ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মানবসদৃশ রোবটের বিপণি

মানবসদৃশ রোবটের বিপণি
×

সাব্বিন হাসান

প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৬ | ১২:০১

চীনে হিউম্যানয়েড রোবটিকসের জোয়ারের সময় চলছে। কয়েকশ নির্মাতা, হাজারো কর্মী মনপ্রাণ দিয়ে শুধু রোবট তৈরি করছেন। নিজেদের মতো রোবট, হিউম্যানয়েড শুধু তৈরি করেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না; সারাবিশ্বে রপ্তানিও করছেন।

দি ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে ইউরোপ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির মতো দেশ ১৪ হাজারের বেশি হিউম্যানয়েড রোবট কিনেছে। পিছিয়ে নেই জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। যার বেশির ভাগই চীনের তৈরি। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজার। মানে হিউম্যানয়েড রোবটের চাহিদা বছরান্তে লাফ দিয়ে বেড়েছে ৩ দশমিক ৮ গুণ।

হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির নেপথ্যে

চীনে রোবট তৈরিতে অপ্রতিরোধ্য হয়েছে বিশেষায়িত দুটি সংস্থা– একটি অ্যাজিবট, অন্যটি ইউনিট্রি। পুরো বিশ্বে যত ধরনের হিউম্যানয়েড রোবট তৈরি ও বিপণন হচ্ছে, তার চার ভাগের তিন ভাগ তৈরি করে এ দুটি সংস্থা। চীন সরকার এ দুটি নির্মাণ সংস্থায় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। চীনের পূর্বদিকে ইয়াংসি নদীর তীরে গড়ে উঠেছে হাংঝৌ শহর। একে কলেজ আর ইউনিভার্সিটির শহর বলে। এই শহরেই গড়ে উঠছে অনেক কারখানা। হিউম্যানয়েড রোবট তৈরিতে যত ধরনের যন্ত্রপাতি প্রয়োজন, তার ৯০ ভাগই এখানে তৈরি হয়। মজার তথ্য হলো, টেসলাপ্রধান ইলন মাস্কের কল্পনার হিউম্যানয়েড রোবট অপ্টিমাসের যন্ত্রাংশ এই শহর থেকেই তৈরি হয়। বছরখানেক হলো এখানে উৎপাদন কারখানা খুলেছে রোবটিকস কোম্পানি রিয়েলম্যান (রোবো হাত নির্মাণ সংস্থা)।
শহরজুড়ে রোবটের কলকবজা শুধু হাংঝৌ নয়, জিয়াংসু থেকে ঝেজিয়াং পর্যন্ত বাঁকানো এই পুরো অঞ্চলে গড়ে উঠেছে সুবিশাল ক্লাস্টার। জানা গেছে, এ শহর থেকেই সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে হিউম্যানয়েড রোবটের যন্ত্রাংশ। তৈরি হয়েছে দারুণ এক ভবিষ্যতের দৃশ্যপট। অ্যাজিবট, ইউনিট্রি তো আছেই; সঙ্গে আছে রিনব্রেন ও ডিপসিকের মতো বহুল আলোচিত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সংস্থার দপ্তর।

দ্বৈত সারথি হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির ক্ষেত্রে চীনের

রয়েছে বাড়তি সুবিধা। সেটি হলো ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল। ধারণাটা ব্যাখ্যায় যা জানা গেছে, জিয়াংসু থেকে ঝেজিয়াং অঞ্চলে অনেক ধরনের বৃহৎ ইভি নির্মাতা রয়েছে। বলতে গেলে ইলেকট্রিক ভেহিক্যালের জন্য যে ধরনের ইনভার্টার, হাইটর্ক মোটর, ব্যাটারি, লাইডার সেন্সর লাগে; হিউম্যানয়েড রোবট তৈরিতে একই ধরনের যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয়। ফলে এক কাজে দুই স্বার্থ উদ্ধার হয়েছে দেশটির। গত কয়েক বছরে বহু ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল নির্মাতাই আংশিকভাবে হিউম্যানয়েড রোবট তৈরিতে উৎসাহিত হয়ে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করেছে।

পথে হলো দেখা

দেশি পর্যটকরা হাংঝৌ শহরে ঘুরতে বের হলে হিউম্যানয়েড রোবটের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবেই, তা নিশ্চিত। যেন নিজ চোখে বিস্ময় অবলোকন। কোনো রোবট হয়তো কফিশপে কাজ করছে বা মেকানিকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গাড়ির কাজ করছে ওয়ার্কশপে। মানুষ আর মানুষসদৃশ রোবটের এমন সহাবস্থান যেমন বিস্ময়কর, তেমনি বিরল। হাংঝৌ শহরে এটি খুবই স্বাভাবিক দৃশ্য। এসব রোবটের দাম গড়ে এক লাখ ইউয়ান। বাংলাদেশি টাকায় ২০ লাখের কাছাকাছি। কিছুদিন ধরে বটশেয়ার নামে সংস্থাটি রোবট ভাড়া দিচ্ছে। মাস শেষে টাকার হিসাবে ৪০ হাজার টাকা ভাড়া গুনতে হবে।

বাজার কতটা তৈরি

বিশ্বের সম্ভাব্য যে কোনো বাজার তৈরির আগে সে খাতে আগাম ঝাঁপিয়ে পড়ে চীন। এটিই তাদের বাণিজ্যিক স্বভাব। ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি), ফাইভজি মতো প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও এর স্বরূপ প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ব। সম্ভাব্য যে কোনো খাতে চীন সবার আগে বিনিয়োগ করে। ক্রমে বাজার তৈরি হয়। তখন একচেটিয়া বাজারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে দেশটি।

চাহিদা কেমন

তৈরি হচ্ছে হাজারো রোবট। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কারা কিনছে? চীনের সব কারখানা, দোকান বা হাসপাতালে কি রোবট কাজ করছে? উত্তর হচ্ছে– না। আদতে এমন নয়। সরকার নিজেই বেশির ভাগ রোবট কিনছে। কিছু বেসরকারি সংস্থার চাহিদাও রয়েছে। এর প্রধান গ্রাহক টেক জায়ান্ট ও গবেষণা সংস্থা। অটোমেশন ও ডেটা সংগ্রহের কাজে লাগানো হচ্ছে এসব রোবটকে। কাজ করছে এআইর মানোন্নয়নে। এ ছাড়া হিউম্যানয়েড রোবটকে গাড়ি অ্যাসেম্বল করা, গোডাউন সামলানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, শপিংমল, হোটেল, শোরুমে নিয়মিত কাজ তো আছেই। শিক্ষার্থীর সঙ্গে ল্যাবরেটরিতে কাজ করছে বেশ কিছু রোবট। সব মিলিয়ে যেন বিস্ময়কর দৃশ্যপট, যা অনাগত ভবিষ্যতের বদলে যাওয়া পরিবেশের কথাই বলছে।

আরও পড়ুন

×