা: ফুটবলে প্রযুক্তির নতুন বিস্ময়
ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ১৩:২৩
ভাবলে এখন অদ্ভুত লাগতে পারে, তবে ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, হাতাহাতি বেধে যাওয়ার উপক্রম। প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড়রা দাবি করে বসেন, তাদের দেশ থেকে আনা চামড়ার বল দিয়েই ম্যাচটি খেলতে হবে। ওদিকে উরুগুয়ে তাদের ঘরের মাঠে খেলতে নামবে। তাদেরও বলের ওপর অধিকার ছিল। তারাও বলে ওসব চলবে না, আমাদের দেশের বল দিয়েই খেলা হবে। শেষ পর্যন্ত ফিফার কর্মকর্তারা রায় দেন এই বলে, ম্যাচের দুই অর্ধে দুই দেশের বল দিয়েই খেলা চলবে।
প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা তাদের নিজেদের বলে দিয়ে খেলে ২-১ এগিয়ে থাকে। দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ে তাদের বল দিয়ে খেলে তিনটি গোল করে বসে। শেষ পর্যন্ত ৪-২ গোলের ব্যবধানে জিতে বিশ্বকাপের প্রথম আসর জিতে নেয়। যে বলের বিতর্ক দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল ছিয়ানব্বই বছর আগে, সেই বল এখন নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ। গায়ে হাই-টেক সব ডিভাইস নিয়ে এবারের বিশ্বকাপের বল ‘ট্রাইওন্ডা’ নিজেই এক বিস্ময়। ইংরেজি ‘ট্রাই’ আর স্প্যানিশের ‘ওন্ডা’ মিলিয়ে এবারের বলের নামকরণ। কাছাকাছি বাংলায় তিন তরঙ্গ বা ঢেউ। আসলে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা আর মেক্সিকো– আয়োজক তিন দেশের ঐক্য বোঝাতেই এই নামকরণ।
তবে অ্যাডিডাসের তৈরি এই বলটি নিয়ে এবার কৌতূহল বেড়েছে ফুটবলারদের মধ্যে। কেননা, এ কেবল চামড়ার কোনো বল নয়, এই ট্রাইওন্ডা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির একটি বল। এটি তৈরি করা হয়েছে মাত্র চারটি থার্মালি বন্ডের প্যানেল দিয়ে। প্যানেলের সংখ্যা কম হওয়ায় বলের ওপরভাগ শতভাগ মসৃণ। এর ফলে বলের গতিপথ নিখুঁত থাকে। দূরপাল্লার শট বা সুইং করার সময় বলটি বাতাসে আকস্মিক দিক পরিবর্তন করবে না। এ ছাড়া বলের জোড়াগুলো অত্যাধুনিক আঠা দিয়ে সিল করায় ভারী বৃষ্টিতেও বলের ওজন বা গতিতে কোনো বদল আসবে না। বলের গায়ে আঁকা লাল, সবুজ আর নীল রং উপস্থাপন করে কানাডার ম্যাপেল লিপ, মেক্সিকোর ঈগল আর যুক্তরাষ্ট্রের তারকা চিহ্নিত বিশেষ আইকন।
তবে ট্রাইওন্ডার আসল বিস্ময় লুকিয়ে আছে তার পেটের ভেতরে। বলের ঠিক কেন্দ্রে বসানো হয়েছে একটি আলট্রা-ওয়াইডব্যান্ড মোশন সেন্সর চিপ। ‘কানেক্টেড বল টেকনোলজি’ নামের এই চিপটি প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ হার্টজ বলের গতির নিখুঁত ডেটা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) রুমে পাঠাবে। একজন ফুটবলার কোন মিলি সেকেন্ডে বলটিতে লাথি মেরেছেন এবং বলের গতিবেগ কত ছিল, তা মুহূর্তের মধ্যে স্ক্রিনে ভেসে উঠবে। ম্যাচে অফ সাইড বা গোললাইন নিয়ে যে বিতর্ক থাকে, তার নিখুঁত সমাধান দেবে এই ট্রাইওন্ডা নামের বলটি।
স্টেডিয়ামের ছাদের নিচে থাকা ১২টি বিশেষ ট্র্যাকিং ক্যামেরা মাঠের ফুটবলারদের শরীরের ২৯টি পয়েন্ট এবং বলের অবস্থান প্রতি সেকেন্ডে ৫০ বার ট্র্যাকিং করবে। বলের ভেতরের এই সেন্সর এবং ক্যামেরার ডেটা বিশ্লেষণ করবে এআই। তাই ফাউলের কোনো নাটক এবার অন্তত চলবে না। বলের মধ্যে থাকা চিপ দিয়ে ম্যাচে কিক পয়েন্টগুলো ঠিক করা যাবে। কোন খেলোয়াড় কোন মুহূর্তে কোন দিক থেকে ফুটবলে লাথি মেরেছেন, তা নিখুঁতভাবে ধরা পড়বে। যে কারণে অফ সাইডের সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে রেফারির। তাই এখন আর কেউ এটা ‘আমার’ বল ওটা ‘তোমার’ বল বলে অধিকার আদায়ের লড়াই করতে পারবে না!
- বিষয় :
- বিশ্বকাপ ফুটবল
