ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

চঞ্চল হরিণ বনাম দক্ষ শিকারি

চঞ্চল হরিণ বনাম দক্ষ শিকারি
×

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, মায়ামি থেকে

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৩৮

ডালাসের প্লেয়ার্স টানেলে আজ যখন ওরা পাশাপাশি দাঁড়াবে, তখন ফুটবলবিশ্ব যেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সেই বিখ্যাত উপন্যাসের পাতা ওল্টাবে। ৪১ বছরের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আজ ফুটবলীয় সমুদ্রের সেই নিঃসঙ্গ বুড়ো নাবিক– ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’র সান্তিয়াগো। ক্যারিয়ারের শেষ গোধূলি বেলায় দাঁড়িয়ে থাকা এই অতৃপ্ত জাদুকর জীবনের সবচেয়ে বড় ও শেষ শিকারটি ধরার জন্য সময়ের নিষ্ঠুর স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর নৌকার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এক রুপালি হাঙর, যার নাম লামিনে ইয়ামাল। মাত্র ১৮ বছরের এক কিশোর, সম্পর্কের সমীকরণে যে অনায়াসেই সিআরসেভেনের বড় ছেলের বয়সী হতে পারত, আজ রাতে টেক্সাসের তপ্ত প্রান্তরে সেই ছোকরাই রোনালদোর মহাকাব্যিক স্বপ্নটাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করতে উদ্যত! পর্তুগাল আর স্পেনের এই ‘আইবেরিয়ান ডার্বি’ আসলে সময়ের এক নিষ্ঠুর ও মহাকাব্যিক কোলাজ।

ইতিহাস বলছে, গত বছরই নেশনস লিগের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিলেন তারা, যেখানে টাইব্রেকারের স্নায়ুযুদ্ধে বাজিমাত করেছিলেন এই বুড়ো রাজাই। কিন্তু বিশ্বকাপের এই মঞ্চ সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে এক প্রজন্মের সূর্যাস্ত মানেই অন্য প্রজন্মের সূর্যোদয়। একদিকে দক্ষ শিকারি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, যাঁর কাছে এই বিশ্বকাপ মানেই ক্যারিয়ারের গোধূলি বেলায় দাঁড়িয়ে থাকা। অন্যদিকে চঞ্চল হরিণের মতো এক কিশোর লামিনে ইয়ামাল, যাঁর পায়ে ভোরের আলোর মতো এক রূপকথার প্রথম অভিষেক। ডালাসের এই অগ্নিপরীক্ষায় রোনালদো কি তাঁর সেই অভিজ্ঞতার অহংকার দিয়ে রাজত্ব ধরে রাখবেন, নাকি তারুণ্যের ঔদ্ধত্যে ইয়ামাল কেড়ে নেবেন বুড়ো নাবিকের শেষ স্বপ্ন– তা দেখার জন্য পুরো ফুটবলবিশ্ব আজ চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে।

ইতিহাস বলছে, গত বছরই ২০২৫ সালের উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিলেন তারা। মিউনিখের সেই শ্বাসরুদ্ধকর রাতে টাইব্রেকারের স্নায়ুযুদ্ধে বাজিমাত করেছিলেন বুড়ো রাজা রোনালদোই। আর মাঠ ছাড়ার সময় চোখের কোণে জল জমা ইয়ামালকে পিঠ চাপড়ে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন মহাতারকা। কিন্তু বিশ্বকাপের এই মঞ্চ সম্পূর্ণ আলাদা, এখানে কোনো সান্ত্বনা পুরস্কার নেই। এখানে এক প্রজন্মের সূর্যাস্ত মানেই অন্য প্রজন্মের রাজকীয় সূর্যোদয়। কাগজে-কলমে এই ম্যাচটা হয়তো লুইস দে লা ফুয়েন্তের নিখুঁত স্প্যানিশ পাসের নকশা বনাম রবার্তো মার্তিনেজের পর্তুগিজ শক্তির কোলাজ; কিন্তু ডাগআউটের সেসব স্ট্র্যাটেজি ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাবে যখন বল গড়াবে মাঠে। আসল লড়াইটা তো হবে ওই দুই ডানার বৃত্তে, যেখানে সময়ের দুই প্রান্তের দুই জাদুকরের মধ্যে। স্পেনের রণকৌশলটাই দাঁড়িয়ে আছে ইয়ামালের ওই বিদ্যুৎগতির ড্রিবলিং আর ক্ষুরধার কাট-ইনের ওপর, যা যে কোনো রক্ষণভাগকে এক নিমেষে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে পর্তুগাল মানেই তো সেই চিরন্তন মহিরুহ, বক্সের মধ্যে ওত পেতে থাকা রোনালদোর সেই চিলসদৃশ চোখ; যার একটা হাফ-চান্স মানেই প্রতিপক্ষের জালে নিখুঁত বুলেটের আঘাত।

এবারের বিশ্বকাপে দুজনেই নিজের মতো করে ইতিহাস লিখছেন, কিন্তু সেই লেখার কালিতে রয়েছে দুটো ভিন্ন চরিত্র। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো মানেই তো শেষ মুহূর্তের সেই অমোঘ থ্রিলার। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোলটি করে নকআউটে তাঁর একটা অতৃপ্তি পূরণ করেন। আসরে তাঁর গোল সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩-এ। তিনি এখনও ম্যাচের ৮০ মিনিটজুড়ে বক্সের ভেতর স্রেফ একটা ওত পেতে থাকা অদৃশ্য ছায়া, যাঁর একটা মাত্র ছোঁয়া বা একটা মরণকামড় প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে রক্তশূন্য করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর উল্টোদিকে তাকালে চোখে ধাঁধা লেগে যায়। লামিনে ইয়ামাল যেন এক চঞ্চল, উদ্দাম ঝোড়ো হাওয়া, যাঁকে কোনো ব্যাকরণ দিয়ে বাধা যায় না। এবারের আসরে প্রতি ৯০ মিনিটে গড়ে ১২টি করে ড্রিবলিং– যা ১৯৯৮ সালের নাইজেরিয়ার জে জে ওকোচার পর বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ– দিয়ে তিনি প্রতিপক্ষের ডি-বক্সকে নিজের ছিনিমিনি খেলার উঠোন বানিয়ে ফেলেছেন।

গ্রুপ পর্বে সৌদি আরবের বিপক্ষে স্পেনের হয়ে তিনি একটি মাত্র গোল করেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে অষ্টম সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হিসেবে নিজের নাম লিখিয়েছেন। হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি থেকে পুরোপুরি সেরে ওঠার সুবিধার্থে গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোতে তাঁর খেলার সময় কিছুটা সীমিত রাখা হয়েছিল বটে, তবে নকআউট পর্বের জন্য তিনি সম্পূর্ণ প্রস্তুত। রোনালদো যেখানে খেলছেন নিজের রাজকীয় অভিজ্ঞতার ওজন দিয়ে, সেখানে ইয়ামাল খেলছেন পায়ে বল পাওয়ার এক আদিম ও সহজাত আনন্দ নিয়ে। একজন দাঁড়িয়ে আছেন ইস্পাতকঠিন স্নায়ু আর নিয়তির ওপর ভর করে, অন্যজন ছুটে চলেছেন তারুণ্যের এক অনাবিল ঔদ্ধত্যে।

মাঠের বাইরের যুদ্ধটা কিন্তু এরই মধ্যে ড্রেসিংরুমের দেয়াল ভেঙে সংবাদমাধ্যমের সামনে চলে এসেছে। তবে সেখানে কোনো সস্তা কাদা ছোড়াছুড়ি নেই; আছে এক অদ্ভুত রাজকীয় সৌজন্যবোধ আর মনস্তাত্ত্বিক দাবার চাল। সেদিন অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের পর মিক্সড জোনে পর্তুগালের সঙ্গে সম্ভাব্য ম্যাচ এবং রোনালদো প্রসঙ্গে ইয়ামালের সামনে নিয়ে এসেছিলেন কিছু স্প্যানিশ সাংবাদিক। উত্তরে আঠারোর নম্রতা ধরা পড়েছিল ইয়ামালের মধ্যে, ‘আমরা কাউকে ভয় পাই না, আমরা স্পেন। ক্রিশ্চিয়ানোর বিরুদ্ধে খেলাটা সম্মানের, তবে আমার পুরো ফোকাস ম্যাচ জেতার দিকে।’ আর রোনালদো তো সেই কবেই ইয়ামালকে ‘অসাধারণ’ বলে সার্টিফিকেট দিয়ে রেখেছেন। এবার শুধু দলের পক্ষ থেকে ক্যামেরার সামনে বলে দিলেন, ‘আমরা প্রস্তুত, আমরা স্পেনকে খুব ভালো করেই চিনি। ম্যাচটা হবে সমানে সমানে।’ শেষ পর্যন্ত কে কার অহংকার চূর্ণ করবে, কার মন্তব্য শেষ ফুৎকারে উড়ে যাবে নিয়তির অমোঘ নিয়মে– ডালাসের সবুজগালিচায় আজ রাতেই তার ফয়সালা হবে।

আরও পড়ুন

×