ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

এমবাপ্পেকে চোখ রাঙানি ইয়ামালের

এমবাপ্পেকে চোখ রাঙানি ইয়ামালের
×

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, কানসাস সিটি থেকে

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২০

লামিনে ইয়ামাল– তাঁর উনিশতম জন্মদিনের কেকটা গেল রাতে কেটেছেন কিনা, ডালাসের টিম হোটেল থেকে সেই খবর এখনও মেলেনি। কিন্তু ফুটবল রোমান্টিকরা বলছেন, আসল কেক কাটা তো বাকি আছে আজ রাতেই! হয়তো ড্রেসিংরুমের চার দেয়ালে মোমবাতি না জ্বালিয়ে আজ সবুজগালিচায় কিলিয়ান এমবাপ্পেদের অহংকারের মোমবাতিটাকেই এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দেবেন তিনি! ফরাসি ডিফেন্সের ব্যূহ ভেদ করে যদি সেই জয়সূচক গোলটি আসে, তবে তার চেয়ে মধুর বার্থডে সেলিব্রেশন আর কীই-বা হতে পারে। মনস্তাত্ত্বিক এক টানাপোড়েন নিয়ে আজকের রণাঙ্গনে নামছেন দুই সাহসী যোদ্ধা। 

একদিকে ফরাসি সম্রাট কিলিয়ান এমবাপ্পে, যাঁর পায়ের গতিতে নেপোলিয়নের সেই বিশ্বজয়ের দুর্দান্ত আগ্রাসন। অন্যদিকে মাত্র উনিশে পা দেওয়া স্প্যানিশ রাজপুত্র লামিনে ইয়ামাল, যাঁর বাঁ পায়ের ড্রিবলিংয়ে লুকিয়ে মধ্যযুগের কিংবদন্তি স্প্যানিশ যোদ্ধা ‘এল সিড’-এর সেই অকুতোভয় মায়াজাল! তাদের এই যুদ্ধ তো কেবল বিশ্বকাপের ফাইনালের টিকিট পাওয়ার নয়; এ আসলে রিয়াল মাদ্রিদের নতুন ‘গ্যালাকটিকো’র বিরুদ্ধে বার্সেলোনার ঘরের ছেলের সেই চিরন্তন, ঐতিহাসিক ‘এল ক্ল্যাসিকো’র বিষাক্ত আবহকে বিশ্বকাপের আসরে টেনে আনা! রোমের কলসিয়ামের গ্ল্যাডিয়েটরদের মতো আজ রাতে একজনই টিকে থাকবেন সিংহাসনে, অন্যজনকে ফিরতে হবে রক্তাক্ত হৃদয়ে। শুধু দেখার অপেক্ষা– সম্রাটের মুকুট অক্ষত থাকে, নাকি রাজপুত্রের রাজ্যাভিষেক ঘটে ডালাসে।

ইতিহাসের কী অদ্ভুত রসায়ন! কিলিয়ান এমবাপ্পে যখন ২০১৮ সালের ১৫ জুলাই মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরছেন, তখন বিশ্ব ফুটবলের এই নতুন বিস্ময় লামিনে ইয়ামাল স্রেফ এক অবোধ শিশু, যাঁর বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর ২ দিন! এক ফরাসি তরুণের সেই বিশ্বজয়ের রাজকীয় উত্থান যখন দূর টেলিভিশন পর্দায় দেখছিল এক কাতালান কিশোর, তখন কে জানত ঠিক আট বছর পর সময়ের চাকা ঘুরে যাবে এমন মহাজাগতিক সমীকরণে? ফরাসি সম্রাটকে চ্যালেঞ্জ জানাতে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন সেই কিশোরই। এই বিশ্বকাপে এমবাপ্পে ছয় ম্যাচে মাঠে নেমে যেন একাই এক বিধ্বংসী সাম্রাজ্য গড়েছেন; প্রতিপক্ষের জালে জড়িয়েছেন ৮টি গোল এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৩টি অ্যাসিস্ট! চিতা বাঘের মতো ফাইনাল থার্ডে ওত পেতে থাকা এই ফরাসি ফরোয়ার্ড সতীর্থদের সঙ্গে পাসের আদান-প্রদান করেছেন মোট ১৭৮টি। 

অন্যদিকে, স্পেনের মাঝমাঠ ও উইংয়ের নতুন নিউক্লিয়াস লামিনে ইয়ামালও ছয় ম্যাচে নেমে নিজের জাত চিনিয়েছেন; ইনজুরি কাটিয়ে যদিও শুরুর ম্যাচগুলোতে পুরোটা সময় তিনি খেলতে পারেননি। তাঁর নামের পাশে শুধুই একটি গোল। গোল সংখ্যায় এমবাপ্পের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও তিকিতাকার আধুনিক বুননে পাসিংয়ের নিপুণতায় তিনি অনেক বেশি সক্রিয়– টুর্নামেন্টে এ পর্যন্ত ইয়ামাল সতীর্থদের লক্ষ্য করে খেলেছেন মোট ১৫৬টি নিখুঁত পাস। সংখ্যাগুলো স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে, একজন যেখানে বক্সের ভেতর গিয়ে সরাসরি রক্তক্ষয়ী ছোবল মারতে ওস্তাদ, অন্যজন সেখানে মাঠজুড়ে নিখুঁত সুতার টানে জাল বুনে প্রতিপক্ষকে শ্বাসরোধ করতে ভালোবাসেন।

সবুজগালিচায় এ দুই মহাতারকার প্রথম চোখাচোখি কোথায় হয়েছিল মনে পড়ে? ইতিহাসের সেই রাজকীয় দলিল বলছে, ২০২৪ সালের ৯ জুলাই মিউনিখের ইউরো সেমিফাইনালে প্রথম মুখোমুখি হয়েছিলেন তারা। সে রাতে কিলিয়ান এমবাপ্পের চোখের সামনেই এক মহাজাগতিক গোল করে ফ্রান্সের বিশ্বজয়ের দম্ভ গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন ১৬ বছরের লামিনে ইয়ামাল। এরপর জল গড়িয়েছে অনেকদূর। এমবাপ্পে পিএসজি ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ায় আন্তর্জাতিক মঞ্চের সেই লড়াই সোজা আছড়ে পড়েছে স্প্যানিশ ‘এল ক্ল্যাসিকো’র বিষাক্ত আঙিনায়। পরিসংখ্যানে চোখ বুলালে যে কেউই চমকে উঠবেন, এক অদ্ভুত ‘ইয়ামাল অভিশাপ’ তাড়া করে বেড়াচ্ছে ফরাসি সম্রাটকে! ক্লাব ও দেশ মিলিয়ে মুখোমুখি হওয়া শেষ ১০টি হাই-ভোল্টেজ মহারণে আটবার শেষ হাসি হেসেছেন ইয়ামাল, যেখানে এমবাপ্পের কপালে জুটেছে মাত্র দুটি সান্ত্বনা জয়। এমনকি গত দুটি মৌসুমে কোপা দেল রে, লা লিগা কিংবা স্প্যানিশ সুপারকাপের মতো নকআউট টুর্নামেন্টগুলোতে এমবাপ্পের রিয়াল মাদ্রিদকে একচ্ছত্রভাবে শাসন করেছে ইয়ামালের বার্সেলোনা। 

ডালাসের এই মেগা-সেমিফাইনালে নামার আগে তাই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধটায় ফরাসি অধিনায়কের চেয়ে স্প্যানিশ কিশোর যে অনেকটা এগিয়ে, তা তো দেয়াল লিখনের মতোই স্পষ্ট! তবে এটিও তো প্রমাণিত, বিশ্বকাপের রণাঙ্গনেই কিলিয়ান এমবাপ্পে এক নির্মম, নিষ্ঠুর কসাই! ২০১৮-এর সেই কাজানে এই এমবাপ্পের গতিতেই চোখের জলে বিশ্বকাপকে বিদায় জানাতে হয়েছিল মেসিকে। এরপর ২০২২-এর কাতার ফাইনালে হ্যাটট্রিক করে মেসিকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যেভাবে খাদের কিনারায় ঝুলিয়ে রেখেছিলেন, তা তো ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমহর্ষক মনস্তাত্ত্বিক অত্যাচার! শুধু কি মেসি? ক্রোয়েশিয়ার সোনালি প্রজন্মের স্বপ্নদ্রষ্টা লুকা মডরিচ থেকে শুরু করে রবার্ট লেভানডভস্কির পোল্যান্ড– সবাইকে এই নকআউটের মঞ্চেই এমবাপ্পের নির্মম বুটের নিচে পিষ্ট হতে হয়েছে। নকআউটের এমবাপ্পে তাই কোনো সাধারণ ফুটবলার নন, তিনি এক নির্মম ট্র্যাজেডির রচয়িতা, যিনি অন্য তারকাদের চোখের জলে নিজের রাজমুকুট ধুয়ে নেন।

আরও পড়ুন

×