ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

ফিফার কোন নিয়মের গ্যাঁড়াকলে বাঁচল আর্জেন্টিনা?

ফিফার কোন নিয়মের গ্যাঁড়াকলে বাঁচল আর্জেন্টিনা?
×

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ১৩:৩৫ | আপডেট: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ১৪:০০

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ২-০ গোলে এগিয়েও শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে মিসর। মেসিদের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের গল্পে নিশ্চিত হয়েছে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট। যদিও ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে মেসিদের প্রত্যাবর্তন নয়, আলোচনা হচ্ছে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) এবং ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে।

বিশেষ করে ম্যাচের ৫৮ মিনিটে মোস্তফা জিকোর করা গোল বাতিল হওয়ার পর থেকেই ফুটবল বিশ্ব কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। এক পক্ষের দাবি, ভিএআর এখানে প্রযুক্তির সীমা অতিক্রম করেছে। অন্য পক্ষ বলছে, ফিফার ভিএআর প্রটোকল অনুযায়ী এটাই ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত।

আসলে কী হয়েছিল সেই মুহূর্তে? ভিএআর কি সত্যিই আর্জেন্টিনাকে সুবিধা দিয়েছে, নাকি রেফারিরা কেবল লিখিত নিয়মই অনুসরণ করেছেন? ফুটবল বিশ্বের শীর্ষ রেফারিং বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ এবং ফিফার ভিএআর প্রটোকল মিলিয়ে থাকছে পুরো ব্যাখ্যা।

বিতর্কের শুরু: ৫৮ মিনিটে কী হয়েছিল?

ম্যাচের ৫৮ মিনিটে নিজেদের রক্ষণভাগ থেকে পাল্টা আক্রমণে ওঠে মিসর। দ্রুতগতির সেই আক্রমণের শেষ প্রান্তে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে আর্জেন্টিনার জালে বল জড়ান মোস্তফা জিকো। গ্যালারিতে তখন ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার উল্লাসে মেতে ওঠেন মিসরীয় সমর্থকেরা।

কিন্তু গোল উদযাপন বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ভিএআরের পরামর্শে রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে গোলটি বাতিল করেন। কারণ হিসেবে দেখানো হয়, আক্রমণ শুরুর মুহূর্তে মাঝমাঠে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ে বুট দিয়ে চাপ দিয়েছিলেন মিসরের মারওয়ান আতিয়া। সেই ফাউল থেকেই বলের দখল বদল হয়েছিল বলে সিদ্ধান্ত দেন রেফারি।

এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক ও ফক্স স্পোর্টসের বিশ্লেষক রব গ্রিন। তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি গোলপোস্ট থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে ঘটেছে। এত দূরের সামান্য শারীরিক সংস্পর্শের কারণে এত সুন্দর একটি দলগত গোল বাতিল করা ভিএআরের উদ্দেশ্য হতে পারে না। মাঠে রেফারি ঘটনাটি দেখেও খেলা চালিয়ে যেতে দিয়েছিলেন। আমার মতে, এখানে আর্জেন্টিনা ভাগ্যবান।’

একই মত দিয়েছেন সাবেক ফিফা রেফারি ও ফক্স স্পোর্টসের নিয়ম বিশ্লেষক মার্ক ক্ল্যাটেনবার্গ। তার ভাষায়, ‘প্রথমত, আমি এটিকে ফাউলই মনে করি না। দ্বিতীয়ত, ভিএআর এখানে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অনেক পেছনে গিয়ে এমন কিছু খুঁজেছে, যাতে গোলটি বাতিল করা যায়। মাঝমাঠে এতগুলো পাস এবং দীর্ঘ সময় পর হওয়া গোলের সঙ্গে ওই ঘটনাকে যুক্ত করা রেফারিংয়ের একটি দুর্বলতা।’

ফিফার নিয়ম কী বলে?

সমালোচনার বিপরীতে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন ফক্স স্পোর্টসের রেফারিং বিশেষজ্ঞ ড. জো মাখনিক। তার মতে, রেফারি আবেগ দিয়ে নয়, বরং ফিফার অফিসিয়াল ভিএআর প্রটোকল মেনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ম্যাচ শেষে ‘ওয়ার্ল্ড কাপ নাউ’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘ভিএআর প্রটোকলে কোথাও বলা নেই যে ফাউলটি পাঁচ সেকেন্ড আগে বা ৭৫ গজের মধ্যে হতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিপক্ষ নতুন করে বলের দখল না পায় এবং একই ধারাবাহিক আক্রমণ থেকে গোল আসে, ততক্ষণ প্রটোকল অনুযায়ী গোল বাতিল করা সম্ভব।’

রেফারি মাঠে ঘটনাটি দেখেও কেন ফাউল দেননি, এ প্রশ্নের জবাবে মাখনিক বলেন, ‘রেফারির অবস্থান ও দেখার কোণ সবসময় সেরা নাও হতে পারে। ভিএআরের কাজই হলো ভিন্ন কোণ থেকে ঘটনাটি দেখানো। সেখানে স্পষ্ট দেখা গেছে, খেলোয়াড়টি প্রতিপক্ষের পায়ে চাপ দিয়েছেন।’

তাহলে সালাহর পেনাল্টি কেন দেখা হলো না?

মিসরীয় সমর্থকদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, যদি মাঝমাঠের একটি ফাউল দেখতে ভিএআর হস্তক্ষেপ করতে পারে, তাহলে ম্যাচের শেষ দিকে আর্জেন্টিনার বক্সে মোহাম্মদ সালাহকে ফেলে দেওয়ার ঘটনাটি কেন পর্যালোচনা করা হলো না? এর ব্যাখ্যাও দিয়েছেন ফক্স স্পোর্টসের ফুটবল নিয়ম বিশ্লেষক ও সাবেক ফিফা রেফারি মার্ক ক্ল্যাটেনবার্গ।

তার মতে, ‘ডি-বক্সের বাইরে সাধারণ ফাউল এবং পেনাল্টি এরিয়ার ভেতরের ফাউলের ক্ষেত্রে ভিএআরের মানদণ্ড এক নয়। পেনাল্টি দেওয়ার জন্য ভিএআরকে একেবারে স্পষ্ট ভুলের প্রমাণ খুঁজে পেতে হয়।’

ক্ল্যাটেনবার্গের ভাষায়, ‘সালাহ যদি একইভাবে ডি-বক্সের বাইরে ফাউলের শিকার হতেন, তাহলে ভিএআর ফ্রি-কিকের জন্য রেফারিকে ডাকতে পারত। কিন্তু পেনাল্টি দেওয়ার জন্য যে মাত্রার অকাট্য প্রমাণ প্রয়োজন, সেই মানদণ্ডে ঘটনাটি পৌঁছায়নি। তাই ভিএআর হস্তক্ষেপ করেনি।’

সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল, নাকি ভুল?

এখানেই মূল বিতর্ক। ফুটবলের সাবেক খেলোয়াড় ও অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, প্রযুক্তি এখানে ফুটবলের স্বাভাবিক প্রবাহ ও সৌন্দর্যের বিপক্ষে গেছে। অন্যদিকে রেফারিং বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, সিদ্ধান্তটি জনপ্রিয় হোক বা না হোক, লিখিত আইন অনুযায়ী সেটি সঠিক। অর্থাৎ বিতর্কটি মূলত ‘নিয়ম বনাম ফুটবলীয় অনুভূতি’, এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত।

মাঠের আইনকানুন যাই বলুক, আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচের এই বিতর্ক এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে থাকবে।

আরও পড়ুন

×