ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

শেষ হাসিতে আর্জেন্টিনা, গৌরবে কেপ ভার্দে

শেষ হাসিতে আর্জেন্টিনা, গৌরবে কেপ ভার্দে
×

ছবি- এএফপি

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, মায়ামি থেকে

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৮

আর্জেন্টিনা জিতল, নাকি জীবনানন্দ দাশের সেই ‘আলো-অন্ধকারে যাই’ এসে ভর করল মায়ামির হার্ডরক স্টেডিয়ামে? মিডিয়া ট্রিবিউনের চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে এই প্রশ্নটাই মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল। জায়ান্ট স্ক্রিনে ৩-২ ফলটা জ্বলজ্বল করছিল বটে, তবে সেটি ছিল এক মস্ত বড় ফাঁকি। এই ম্যাচ কোনো পরিসংখ্যানের খাঁচায় বন্দি হওয়ার নয়! শেষ বাঁশি বাজার পর যখন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ মাটিতে গা এলিয়ে দিলেন, তখন বোঝা গেল বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বুক থেকে কত বড় একটা পাথর নেমেছে। আর মাঠের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে যখন করতালির জবাব দিচ্ছে কেপ ভার্দে, তখন মনে হচ্ছিল– ফুটবলে মাঝেমধ্যে হেরে গিয়েও বোধ হয় রাজা হওয়া যায়! মায়ামির রাত কোনো সাধারণ ফুটবল ম্যাচ দেখেনি; দেখেছে এক মহাকাব্যিক ট্যাকটিক্যাল থ্রিলার। যেখানে শেষ পর্যন্ত ত্রাতা সেই লিওনেল মেসিই। তাঁর রেকর্ড গোল এবং অ্যাসিস্টেই মায়ামির এই অগ্নিকুণ্ড থেকে আর্জেন্টিনা কোনোমতে প্রাণ হাতে নিয়ে ফিরেছে। কিন্তু সামনে যে ওত পেতে বসে আছে অন্য এক আফ্রিকান ফারাও! শেষ ষোলোর সালাহর মিসর। যারা কাউন্টার অ্যাটাকের গতি আর ট্যাকটিক্যাল নিষ্ঠুরতায় কেপ ভার্দের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি ভয়ংকর। তাই সাধু সাবধান!

ম্যাচের শুরুটা ছিল লিওনেল মেসির পায়ে চেনা সুরের আলপনা। ২৯ মিনিটে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের ওই ৪২ মিটারের দীর্ঘ পাস যখন আকাশ চিরে বক্সে নামল, ৩৯ বছরের লিওনেল মেসি তখন যেন ২০ বছর আগের এক ক্ষ্যাপাটে তরুণ। বাঁ-পায়ের সেই চেনা, মায়াবী ও চোখ-ধাঁধানো ফিনিশে বল যখন জালে জড়াল, মায়ামির হার্ডরক স্টেডিয়ামে তখন স্রেফ আবেগের বিস্ফোরণ। ওই একটি গোলেই খেরোখাতায় ইতিহাস নতুন করে লিখলেন। বিশ্বকাপে এটি তাঁর রেকর্ড ২০তম ক্যারিয়ার গোল; টপকে গেলেন পেলের নকআউটের অবদানকে, ছুঁয়ে ফেললেন এক আসরে দু-দুবার ৭ গোল করার অবিশ্বাস্য বিশ্বকীর্তি। শুধু কী তাই? বিশ্বকাপে এই নিয়ে টানা আট ম্যাচে গোল করার যে একক রাজকীয় রেকর্ড গড়লেন, তা আর কারও নেই। মাঠজুড়ে প্রতিপক্ষের বুট আর ট্যাকল হজম করেও যেভাবে পুরো ১২০ মিনিট খেললেন, সাতটি শট নিলেন আর শেষ গোলটার আবহ তৈরি করলেন, তা দেখার পর বলতেই হয়– বয়স কেবল তাঁর পাসপোর্টেই বেড়েছে, ফুটবলীয় মস্তিষ্কের ধার আজও সেই আদি ও অকৃত্রিম ঈশ্বরের মতোই ধারালো।

কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে সেই চেনা সুর কেটে গেল এক অচেনা আফ্রিকান টর্নেডোতে। অতলান্তিকের ঢেউয়ের মতো আর্জেন্টাইন বক্সে আছড়ে পড়তে লাগল কেপ ভার্দের আক্রমণ। স্কালোনির সাধের রক্ষণভাগকে স্রেফ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক কামড় বসাল সেই ‘নীল হাঙররা’। ম্যাচের ৫৬ মিনিটে যখন সিডনি লোপেস কাবরাল এক লহমায় স্কালোনির রক্ষণকে ফালাফালা করে বল জালে জড়ালেন, গ্যালারির ৪৭ মিলিয়ন নীল-সাদা বুক তখন একসঙ্গে কেঁপে উঠেছিল। স্কোরবোর্ডে তখন ১-১! আর্জেন্টিনা যখন এনজোর গোলে আবার ২-১ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে, ঠিক তখনই নাটকের আসল অঙ্কটা সাজালেন গ্যারি রদ্রিগেজ। ৮৩ মিনিটে আর্জেন্টিনার ডিফেন্সের সমস্ত কঙ্কালসার চেহারাটা নগ্ন করে দিয়ে রদ্রিগেজ যখন ২-২ করলেন, স্কালোনি তখন ডাগআউটে দাঁড়িয়ে অস্থির ছটফটে এক নাবিক, যাঁর সাধের নৌকা ঝড়ের মুখে টালমাটাল। শেষ পর্যন্ত সেই মেসির অভিজ্ঞ মস্তিষ্ক আর নিখুঁত পাসেই কোনোমতে ভরাডুবি বাঁচল আর্জেন্টিনার। কিন্তু মায়ামির রাতজুড়ে অমর হয়ে রইল কেপ ভার্দের গৌরবের স্পর্ধিত ইতিহাস।

লিওনেল মেসি মাঠ ছাড়ার সময় হাসছিলেন বটে, কিন্তু সেই হাসিতে স্বস্তির চেয়েও যেন অনেক বেশি ছিল বিস্ময়। ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসেও যে মায়ামির চেনা মাঠে এভাবে রক্তচাপের চরম পরীক্ষা দিতে হবে, তা বোধ হয় খোদ এলএমটেনেরও চিত্রনাট্যে ছিল না। কাগজে-কলমে ফেভারিট কে ছিল, সেই বিতর্ক ম্যাচ শুরুর ১৫ মিনিটেই ডাস্টবিনে পাঠিয়ে দিয়েছিল কেপ ভার্দে। মাঠের ট্যাকটিক্যাল ব্যাটেলে ব্লু শার্কসরা যেভাবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রক্ষণকে এক্সপোজ করে দিল, তা দীর্ঘ সময় স্কালোনিকে ল্যাপটপ স্ক্রিনের সামনে বসে স্ক্রাব করে দেখতে হবে। ম্যাচের প্রথমার্ধে লিওনেল মেসির সেই চেনা হাফ-স্পেস ড্রাইভ আর গোল দেখে যারা ভেবেছিলেন ম্যাচটা ওয়ান-ওয়ে ট্রাফিক হতে যাচ্ছে, তারা কেপ ভার্দের হাই-প্রেসিং আর কাউন্টার অ্যাটাকিং ফুটবলের ধারটা টের পাননি। দ্বিতীয়ার্ধে স্কালোনির ৪-৩-৩ ফরমেশনের মিডফিল্ড ট্রানজিশনকে পুরোপুরি অচল করে দেয় নীল হাঙররা।

তবে এক বিরাট ফাঁড়া কাটার অলৌকিক স্বস্তি আর্জেন্টিনার মধ্যে। ‘আমরা জানতাম, এটি কঠিন হতে যাচ্ছে। এটি একটি নকআউট টুর্নামেন্ট, এখানে কেউ আপনাকে কোনো কিছু সহজে দেবে না। প্রতিটি খেলাই কঠিন হবে।’ মেসির মুখেও কেপ ভার্দেকে নিয়ে প্রশংসা ঝরে পড়ে মিক্সড জোনে। ‘স্পেন কিংবা উরুগুয়ের মতো দলের বিপক্ষে কেপ ভার্দে যে অপরাজিত ছিল, সেটি স্রেফ কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না।’ একই সুর ছিল আর্জেন্টিনা কোচ স্কালোনির মধ্যেও। ‘ফুটবলে আসলে কোনো সহজ প্রতিপক্ষ বলে কিছু নেই। কেপ ভার্দেকে অনেক অভিনন্দন। যখন মানুষ বলে কোনো প্রতিপক্ষই সহজ নয়, আজ কেপ ভার্দে প্রমাণ করল যে তারা সত্যিই একটা দারুণ দল।’ ফুটবল তো শুধু আলমারিতে সাজিয়ে রাখা কোনো চকচকে রুপার পাত্র নয়; ফুটবল হলো কোটি মানুষের বুকে কাঁপন ধরানোর, স্বপ্ন দেখানোর এক অলৌকিক জ্বালানি। মায়ামির হার্ডরক স্টেডিয়ামে ব্লু শার্কসরা আজ ট্রফি না ছুঁয়েও যা অর্জন করল, তা বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক বড় বড় পরাশক্তিও পারেনি। আসলে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে এসেই যেভাবে দাগ কাটল কেপ ভার্দে, তাতেই ট্রফি জেতা হয়ে গেছে তাদের।

আরও পড়ুন

×