ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

উরুগুয়ের বিদায়ে বিয়েলসার ‘গ্রেগেনপ্রেসিং’ তত্ত্বের মৃত্যু

উরুগুয়ের বিদায়ে বিয়েলসার ‘গ্রেগেনপ্রেসিং’ তত্ত্বের মৃত্যু
×

সুমন মেহেদী

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৩

দীর্ঘ, সুদীর্ঘ কোচিং ক্যারিয়ার মার্সেলো বিয়েলসার। ৭০ বছরের জীবনের ৪০ বছরই ডাগ আউটে কাটিয়েছেন আর্জেন্টাইন টেকনিশিয়ান। দায়িত্ব পালন করেছেন বড় বড় জায়গায়। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ডাগ আউটে ছিলেন ১৯৯৮-২০০৪ পর্যন্ত। চিলির দায়িত্ব সামলেছেন ২০০৭-২০১১ পর্যন্ত। উরুগুয়ের কোচ হিসেবে তিন বছর কাজ করলেন। 

ফুটবল ক্যারিয়ার পাঁচ বছরের সমাপ্ত হলেও কোচ বিয়েলসার ক্লাবে চাকরির ক্যারিয়ারও সমৃদ্ধ। আর্জেন্টিনার নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজ, স্পেনের অ্যাথলেটিকো বিলবাও, ফ্রান্সের মার্সেই ও লিলি, ইতালির ল্যাজিও এবং ইংল্যান্ডের লিডস ইউনাইটেডে কাজ করেছেন তিনি। 

বিশ্বকাপে স্পেন, সৌদি আরব ও নবাগত কেপ ভার্দের গ্রুপ থেকে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করতে পারেনি উরুগুয়ে। শেষ করেছে গ্রুপের চতুর্থ দল হিসেবে। উরুগুয়ের বিদায়ের পর সংবাদ সম্মেলনে তাকে বলতে হলো, ‘পেছনে ফিরে তাকালে, উরুগুয়ের ফুটবলে কিছুই রেখে যেতে পারি নি।’ 

দীর্ঘ ৪০ বছরের ক্যারিয়ারেই বা বিয়েলসার অর্জন কতটুকু! আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকার রানার্স আপ করা, অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদকে কোপা দেল রে’র রানার্স আপ করা ও উয়েফা ইউরোপা লিগের রানার্স আপ করা; এই তো। লিডসকে তিনি প্রিমিয়ার লিগে ফিরিয়ে ছিলেন। সেখানে রাফিনিয়া-কেলভিন ফিলিপসদের নিয়ে ভালো কাজ করেছিলেন। যে কারণে উরুগুয়ে তাকে কোচের পদে চাকরি দিয়েছিল। 

কিন্তু উরুগুয়ে ফেডারেশন বিয়েলসার একগুয়ে, কঠোর গ্রেগেনপ্রেসিং ফুটবল তত্ত্বে অনড় থাকার স্বভাব, সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা বিশ্বকাপের গরমের সঙ্গে গ্রেগেনপ্রেসিংয়ের কার্যকারিতা নিয়ে ভেবেছিল কিনা হলফ করে বলা দুষ্কর। বিয়েলসাও হয়ত অতটা মাথা ঘামাননি। কারণ উরুগুয়ে দলে তার সিস্টেম কাজে লাগছিল। 

কনমেবল অঞ্চলের দলগুলোর সঙ্গে বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব খেলে চারে শেষ করেছিল উরুগুয়ে। দুই বছর আগের কোপা আমেরিকায় তৃতীয় সেরা হয়েছিল। লাতিনের দলটিতে বেশ ক’জন ফিজিক্যাল ফুটবলার ছিলেন। ফেদে ভালভার্দে, ম্যানুয়েল উগার্তে, রোনাল্ড আরাহো, ডারউইন নুনিয়েজ তাদের অন্যতম। তিনি ভেবেছিলেন তার অতি মাত্রায় প্রেসিং, বলের দখল নেওয়ার জন্য মরিয়া ফুটবল কাজে দেবে। আর উরুগুইয়ানরা ভেনেছিলেন- উরুগুয়ে ফুটবলে সুদিন ফিরবে।

কিন্তু গ্রুপ পর্বে এমন দলের বিপক্ষে তাদের খেলতে হয়েছে, যেখানে গেগেনপ্রেসিং কার্যত অকার্যকর। প্রথমবার বিশ্বকাপে আসা কেপ ভার্দে চূড়ান্ত রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলবে, এটা জানা কথা। তাই বলে কেপ ভার্দের দীর্ঘদেহি ফুটবলাররা লো ব্লকের সঙ্গে দারুণভাবে মানিয়ে নিতে শিখে চমক দেবে, এমনটা ভাবেননি অনেকে। গেগেনপ্রেসিং সিস্টেমের দুর্বলতা ঠিক এখানে। লো ব্লকে জাল খুঁজে পাওয়ার বুদ্ধি বের করতে না পারা।  

উরুগুয়ের অপর প্রতিপক্ষ ছিল স্পেন। তারা বছরের পর বছর ধরে বল পজিশনাল ফুটবল খেলে। স্পেন একের পর এক বল ব্যাক পাস দেবে, মাঝমাঠে উঠে আবার নিচে ফিরে যাবে। এমনকি গোল মুখে সুবিধা করতে না পারলে লম্বা করে এক পাসে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারের কাছে পাঠিয়ে দেবে, কিন্তু বলের দখল হারাতে চাইবে না। গেগেনপ্রেসিং এখানেও অকার্যকর। বিয়েলসার সিস্টেম তাই কাজেই লাগেনি। তারওপর গোলরক্ষকের ভুলে গোল হজম করেছে।  

সৌদির বিপক্ষে গেগেনপ্রেসিং তত্ত্ব কিছুটা কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারাও লো ব্লকের চেষ্টা করেছে। কেপ ভার্দে ও সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচ খেলে উরুগুয়ের ফুটবলাররা এতোটাই ক্লান্ত ছিল যে, স্পেনের বিপক্ষে পুরোটা দিয়ে খেলার পর্যায়ে ছিলেন না। ফেদে ভালভার্দের মতো প্রচণ্ড ফিজিক্যাল ও প্রাণশক্তিতে ভরপুর মিডফিল্ডারকে বিয়েলসার বদলি করতে হয়েছে। কারণ হিসেবে কোচ বলেছেন, আক্রমণের ধার বাড়াতে মাঠে নতুন শক্তি যোগ করতে চেয়েছিলেন। 

বিশ্বকাপের অতি গরমে বিয়েলসার এই একরোখা, অতি শারীরিক ফুটবলে অতিষ্ঠ হয়ে স্পেন ম্যাচের আগে উরুগুয়ের ফুটবলাররা রীতিমতো ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। ইএসপিএন দাবি করেছিল, ভালভার্দে, বেনটাকুররা গেগেনপ্রেসিং সিস্টেম নিয়ে কোচের সামনেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিয়েলসা রেডিও স্টেশন খুলে বসেছেন, জুড়ে দিলে চলতেই থাকবে; এমন মন্তব্য নাকি করেছিলেন। বিয়েলসার অতি শারীরিক ফুটবলে পরাস্ত হয়ে লুইস সুয়ারেজ অবসর নিয়েছিলেন। দলের পরিবেশ বিষাক্ত করে তুলছেন বিয়েলসা, এমন অভিযোগ করেছিলেন। 

শেষ পর্যন্ত বিয়েলসার সিস্টেম ভুল ছিল। প্রমাণ হয়ে গেল যে, উরুগুয়ে ভুল সিস্টেমে ভুলে যাওয়ার মতো আরেকটি বিশ্বকাপ পার করল। উরুগুয়ের এই ব্যর্থতায় ৭০ বছরের বিয়েলসার কোচিং ক্যারিয়ার শেষ কিনা। তার একরোখা গেগেনপ্রেসিং সিস্টেমের মৃত্যু কিনা এই প্রশ্ন তাই তোলাই যায়।

ম্যাচ শেষে অবশ্য উরুগুয়ের ব্যর্থতার দায় ঘাড়ে নিয়েছেন আর্জেন্টাইন কোচ বিয়েলসা। কিন্তু তা উরুগুইয়ানদের ক্ষতে কী আর প্রলেপ হবে, ‘আমাদের সাত পয়েন্ট পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। সাংবাদিক, ভক্ত যাদের যত হতাশা আছে, সব কিছুর দায় আমার। আমাকে এটা মাথা পেতে নিতে হবে। আমি উরুগুয়ের ফুটবলারদের পুরোটা বের করে আনতে পারিনি। তিন বছর কাজ করে, ফলাফল আনতে না পারলে যেকোন কোচের অবদান মূল্যহীন। যে ফল হয়েছে, তাতে ব্যাখ্যা কেই বা শুনবে।’

আরও পড়ুন

×