ভালোবাসার দায় মেটানোর পালা ব্রাজিলের
ছবি- এএফপি
সেকান্দার আলী
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:০১
বিশ্বকাপের বাঁশি বাজার মাহেন্দ্রক্ষণ থেকেই ব্রাজিলের ফুটবলের শাসন জারি হয়েছে বিশ্বজুড়ে! মেরু থেকে মরু– সব খানেই ওড়ে ব্রাজিলের পতাকা। প্রেমের শাসন জারি হয়েছে ‘এক দেশ এক বিশ্ব’ স্লোগানে। এক পতাকার নিচে বিশাল বৈশ্বিক সংখ্যার শামিল হওয়া ব্রাজিলের সুন্দর ফুটবলের প্রেম। এই ভালোবাসার দায় মেটানোর পালা নেইমার-ভিনিসিয়ুসদের কাঁধে। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে প্রতিশ্রুত সে দায়বদ্ধতা একটু একটু করে পালন করছেন তারা। গ্রুপসেরা হয়ে শেষ ৩২-এ। সেখান থেকে শেষ ষোলোয় উন্নীত হওয়া। এখন স্বপ্ন কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটা। বাংলাদেশ সময় আজ গভীর রাতে নরওয়েকে হারাতে পারলেই গাঢ় হবে প্রেম। সমর্থকদের মুখে মুখে রটা প্রেম গাঢ় করতে মরিয়া ব্রাজিল। জয়ের চিত্রনাট্য লিখতে কোচ কার্লো আনচেলত্তির ছক সাজানো। নিউইয়র্কের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ব্রুনোদের সুন্দর ফুটবলের ছন্দে সাম্বার ঢেউ দেখার অপেক্ষা।
কিছুদিন আগেও যারা ব্রাজিলের পক্ষে বাজি ধরার সহস দেখাতেন না, তাদের বুকেই সাহসের পাহাড় তুলে দিয়েছে গত চার ম্যাচের পারফরম্যান্স। ২৪ বছরে পাঁচ বিশ্বকাপে হেক্সার স্বপ্ন চুরি যাওয়া আর নেইমার জুনিয়রদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত পারফরম্যান্স না পাওয়া– হতাশার চোরা স্রোত টেনে নিয়ে গেছে সমর্থকদের। এই বিশ্বকাপে গ্রুপের প্রথম ম্যাচে মরক্কোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র বিশ্বজোড়া ব্রাজিল সমর্থকদের আশার পালে হাওয়া দেয়নি। খুশি ছিলেন না কোচ কার্লো আনচেলত্তিও। তবে ওই ম্যাচ থেকে পাওয়া শিক্ষা দারুণ কাজে দিয়েছে। সমস্যা চিহ্নিত করে বেছে নেওয়া হয়েছে সেরা কম্বিনেশন। ব্রাজিল দলে উন্নতির ছোঁয়া তো তার পর থেকেই। নিয়মিত গোল পেয়েছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও ম্যাথিউ কুনিয়া। মিডফিল্ড গুছিয়ে নিয়েছিলেন ব্রুনো গিমারেস ও লুকাস পাকেতার। রক্ষণ ও আক্রমণে সংযোগটা ভালোই করছিলেন দুজনে। পাকেতার ইনজুরি ভজঘট পাকিয়ে দেয়। নকআউটে জাপানের বিপক্ষে খেলার সময় ঊরুর পেশিতে টান পড়ে তাঁর। আশঙ্কা করা হচ্ছে, বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচে পাওয়া যাবে না তাঁকে। কোচ আনচেলত্তির জন্য খেলোয়াড়দের চোটই এখন বড় প্রতিপক্ষ। চার ম্যাচ হয়ে গেলেও সেরা একাদশ খেলাতে পারেনি এখনও।
চোট কাটিয়ে ফিরলেও নেইমার জুনিয়রকে একাদশে রাখছেন না আনচেলত্তি। ৩৪ বছর বয়সী নেইমার বদলি খেলেন স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ১৪ মিনিট। ক্যারিয়ারের চতুর্থ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ওটুকুই অর্জন তাঁর। না খেলালেও কোচ আনচেলত্তি তাঁকে ডাগআউটে রাখেন ঠিকই। সমর্থকদের চাঙ্গা রাখতে এটি কৌশল হতে পারে। নেইমারকে কেন খেলানো হয়নি– তার ব্যাখ্যা জাপান ম্যাচের পর মিডিয়ায় দিতে হয়েছে কোচকে। আনচেলত্তির পরিকল্পনা ছিল, ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ালে খেলাবেন নেইমারকে। আজ শেষ ষোলোর ম্যাচ; নরওয়ের বিপক্ষে প্রাথমিক একাদশে রাখা হয়নি সেরা খেলোয়াড়টিকে। অ্যালিসন, দানিলো, মার্কিনিওস, গাব্রিয়েল মাগালায়েস, ডগলাস সান্তোস, ব্রুনো গিমারেস, ক্যাসিমিরো, এন্দ্রিক, রায়ান, ম্যাথেউস কুনিয়া, ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে নাকি রাখা হতে পারে শুরুর একাদশে। প্রশ্ন উঠেছে, না খেলালে কেন তাঁর মতো একজন খেলোয়াড়কে ডাগআউটে বয়ে বেড়ানো?
আনচেলত্তি স্রোতে গা ভাসানো কোনো কোচ নন। লোকের কথা শুনে একাদশ সাজাবেন না। যাঁকে দিয়ে দলের লাভ, তাঁকেই খেলাবেন। গত চার ম্যাচে দেখা গেছে সেটাই। এমনও তো হতে পারে, তাড়াহুড়া করে নেইমারকে ঝুঁকিতে ফেলতে চাচ্ছেন না কোচ। বড় ম্যাচের জন্য রিজার্ভে রাখা হয়েছে ‘স্কিল ম্যান’কে। যেদিন সেরা একাদশে থাকবেন, উজাড় করে খেলবেন সেদিন। প্রশ্ন ওঠে, তাহলে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ সময়ে বদলি নামানোর উদ্দেশ্য কি সান্ত্বনা দেওয়া? বিতর্কের আগুন মাটিচাপা দিতেই হয়তো খেলানো। কারণ, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও দ্য সিলভা মজা করে এক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে নেইমারের আপডেট জানাতে গিয়ে শিশুদের বলছেন, “নেইমার বিশ্বকাপে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ ফুটবল খেলছেন (হাসি)।” ওই মন্তব্য ভাইরাল হওয়ার পরই আনচেলত্তি মিডিয়ায় ঘোষণা দেন, গ্রুপের পরের ম্যাচে খেলবেন নেইমার। তিনি খেলেছেন শেষ সময়ে বদলি। বিশ্বকাপ মাঠে গড়ানোর ২৫ দিন চলে। কাফ মাসলের চোট সারতে এতদিন লাগার কথা নয়। অন্য কোনো ইস্যু না থাকলে এখনই নেইমারকে নিয়ে বাজি ধরার উপযুক্ত সময়। নরওয়ের বিপক্ষে শুরুর একাদশে রাখা হলে ভালো কিছু করতেও পারেন তিনি। পাকেতার ইনজুরিতে জায়গা খালি হয়েছে। ফিট থাকলে অভিজ্ঞ নেইমার তরুণ এনড্রিকের চেয়ে যে বেশি কার্যকর হবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি মাঠে থাকলে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের বাড়তি মনোযোগ থাকবে তাঁর ওপর। এ ছাড়া চোটে থাকা উইং রাফিনহাও খেলতে পারছেন না। তিনি রানিং শুরু করলেও ম্যাচ খেলার ব্যাপারটি নিশ্চিত হয়নি বলে জানায় গোল ডটকম। এককথায় চোট-জর্জরিত ব্রাজিলকে টেনে তোলার জন্য এ মুহূর্তে নেইমারের মাঠে থাকা যে খুব প্রয়োজন, আনচেলত্তি তা বুঝতে পারলে রক্ষা হবে সব কূল। কারণ, তারকা ফুটবলারকে ছাড়া নরওয়ের কাছে অঘটনের শিকার হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্রাজিলে না গিয়ে ইতালির বিমান ধরতে হবে।
শেষ ষোলোয় ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ নরওয়ে ভালোই খেলছে বিশ্বকাপে। তারা যে ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরেছে, তা বুঝতে দেননি আর্লিং হালান্ডরা। এই ম্যাচে ব্রাজিলের কাঁটাও গোলমেশিন খ্যাত হালান্ড। সবকিছুতে কম কম হলেও গোল করায় বেশি বেশি তিনি। বাছাইপর্ব থেকে শুরু করে বিশ্বকাপে গোল করা থামেনি তাঁর। উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে চার ম্যাচের তিনটিতে খেলে করেছেন পাঁচ গোল। ব্রাজিলের রক্ষণের বড় দায়িত্ব থাকবে তাঁকে কড়া পাহারায় রাখা। না হলে ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি দীর্ঘকায় সুযোগসন্ধানী হালান্ড গোলপোস্ট খুঁজে নেবেন মোক্ষম সময়ে। নরওয়ের সঙ্গে ব্রাজিলের খুব বেশি ম্যাচ খেলা হয়নি। যে চারটি ম্যাচ খেলেছে এ দুই দেশ, তাতে নরওয়ের সাফল্য ঈর্ষণীয়। ১৯৮৮ সালের প্রীতি ম্যাচ ১-১ গোলে ড্র। ১৯৯৭ সালের প্রীতি ম্যাচে ৪-২ গোলে জয়ী নরওয়ে। তারা ১৯৯৮ সালে বিশ্বকাপ ম্যাচ জিতেছে ২-১ গোলে। শেষ ২০০৬ সালে যে প্রীতি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল দেশ দুটি, সে ম্যাচ ড্র। ব্রাজিল কোচ আনচেলত্তির লক্ষ্য, এই ম্যাচ জিতে পরিসংখ্যানে পরিবর্তন আনা।
- বিষয় :
- ব্রাজিল
- বিশ্বকাপ ফুটবল
