এই জার্মানি যখন খাদে পড়ে তখন বিদায় নিতে জানে
সমর্থকের চোখে
খাদের কিনার থেকে ঘুরে দাঁড়াতে না পারা জার্মানির প্রতিরূপ যেন এই ছবি। এএফপি
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ২১:৩৭ | আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬ | ২১:৫৭
হৃদয়ভাঙার যেখানে শুরু, সেই দিনগুলো পড়ে আছে রাশিয়ায়। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই মেক্সিকোর বিপক্ষে হেরে খাদের কিনারে পড়েছিলেন টমাস মুলার, মেসুত ওজিলরা। আসরে টিকে থাকার চেষ্টায় যখন একজন নায়কের খুব প্রয়োজন- তখন দ্বিতীয় ম্যাচে ত্রাতা হয়েছিলেন টনি ক্রুজ।
সেই দৃশ্যটা আরেকবার মনে করা যাক। সুইডেনের বিপক্ষে ১-১ সমতার ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ের শেষ মিনিটে। পেনাল্টি এরিয়ার বাইরে থেকে শট নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ক্রুজ। সাইডলাইনে পাহাড়সম চাপ নিয়ে পায়চারি করছিলেন কোচ জোয়াকিম লো। এর ঠিক কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ক্রুজের পা থেকে বল জড়ায় সুইডেনের জালে। সেই সময় ব্রিটিশ ধারাভাষ্যকার জন রডারের বলা একটি বাক্য এখনো কানে বাজে- ‘হোয়েন দে আর ডাউন, হোয়েন দে আর টেস্টেড, দে ফাইন্ড আ ওয়ে টু উইন’।
রোজকার জীবনে হেরে যাওয়ার নানা মুহূর্তে, ওজিল কিংবা ক্রুজদের সেই দৃঢ় মানসিকতার জার্মানি; পরের দিনগুলোতেও কায়দা করে টিকে থাকার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। দলটিকে সমর্থন দেওয়ার এটাই অন্যতম কারণ। কিন্তু কাই হাভার্টজ, ফ্লোরিয়ান ভির্টজ, জামাল মুসিয়ালাদের জার্মানি আর কতদিন হতাশা উপহার দেবে?

প্যারাগুয়ের বিপক্ষে হারের পর অধিনায়ক জশুয়া কিমিচ বলেছেন, ‘ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি- জার্মানি সবসময় সেমিফাইনাল বা ফাইনালে খেলত। আমরা বর্তমান প্রজন্মকেও সেই আনন্দ উপহার দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি। এমন একটা সময়ে আমরা ব্যর্থ হয়েছি, যখন সমর্থকদের গর্ব করার মতো উপলক্ষ্য পাওয়াটা খুবই প্রয়োজন।’
সমর্থকদের সান্ত্বনা দিতে কিমিচ বেশ গুছিয়ে কথাগুলো বলেছেন। কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্সে তাঁর দল দেখিয়েছে, অগোছালো এক জার্মানিকে। যারা ২০১৮ ও ২০২২ সালের গ্রুপ পর্বের ক্ষতের পর, এবার নকআউটের শুরুতেই বিদায় নিয়ে বিশ্বমঞ্চে ব্যর্থতার ষোলকলা পূর্ণ করেছে। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ১২০ মিনিটে সাড়ে সাত’শর বেশি পাস আর গোলের সন্ধানে ২১টি শট খেলেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা কেবলই কাগুজে আধিপত্য হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
গ্রুপ পর্বে ১০ গোল করা একটি দল নকআউটের দুই ঘণ্টায় গোল করেছে মাত্র একটি। ভিএআর যাচাইয়ে বাতিল হয়েছে অতিরিক্ত সময়ে করা জোনাথন তা’র একটি গোল। সেই গোল কিছু সময়ের জন্য হলেও একদিকে যেমন আশার সঞ্চার করেছিল, তেমনি মানসিকভাবে ফিরিয়ে নিয়ে যায়- ইতিহাসের দারুণ সব উদাহরণে। যেখানে খাদ থেকে উঠে শিরোপা জেতার (১৯৫৪ ও ৭৪) নজির আছে।

কিন্তু সেসব পুরোনো গল্প এই সময়ে এসে যেন আর খাটছে না। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে অতিরিক্ত আধা ঘণ্টায় ঘুরে দাঁড়াতে তো পারেইনি বরং ব্যর্থতার নতুন নজির স্থাপন করেছে পেনাল্টি শুটআউটে। জার্মানির ফুটবল ইতিহাসে পেনাল্টি শুটআউটকে সবসময় বড় শক্তির জায়গা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ১৯৮২ সালের পর থেকে বিশ্বকাপে কোনো জার্মান ফুটবলার পেনাল্টি মিস করেননি। কিন্তু সোমবার রাতে ৪৪ বছরের সেই গৌরব ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন হাভার্টজ, জোনাথন তা ও নিক ভোল্টেমাদরা।
টানা তিনটি বিশ্বকাপে জার্মানির এই করুণ বিদায় প্রমাণ করে, কেবল বল পজিশন আর শত শত পাস দিয়ে আধুনিক ফুটবলে ম্যাচ জেতা সম্ভব নয়। আক্রমণভাগে একজন দক্ষ ফিনিশারের অভাব এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপ সামলাতে না পারার ব্যর্থতাই জার্মানিকে বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তি থেকে সাধারণ একটি দলে পরিণত করছে। কোচ ইউলিয়ান নাগেলসম্যান নিজেও তা স্বীকার করেছেন। বলেছেন, ‘আমরা আর শীর্ষ দল নই।’
নাগেলসম্যানের মতো ম্যানুয়েল নয়্যারও ২০১৮ সালে ব্যর্থতা মাথা পেতে নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তারা ব্যর্থ হয়েছেন। কোনো অজুহাত নেই। সেই সঙ্গে আকুতি ছিল, ‘দয়া করে একটু সময় দিন।’ সেই সময়ের আট বছর কেটে গেছে। অবসর ভেঙে ফিরে নয়্যার সোমবার আবার অবসর নিয়েছেন। এবার হয়তো নতুন করে ফেরার ঘোষণা দেবেন না।

নতুন প্রজন্মের যাদের মধ্যে সম্ভাবনাময়ী বিবেচনা করা হয় সেই হাভার্টজও বিদায় প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আমাদের জন্য শক (স্তব্ধ) শব্দটাই হয়তো সবচেয়ে উপযুক্ত।’ নাগেলসম্যান ও হাভার্টজ যেভাবে মাঠে ও কথার খেলায় নিজেদের শীর্ষ থেকে ছোট দল বানালেন, সেটাই কি এই জার্মানির ‘নিউ নরমাল’ মানসিকতা?
যে দলটির একসময় শেষ মুহূর্তেও টিকে থাকার ঐতিহ্য ছিল, তারাই তিন আসর ধরে বিদায় নেওয়ার দৌড়ে বড় দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে। সোনালী যুগের স্মৃতি যাদের মনে আছে, তাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও- ব্যর্থতা আর ‘বিদায়’ই হয়তো জার্মানির নতুন পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠছে।
- বিষয় :
- জার্মানি
- ফুটবল বিশ্বকাপ-২০২৬
- পেনাল্টি
- ফুটবল
