যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়
ছবি- এএফপি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, মায়ামি থেকে
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৩
আশঙ্কাটা মেঘের মতো জমছিল বেশ কিছুদিন ধরেই, কিন্তু মায়ামিতে কেপ ভার্দের সামনে সেটা যে এভাবে চড়া আলোয় হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেবে– তা বোধহয় অতি বড় আর্জেন্টাইন সমর্থকও ভাবেননি। যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই বুঝি ফুটবল-বিধাতা সন্ধ্যা নামিয়ে দেন! বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই একটা চাপা ভয় ছিল আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের নড়বড়ে দুর্বলতা নিয়ে। সেটাই এক্সপোজ করে দিল কেপ ভার্দের ওই ‘ব্লু শার্কস’ বা নীল হাঙরেরা। ওটামেন্ডি-রোমেরোদের যে বিশ্বজয়ী ডিফেন্স নিয়ে একসময় ফুটবলীয় স্তুতি শোনা যেত, আফ্রিকার পুঁচকে ফুটবলাররা গতি আর ড্রিবলিংয়ের চাবুকে সেই দুর্ভেদ্য দেয়ালকে স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে গেল। ৩-২ গোলের একটা জয় হয়তো এসেছে, কিন্তু তা রাজকীয় বিজয়ের নয়; এ যেন টাইটানিকের মতো ডুবতে ডুবতে কোনোমতে লাইফবোটে চড়ে তীরে পৌঁছানোর এক অলৌকিক স্বস্তি।
এখন মিসরের ফারাওদের গ্রাস থেকে বাঁচতে হলে আর্জেন্টিনাকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় নিজেদের ফাঁস হয়ে যাওয়া ভাঙা দুর্গ মেরামত করতে হবে। স্কালোনিকে খুঁজে বের করতে হবে মাঝমাঠ আর ডিফেন্সের মধ্যকার ওই ‘ব্ল্যাক হোল’ বা হাঁ করে থাকা ফাঁকা জায়গাগুলো। পারেদেসকে শুরু থেকে হোল্ডিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলিয়ে ডিফেন্সের সামনে একটা নিরেট দেয়াল তোলা হবে, নাকি ফরমেশন বদলে ৩-৫-২ এর চাণক্য চালে উইং-ব্যাকের হাই-লাইন প্রেসিংয়ের আত্মহত্যা রুখবেন স্কালোনি– সেটাই এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। বুড়ো জাদুকর মেসির জাদুমন্ত্রে প্রতিবার ফাঁড়া কাটানো যায় না; ফারাওদের কামড় রুখতে স্কালোনির রক্ষণভাগ যদি এখনই ইস্পাতকঠিন না হয়, তবে পরের ম্যাচেই কিন্তু নীল-সাদা স্বপ্নের এক নির্মম ও অকাল সমাধি ঘটে যেতে পারে!
নিকোলাস ওটামেন্ডির অভিজ্ঞতা আকাশচুম্বী হলেও কেপ ভার্দের তরুণ, গতিময় ও চটপটে উইঙ্গারদের ড্রিবলিং ও গতির সামনে তিনি বারবার পরাস্ত হচ্ছিলেন। ক্রিস্টিয়ান রোমেরো আগ্রাসী ট্যাকল করতে গিয়ে নিজের পজিশন ছেড়ে উপরে উঠে আসায় সেন্ট্রাল ডিফেন্সের মাঝখানে হাঁ করে থাকা ‘ব্ল্যাক হোল’ বা ফাঁকা জায়গা তৈরি হচ্ছিল, যা কাবরাল ও রদ্রিগেসরা নিখুঁতভাবে এক্সপোজ করেছেন। মাঝমাঠ ও রক্ষণের মধ্যকার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল বারবার। রদ্রিগো ডি পল এবং অ্যাঞ্জো ফার্নান্দেজরা যখন বল পজেশন হারাচ্ছিলেন, তখন প্রতিপক্ষের আক্রমণ সরাসরি ডিফেন্স লাইনের ওপর আছড়ে পড়ছিল। মাঝমাঠ থেকে ডিফেন্সকে ঢাল হিসেবে রক্ষা করার যে চিরন্তন, তা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছিল। পারেদেস ছাড়া ডিফেন্সের সামনে কোনো নিরেট দেয়ালও ছিল না। তবে সবচেয়ে বেশি যা চোখে লেগেছে, তা নিজেদের বক্সের ভেতরই প্যানিকড হয়ে পড়া। কেপ ভার্দে যখনই আর্জেন্টিনার বক্সে ক্রস বা লং বল ফেলছিল, তখনই ডিফেন্ডারদের মধ্যে এক অদ্ভুত প্যানিক বা আতঙ্ক তৈরি হচ্ছিল। প্রথম ক্লিয়ারেন্সের পর যে ‘সেকেন্ড বল’ বা লুজ বল তৈরি হয়, তা বারবার কেপ ভার্দের ফুটবলারদের পায়ে চলে যাচ্ছিল। ডিফেন্ডারদের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাবের কারণেই কেপ ভার্দে ম্যাচে দু-দুবার সমতায় ফেরার সুযোগ পেয়েছে।
এবং এখানেই কেপ ভার্দের ফুটবলারদের শারীরিক উচ্চতার কাছে বারবার মার খেয়ে যাচ্ছিলেন। আফ্রিকান কোনো দলের বিপক্ষে নামার আগে ঠিক এই ভয়টাই পান স্কালোনি। সেটাই কিন্তু চাপে রেখেছিল পুরো দলকে। স্কালোনি রোমেরো আর লিসান্দ্রো মার্টিনেজের ওপরই বাজি ধরেছিলেন, পাশে রেখেছিলেন মলিনা আর অনভিজ্ঞ মেদিনাকে। কিন্তু তাঁর এই সাধের দেয়াল মোটেও ইস্পাতকঠিন ছিল না, ওটা ছিল স্রেফ এক তাসের ঘর! মলিনা-মেদিনারা যখনই একটু ওপরে উঠছিলেন, তাদের পেছনের হাঁ করে থাকা ফাঁকা জায়গাগুলো ধরে তখন হাঙরের মতো কামড় বসিয়েছিল কেপ ভার্দে। তবে ম্যাচের শেষ দিকে এমিলিয়ানো মার্টিনেজের সেই অসাধারণ সেভ মনে করিয়ে দিয়েছিল তিনি আছেন আগের মতোই, বাজপাখি হয়ে শিকার ধরতে। তবে যে রক্ষণভাগ নিয়ে ম্যাচজুড়ে এত আতঙ্ক, এত কাঁপুনি, দিনের শেষে সেই রক্ষণভাগের দুই সেনাপতিই কিন্তু হয়ে উঠছিলেন আর্জেন্টিনার আসল ত্রাতা! লিসান্দ্রো মার্টিনেজ এবং ক্রিস্টিয়ান রোমেরো– স্কালোনির দুই মূল সেন্টার-ব্যাকই শুধু ডিফেন্স সামলাননি, মায়ামির ওই রুদ্ধশ্বাস রাতে প্রতিপক্ষের জালে বল গলিয়ে বুক চিরে বের করে এনেছেন জয়।
মিক্সড জোনে এসে লিসান্দ্রো অত্যন্ত অকপটে বুক চিতিয়ে নিজের ক্ষোভ আর স্বস্তি দুটোই উগরে দিয়েছেন। ‘ডিফেন্ডার হিসেবে আমার একমাত্র লক্ষ্য থাকে ক্লিন শিট রাখা, যাতে দল কোনো গোল হজম না করে। আজ দুটো গোল খাওয়ার পর আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রচণ্ড অসন্তুষ্ট। তবে ভালো লাগছে যে, চরম বিপদের মুখেও এই দলটা কখনও হাল ছেড়ে দেয় না। যখনই আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখনই আমাদের ভেতরের এনার্জি বা শক্তিটা দ্বিগুণ হয়ে যায়। আমি মনে করি, বিশ্বকাপের এটা আমাদের আসল পরীক্ষা নিল।’ সত্যিই তাই। গ্রুপ পর্বে দাপুটের সঙ্গে সব ম্যাচ জিতে আসার পর কেপ ভার্দের কাছেই প্রথমবারের মতো দুর্বলতা ফাঁস। মিক্সড জোনে কেপ ভার্দের ফুটবলারদের সঙ্গে সেলফির আবদার মেটানোর পর তাই মজা করেই বললেন মেসি। ‘ওরা আমার কাছে জার্সি চেয়েছে, সেলফি তুলেছে, জড়িয়ে ধরেছে... সবই করেছে। অথচ মাঠে আমাকেই মেরেছে...।’ বাঘের ভয় (পড়তে পারেন হাঙরের ভয়, কেপ ভার্দকে নীল হাঙরই বলে সবাই) আপাতত কাটানোর স্বস্তির হাসি ছিল তাঁর মুখে।
