ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সংস্কার ছিল মুখে, বাস্তবে নয়

গতি ফেরেনি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা হতাশ

আইপিওশূন্য পুরো বছর

গতি ফেরেনি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা হতাশ
×

ছবি: সমকাল ইপেপার

আনোয়ার ইব্রাহীম

প্রকাশ: ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩৯ | আপডেট: ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১০:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিদায়ী ২০২৫ সালের পুরো সময়ে দেশ পরিচালনায় আছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান শেষে গঠিত ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমান সরকারের কাছে শেয়ারবাজারসংশ্লিষ্ট ও বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিল– অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতির অবসান হবে, ঘুরে দাঁড়াবে এ বাজার। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এমন প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত পূরণ হয়নি। 

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি শেয়ারবাজারের লেনদেন শুরু হয়েছিল দর পতনে। লেনদেন হয়েছিল মাত্র ৩৩০ কোটি টাকা। বছর শেষ হতে আর মাত্র তিন কর্মদিবস বাকি। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার সূচক প্রায় ২৩ পয়েন্ট বাড়লেও লেনদেন ছিল সেই তিনশ কোটির ঘরে। পুরো বছরে কখনও থেমে থেমে এবং কখনও লাগাতার দর পতন হয়েছে। শেয়ারে লগ্নি করে মুনাফা নয়, পুঁজি হারিয়েছে অধিকাংশ মানুষ। এদিকে পুরো বছরে নতুন কোনো কোম্পানি বাজারে আসেনি। আইপিও ‘শূন্য’ গেছে ২০২৫ সাল। 

পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, গত দুই সপ্তাহের আট কর্মদিবসের মধ্যে ছয়দিনই দর পতন হয়েছে। এতে প্রধান সূচক হারিয়েছে ১৫১ পয়েন্ট। গত বৃহস্পতিবারসহ বাকি দুই দিনে সূচক বেড়েছে মাত্র ৭১ পয়েন্ট। শেয়ারবাজারের রুগ্‌ণ দশা, দুইদিন বা দুই সপ্তাহের নয়, পুরো বছরের। চলতি বছরের শেষ প্রান্তিকে অর্থাৎ গত অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ৫৮ কর্মদিবস শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে। এর মধ্যে ২২ দিনে সূচকে ৮৩০ পয়েন্ট যোগ হয়েছে। বিপরীতে বাকি ৩৬ দিনে ১ হাজার ৩৬২ পয়েন্ট কমেছে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ২৫৭ কর্মদিবসের মধ্যে ১২৮ দিন সূচক ছিল নিম্নমুখী, হারিয়েছে ৩ হাজার ৬৪৬ পয়েন্ট। বাকি ১০৯ দিনে সূচকে যোগ হয় ৩ হাজার ৩১৩ পয়েন্ট। বছরের শুরুর দিকের তুলনায় শেষের দিকে এসে দর পতনের মাত্রা বেড়েছে।

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্য পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার শূন্য ঘোষণা ছিল বছরের শেষ দিকের খারাপ খবর। ঋণ কেলেঙ্কারির পরিপ্রেক্ষিতে দুর্বল হয়ে পড়া পাঁচ ইসলামী ব্যাংক ‘একীভূত’ করার প্রক্রিয়ায় শেয়ারহোল্ডারদের সব শেয়ার শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। এতে এসব ব্যাংকে বিনিয়োগকারীরা তাদের পুরো বিনিয়োগ হারিয়েছেন।  এরই মধ্যে আরও ৯ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়নের ঘোষণায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের। 

কার্যকর সংস্কার হয়নি 
অতীতে শেয়ারবাজারে যেসব অনিয়ম হয়েছে, তার কিছু ঘটনায় দায়ীদের বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানা আরোপ করা হলেও বাস্তবে আদায় হয়নি। অর্থাৎ দায়ীদের শাস্তি কার্যত হচ্ছে না। আবার আইনি সংস্কারের মাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি বর্তমান বিএসইসির নেতৃত্ব দিয়েছিল, তার অনেকাংশই পূরণ হয়নি। সার্বিকভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর আস্থার সংকট দেখা গেছে। বছরের উল্লেখযোগ্য সময় ধরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের পদত্যাগ চেয়ে বিক্ষোভ করেছেন বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ। 

নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের সংঘবদ্ধ দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার সুযোগে অতীতে সব ধরনের অনিয়ম হয়েছে–প্রায় সব তদন্তে এমন পর্যবেক্ষণ এসেছে। এক্ষেত্রে কার্যকর সংস্কার পদক্ষেপ ছিল না। স্টক এক্সচেঞ্জসহ বাজারের অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সব সময়ই দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে। ফলে ‘নামমাত্র’ যেসব সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে বাজারে আস্থা তৈরি করেনি। অংশীজনদের পাশাপাশি নিজ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বিএসইসির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বছরের শুরুর দিকে কমিশনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী একযোগে কমিশনের প্রতি অনাস্থা জানিয়েছিলেন। 

দেখা গেছে, মার্জিন ঋণ, মিউচুয়াল ফান্ড এবং আইপিও বিষয়ে তিনটি বিধিমালার সংশোধনকে ‘শেয়ারবাজার সংস্কার’ ধরে নিয়ে এগোচ্ছে বর্তমান কমিশন। এ নিয়ে চরম হতাশা রয়েছে শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। এর নেতিবাচক প্রভাবও শেয়ারবাজারে আছে।

ডিএসইর ব্রোকারদের সংগঠন ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, শেয়ারবাজারের নেতিবাচক প্রবণতা একটি বা দুটি ইস্যুতে নয়। সার্বিকভাবে মানুষ এ বাজারের ব্যবস্থাপনায় হতাশ হয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে। প্রতিটি দেশে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে শেয়ারবাজারে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়। নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার দুই সপ্তাহ পরও দেশের শেয়ারবাজারে দর পতন হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা কতটা হতাশ–এটি দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

ডিবিএ সভাপতি বলেন, পাঁচ ব্যাংকের একীভূত প্রক্রিয়ায় যেভাবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নিঃস্ব করা হয়েছে, তা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। এক্ষেত্রে বিএসইসি সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিতে পারত। সরকার আমানতকারীদের ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার দায় নিতে পারলে বিনিয়োগকারীদের ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকারও দায় নিতে পারত বলে মত দেন তিনি।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা 
নানা হতাশার চিত্রের বিপরীতে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াবে–এমন প্রত্যাশাও করছেন কেউ কেউ। বিনিয়োগ বাড়িয়ে শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবিকে নতুন করে এক হাজার কোটি টাকা ধারের ব্যবস্থা করেছে সরকার। সর্বশেষ তিন কার্যদিবসের দুই দিন সূচক ঊর্ধ্বমুখী থাকার ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ছিল বলে বাজারসংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন মনে করেন, অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে কেউ বিনিয়োগ করতে চায় না। অন্তর্বর্তী সরকারে প্রায় দেড় বছরে নতুন বিনিয়োগ হয়নি। জাতীয় নির্বাচন শেষে নতুন রাজনৈতিক সরকার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নীতি করবে– এমন আশা সকলের। সাম্প্রতিক কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় জনমানুষে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছিল–এটা যেমন সত্য, তেমনি এরই মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনমুখী হচ্ছে। এ অবস্থার ইতিবাচক প্রভাব শেয়ারবাজারে পড়বে–এমন আশা তাঁর।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার পর পুরো রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসবে–এমনটা মনে করেন মিনহাজ মান্নান। তিনি বলেন, নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পরও বিএনপির শীর্ষ নেতা সরাসরি নির্বাচনের মাঠে না থাকায় নানা সংশয় ছিল। নির্বাচনী আবহে শেয়ারবাজার পরিস্থিতি বদলে যাবে বলে তাঁর আশা। 

আরও পড়ুন

×