অসমাপ্ত কাব্যের শেষ ছত্রে নেইমার
ছবি- এএফপি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, ডালাস থেকে
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ০৯:৩২
ফুটবল দুনিয়াটা বড় অদ্ভুত, বড্ড নিষ্ঠুর। এখানে সাফল্যের উপাসনা চলে অবিরাম। ডালাসের নিস্তব্ধ রাতে বসে বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রটার দিকে তাকালে কেবলই একটা বৈপরীত্য চোখে পড়ে। একদিকে লিওনেল মেসিকে নিয়ে অন্তহীন তীব্র উচ্ছ্বাস; যেন এক অপরাজেয় রাজত্বের নতুন সম্রাট। অন্যদিকে এই বিশ্বকাপেই একটা নিঃসঙ্গ দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে নেইমার জুনিয়র। মহাকাব্যের নায়ক তো এভাবে আড়ালে হারিয়ে যেতে পারেন না। তাই অসমাপ্ত কাব্যের শেষ ছত্রে নিজের নামটা লিখতে মায়ামিতে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে রাজকীয় প্রত্যাবর্তন করতে যাচ্ছেন নেইমার। দীর্ঘ ২ বছর ৮ মাস; হিসাব কষলে পাক্কা ৯৮০ দিন পর হলুদ-সবুজ ১০ নম্বর জার্সিটা গায়ে গলিয়ে মাঠে নামতে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর হলুদ-সবুজ জার্সিতে মাঠে নামা মানেই এক রাজকীয় অধিকার, যেখানে সমস্ত আলো শুধু তিনিই কেড়ে নেন।
আমেরিকায় আসার আগে তিনি বলে দিয়েছেন, এটিই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। আর তাঁর সেই শেষের বাঁশিতেই যেন প্রথম প্রেমের সুর। যেখানে দেশের হয়ে খেলার জন্য সেই কিশোর নেইমারের ছটফটানি আছে, শুধু শরীরটা বিশ্বাসঘাতকতা না করলে তিনি এখনও আছেন ঠিক আগের মতোই– চেনা সাম্বার ছন্দে। তবে এই নেইমারকে এবার কিছুটা ভিন্ন কৌশলে ব্যবহার করতে চান ব্রাজিলের ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। চোট এবং বয়সের কারণে নেইমারের আগের সেই গতি হয়তো উইংয়ে কার্যকর হবে না, যা আধুনিক ফুটবলে উইঙ্গারদের জন্য জরুরি। কিন্তু তাঁর ক্রিয়েটিভিটি, ভিশন এবং পাসিং সেন্স এখনও বিশ্বসেরা।
তাই স্কটিশদের বিপক্ষে আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার বা ফলস নাইন হিসেবে একদম সেন্ট্রাল পজিশনে (মাঠের মাঝখান দিয়ে) খেলবেন নেইমার, যেখানে তিনি মূলত উইঙ্গার রাফিনিয়ার জায়গায় একাদশে ঢুকতে পারেন। তবে নেইমারকে সরাসরি রাফিনিয়ার মতো রাইট উইংয়ে হয়তো খেলাবেন না তিনি।
সেখানে তরুণ উইঙ্গার রায়ান বা অন্য কাউকে ডানদিকের উইংয়ে নামাতে পারেন। আর মাঝমাঠের সেন্ট্রাল পজিশনে থাকা লুকাস পাকেতাকে কিছুটা নিচে নামিয়ে বা পজিশন অদল-বদল করে নেইমারকে একদম মূল ‘প্লেমেকার’ বা আক্রমণভাগের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার পজিশনে খেলাতে পারেন আনচেলত্তি। সেদিন হাইতির বিপক্ষে জয়ের পর নেইমারের একাদশে থাকাটা নিশ্চিত করলেও তাঁর পজিশন নিয়ে রহস্যটা রেখেই দিয়েছেন। অবশ্য এটিই তো স্বাভাবিক। মিডিয়ার কাছে কেনই বা তিনি ম্যাচের কৌশল বলতে যাবেন।
তবে আনচেলত্তির মুখে যতবার নেইমারের নামটি এসেছে, ততবারই তিনি বোঝাতে চেয়েছেন– নেইমার হচ্ছেন তাঁর দলের মেন্টর। দলের সঙ্গে তাঁর থাকাটাই অনেক কিছু। সত্যিই বোধ হয় তাই। দেশের হয়ে সর্বাধিক ৭৯ গোলের নায়কের উপস্থিতিই বদলে দেয় ব্রাজিলের রূপ। মরক্কোর সঙ্গে প্রথম ম্যাচটিতেই পরিষ্কার হয়ে গেছে, শেষ দিকে প্রতিপক্ষের ডি-বক্সের মধ্যে শ্রমিক নয়, একজন শিল্পীর দরকার। আর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে এই ম্যাচে ব্রাজিলের লক্ষ্যও বেশ স্পষ্ট, গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে যত বেশি পারো গোল দাও। মরক্কোর চেয়ে গোলের ব্যবধানে এগিয়ে থাকো।
ব্রাজিলীয় ফুটবলের ইতিহাসে নেইমার আসলে একটা অসমাপ্ত উপন্যাসের মতো। পেলে তিনবার জিতেছেন, রোমারিও-রোনালদোরা নিজেদের অমর করে গেছেন। নেইমার? তিনি তো শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ প্রতিভাদের একজন হয়েও ডাগআউট আর হাসপাতালের বেডেই বেশি কাটিয়ে দিলেন। ২০১৪– ঘরের মাঠে পিঠের চোট, ২০১৮– বেলজিয়াম ধাক্কা আর ২০২২– ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে সেই অতিমানবীয় গোলের পরও টাইব্রেকারের সেই ক্রূর নিয়তি; নেইমার মানেই তো এক অপার মুগ্ধতা এবং তার ঠিক পরমুহূর্তেই একরাশ বিষাদসিন্ধু। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো কিংবা রাফিনিয়ারা যতই ইউরোপ কাঁপানো ফুটবল খেলুন না কেন, সেলেসাওদের ওই হলুদ জার্সির ১০ নম্বরটার ওজনই আলাদা। ওই জার্সিটা পরলে পেলের আত্মা যেন ভর করে মাঠে। নেইমার সেই আত্মার শেষ প্রতিনিধি, যাঁর পায়ে জোগো বোনিতোর শেষ জাদুটা বেঁচে আছে।
প্রতিপক্ষ স্কটল্যান্ড। মাঠের লড়াইয়ে তারা হয়তো ব্রাজিলের টেকনিকের কাছে চ্যালেঞ্জিং না। রেকর্ড বলছে, হেড-টু-হেড লড়াইয়ে ব্রাজিল যেন স্কটল্যান্ডের কাছে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। এ পর্যন্ত দুই দলের ১০ বারের দেখায় আটবারই জিতেছে সেলেসাওরা, বাকি দুটি ম্যাচ হয়েছে ড্র। অর্থাৎ, ফুটবল ইতিহাসে ব্রাজিলের বিপক্ষে এখনও কোনো জয়ের মুখ দেখেনি স্কটল্যান্ড। কিন্তু তাদের শারীরিক ফুটবল আর নিখুঁত রক্ষণভাগ যে কোনো বড় দলের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিশেষ করে নেইমার যখন সদ্য চোট থেকে ফিরছেন, তখন স্কটিশ ডিফেন্ডারদের কড়া ট্যাকল তাঁর জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে, সেই প্রশ্নও থাকছে। কিন্তু ব্রাজিলিয়ান ড্রেসিংরুমের খবর, নেইমার এবার কোনো হিসাব কষে খেলছেন না। এটি তাঁর চতুর্থ এবং শেষ বিশ্বকাপ। হারানোর কিছু নেই, পাওয়ার আছে শুধু সেই অধরা সোনার ট্রফি। তিনি কি পারবেন মারাকানার সেই ট্র্যাজিক রাজপুত্রের তকমাটা মুছে এবারের আসরে সাম্বার বিজয়কেতন ওড়াতে? নাকি ফুটবল দেবতা আরও একবার নিষ্ঠুরভাবে হাসবেন? উত্তরটা দেবে সময়।
- বিষয় :
- নেইমার
- ব্রাজিল
- বিশ্বকাপ ফুটবল
