অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ‘টেস্ট অভিষেক’ মুশফিকের!
মুশফিকুর রহিম
ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:২৭
২০০৫ সালের মে, লর্ডসে মাত্র ১৮ বছর বয়সী এক কিশোর বাংলাদেশের টেস্ট ক্যাপ মাথায় জড়িয়েছিলেন। তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ দুই দশক। চারশর বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে সেই কিশোর এখন পরিণত এক ক্রিকেটার। শচীন টেন্ডুলকার কিংবা জেমস অ্যান্ডারসনরা যে সময়ে ক্যারিয়ারে পাঁচ-পাঁচবার অস্ট্রেলিয়া সফর করে ফেলেছেন, একই সময়ে বিশ্ব ক্রিকেটের প্রায় সব প্রান্তে সাদা পোশাকে লড়াই করলেও ওশেনিয়া মহাদেশের এই বাউন্সি দ্বীপে টেস্ট খেলার ভাগ্য হয়নি তাঁর। টেস্ট ইতিহাসে বাংলাদেশ দল মাত্র একবার (২০০৩ সালে) অস্ট্রেলিয়া সফর করায় ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসে অবশেষে এক পরম আরাধ্য বৃত্ত পূরণ হতে যাচ্ছে মুশফিকুর রহিমের। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে যখন তিনি ব্যাট হাতে মাঠে নামবেন, তখন তা কেবল আরও একটি টেস্ট ম্যাচ থাকবে না; বরং তা হবে দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় এক ‘অপেক্ষা’র অবসান। ২১ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে মুশফিকের ‘টেস্ট অভিষেক’!
অবশ্য শুধু মুশফিকুর রহিম নন, এই দলের সবার জন্যই এটি অন্যরকম এক অভিষেক। কিন্তু বাকিদের মধ্যে হয়তো কারও কারও আবার সুযোগ হবে অস্ট্রেলিয়ার মাঠে টেস্ট খেলার। সেখানে মুশফিকের জন্য এটাই প্রথম, এটাই শেষ। ৩৯ পেরিয়ে এই ‘অভিষেক’ তাঁর কাছে অনেকটা রোমাঞ্চেরও। অনেক কিছু ভেবে, অনেক প্রস্তুতি নিয়েই সেখানে গিয়েছেন তিনি। ডারউইনের পিচে স্কয়ার কাট বেশি খেলতে হতে পারে, তাই সঙ্গে করে হালকা ব্যাট নিয়েছেন। ১০৩ টেস্টের লম্বা ক্যারিয়ারে মুশফিক দেশের বাইরে প্রায় ৩৫টি ভেন্যুতে এ পর্যন্ত টেস্ট খেলেছেন। সেখানে অপূর্ণতা বলতে অস্ট্রেলিয়ার ভেন্যু, সেখানেই বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর একটি স্বপ্ন পূরণ করতে যাচ্ছেন। তাঁর প্রজন্মের প্রায় কেউই এখন আর নেই দলটিতে। তাই একদিক থেকে নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতে পারেন মুশফিক। দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে তাঁর ওপর দায়িত্বটাও বেশি এই সিরিজে। ডারউইনের নেটেই যেমন তাঁকে গাইডেন্স দিতে হয় তরুণদের। তেমনি ড্রেসিংরুমেও তিনি ভরসার অন্যতম এক নাম।
যদিও প্রস্তুতি ম্যাচে শূন্য ও ২ রান করে আউট হয়েছেন মুশফিক। কিন্তু তাঁকে যারা চেনেন, তারা জানেন এই স্কোর কতটা তাতিয়ে দিতে পারে মুশফিককে। ২০১৮ ও ২০২০ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হোম সিরিজে টানা কয়েকটি ম্যাচে রানখরায় ভুগে সমালোচকদের নিশানায় থাকার পর ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন ডাবল সেঞ্চুরি করে। ২০১৮ সালে মিরপুরে একাদশে টিকে থাকার কঠিন চাপের মুখে খেলে ফেলেন অপরাজিত ২১৯* রানের মহাকাব্যিক এক ইনিংস– যা টেস্ট ইতিহাসে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ। একইভাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রায় এক বছর কোনো সেঞ্চুরি না পেয়ে যখন তাঁর ফর্ম নিয়ে চারদিকে জোর গুঞ্জন, ঠিক তখনই ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ট্রিপল ফিগারকে ডাবল সেঞ্চুরিতে (২০৩*) রূপান্তর করেন। এই খাতা-কলমে প্রমাণিত প্রত্যাবর্তনের গল্পগুলোই বলে দেয় যে ডারউইনের প্রস্তুতি ম্যাচের ব্যর্থতা (০ ও ২ রান) মুশফিকের জন্য কেবলই সাময়িক একটি মেঘ, যা সরিয়ে যে কোনো মুহূর্তে তাঁর ব্যাট থেকে আরও একটি বড় ইনিংস বেরিয়ে আসা কেবল সময়ের ব্যাপার।
দীর্ঘ পথচলায় তিনি হাঁকিয়েছেন ১৪টি সেঞ্চুরি এবং ২৯টি হাফ সেঞ্চুরি। দেশের চেনা কন্ডিশনে ১১০ ইনিংসে ৩৯.৭৫ গড়ে তাঁর সংগ্রহ ৪,০১৫ রান। বিদেশের মাটিতে ৮০টি টেস্ট ইনিংসে ৩৮.২৩ গড়ে তিনি করেছেন ২,৭৯১ রান, যার মধ্যে রয়েছে ৬টি সেঞ্চুরি ও ১০টি হাফ সেঞ্চুরি। তামিম ইকবাল (২,৩২৯ রান) ছাড়া একমাত্র মুশফিকই বিদেশের মাটিতে দুই হাজারের বেশি টেস্ট রান করার কীর্তি গড়েছেন। আর অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে টেস্টে যেটুকু অভিজ্ঞতা তাঁর, তা সেই ২০১৭ সালে দেশের মাটিতে। যেখানে চারটি টেস্ট ইনিংসে ৩৯.৫ গড়ে তিনি ১৫৮ রান করেছিলেন। তাই এই মুশফিকের ব্যাটের দিকেই আস্থার চোখে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশের ড্রেসিংরুম।
- বিষয় :
- টেস্ট সিরিজ
- ক্রিকেট